বর্তমানে আমরা চরম অস্থিতিশীল এক বিশ্বে বসবাস করছি। রাশিয়া-ইউক্রেনে দীর্ঘদিনের যুদ্ধ, বছরের পর বছর ধরে ফিলিস্তিনিদের ওপর জাতিগত নিধনের জন্য ইসরায়েলের চালানো নির্বিচার গণহত্যা, আফগানিস্তান-পাকিস্তান যুদ্ধ, থাইল্যান্ড-কম্বোডিয়া যুদ্ধ এবং দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিবেশের মধ্যে সর্বশেষ ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার ঘটনা এখন সারা বিশ্বের মানুষের মনে এক ধরনের মানসিক ক্ষত তৈরি করে যাচ্ছে। সেই ক্ষত তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে যুদ্ধংদেহী মনোভাবের কারণে। যুদ্ধের প্রভাব পড়তে শুরু করেছে ওইসব দেশ থেকে হাজার কিলোমিটার দূরের দেশগুলোতেও। প্রভাব পড়ছে সেখানকার মানুষের অর্থনৈতিক ও মানসিক পরিস্থিতির ওপর। তবে আমাদের কাছে হাজার লোকের মৃত্যু যেখানে পরিসংখ্যান বা একটি সংখ্যা, সেখানে মৃত্যুর মিছিলে শামিল হওয়া ব্যক্তি পরিবারের কাছে এটি একটি ট্র্যাজেডি। চলমান যুদ্ধের মধ্যে ইরানের হরমুজগান প্রদেশের মিনাব শহরের একটি স্কুলে বিমান হামলায় প্রায় দুইশ শিশু মারা গেছে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরার এক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, ওই হামলার পর একজন ব্যক্তি এক শিশুর মরদেহের খণ্ডিত অংশ নিয়ে আহাজারি করছেন।
অন্যদিকে এ ঘটনায় হত্যাযজ্ঞের শিকার হওয়া ছয় বছরের শিশু সারার কথাই ধরা যাক। নৃশংস ওই হামলার পর মেয়েটির বাবা মোহাম্মেদ শরিয়তমাদার হন্য হয়ে মেয়ের মরদেহ খুঁজছিলেন। উদ্ধারকর্মীরা কখন তার মেয়ের নাম বলবেন সে অপেক্ষায় ছিলেন। তার ভাষায়, সারার মতো ওই শিশুরা রাজনীতি বোঝে না, যুদ্ধ বোঝে না। তবুও তাদের নির্বিচারে হত্যা করে যাচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। আবার নয় বছরের শিক্ষার্থী ফাতিমা আল জাহরা মোহাম্মাদ আলীর কথাও বলা যায়। মেয়েটির মা আমিনা আনসারি উদ্ধারকারীদের মাঝে থেকে তার সন্তানের উদ্ধারের অপেক্ষায় পাগলপ্রায়। কখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে থেকে তাকে উদ্ধার করা হবে—যে জন্য দৌড়াদৌড়ি করছেন। এই যে প্রায় দুইশ শিশুর মৃত্যু বিশ্বের কাছে, বর্বর ইসরায়েলি বাহিনী অথবা বিশ্বের কাছে একটি সংখ্যা। কিন্তু তাদের পরিবারের কাছে এ মৃত্যু সারা জীবন একটি ট্র্যাজেডি হিসেবেই রয়ে যাবে। আমৃত্যু তার যন্ত্রণা সহ্য করে যেতে হবে। তবে ইরানের বিরুদ্ধে চলা নৃশংসতা ও আগ্রাসনের মধ্যে কেবল যে সরাসরি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েই শিশুরা মারা যাচ্ছে এমন নয়। হাসপাতাল ও চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটরের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের ভয়াবহতার কারণে অনেক শিশু কার্ডিয়াক অ্যারেস্টসহ অন্যান্য মানসিক চাপজনিত কারণেও মারা যাচ্ছে। যারা যুদ্ধের ভয়াবহতা সহ্য করতে পারছে না। ফলে সরাসরি হামলায় মারা না গেলেও কোনো না কোনোভাবে মৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে এসব শিশুকে।
অন্যদিকে যুদ্ধের আগ্রাসন ও মৃত্যুপুরী না হলেও বাংলাদেশের শিশুদের একটি অংশ চরম নির্মমতার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত। সাম্প্রতিক বেশকিছু ঘটনা তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। যেমন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের শিশু জান্নাতুল নিশা ইরার কথাই ধরা যাক। সাত বছর বয়সী এ শিশু যে নিষ্ঠুরতার বলি হলো সেটা যেন মানুষ পরিচয়ে আমাদের মাঝে যে পশুত্ব মনোভাব বিরাজ করে তারই প্রতিফলন দেখিয়ে দিল। শিশুটির পরিবারের সঙ্গে পূর্ব শত্রুতার জেরে ধর্ষণ চেষ্টা ও পরে ব্যর্থ হয়ে ছুরি দিয়ে গলা কেটে হত্যা চেষ্টা করে বাবু শেখ নামে শিশুটিরই এক প্রতিবেশী। চকোলেট আর বেড়ানোর প্রলোভন দেখিয়ে শিশুটিকে নির্জন পাহাড়ে নিয়ে যান বাবু শেখ। ভয়াবহ এ ঘটনার পর শিশুটি বাঁচার চেষ্টা করে রক্তাক্ত অবস্থায় হেঁটে চলে আসার যে খবর ও ছবি গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে, সেটা দেখে যেকোনো বিবেকবান ব্যক্তিই আমাদের ভেতরের পশুত্বের কথা ভেবে নিজেকে ধিক্কার জানাবে, ঘৃণা করবে হয়তো নিজেকেই।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিশুদের ওপর যৌন নিপীড়ন, হিংস্রতা খুবই ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। আমাদের বর্তমান সমাজ ও বিচার ব্যবস্থার অনেক কিছুই প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। আমরা কেন শিশুদের এ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছি না? কেনইবা এসব ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করে এসবের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পারছি না? সমাজে মানুষের মাঝে মূল্যবোধ জাগ্রত করতে আমরা কতটুকুইবা কাজ করছি। কতটাইবা উদ্যোগী হচ্ছি। নাকি আমরা কেবল ঘটনা আমার সন্তানের সঙ্গে ঘটেনি এমনটা ভেবে নিরাপদে আছি বলেই দিন কাটিয়ে দেব?
আসলে আমাদের কাছে মৃত্যু ও ভয়াবহতা একটা পরিসংখ্যান এবং আকস্মিক ঘটনা হিসেবেই চলে আসে। আমরা সাময়িক ব্যথিত হয়। আমাদের আবেগ প্রকাশ করি। ক্ষমতাবানরা ক্ষমতার স্টান্টবাজি করে। যতদিন আলোচনায় থাকে, ততদিন পুলিশ প্রশাসনের কিছু দৌড়ঝাঁপ দেখা যায়। গণমাধ্যমে আলোচনা হয়। তারপর নতুন কোনো ইরার ঘটনা আবার সামনে চলে আসে। সবাই তখন আমরা আবার নতুন ঘটনাকেই নিয়েই ব্যস্ত হয়ে পড়ি। পুরনো সেসব ভয়াবহ ঘটনার বিচার ও শাস্তি কতটা নিশ্চিত হয় বা হচ্ছে। সেটার আর বোঝার খুব বেশি উপায় থাকে না। আলোচিত অনেক নৃশংস ঘটনার বিচার হলেও একটা সময় অপরাধীদের অনেকেই অর্থ, ক্ষমতা বা অদৃশ্য শক্তির বলে পার পেয়ে যায়। ফলে সমাজ ব্যবস্থায় হিংস্র এসব অপরাধ জিয়ে থাকে। সময়ে সময়ে সেটা চরমভাবে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নতুন ভয়াবহ ঘটনার সাক্ষী হই আমরা।
এসব হিংস্র ঘটনা কেবলই যে যাদের সঙ্গে ঘটছে সেখানেই বা সেই ঘটনায় সীমাবদ্ধ থাকছে বিষয়টা পুরোপুরি তেমন নয়। এটি সব শিশুদের, বাবা-মায়েদের মাঝেও উদ্বেগ ও আতঙ্ক তৈরি করছে। শিশুদের শারীরিক-মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। এসব ঘটনা শিশুদের আত্মহত্যার জন্যও কিছুটা নিয়ামক হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিক এক জরিপ প্রতিবেদনেও আমরা এর কিছুটা প্রতিফলন পাই। বেসরকারি সংস্থা আঁচল ফাউন্ডেশনের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ৪০৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এর মধ্যে ১৯০ জন স্কুলপড়ুয়া শিশু, যা মোট ঘটনার ৪৭ দশমিক ৪০ শতাংশ। এ হিসাব কেবল গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সংকলনের ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু সব ঘটনা তো গণমাধ্যমে পুরোপুরি সবসময় জায়গা পায় না। ফলে সংখ্যাটা যে আরো বেশি হবে সেটা সহজেই অনুমেয়। আমাদের সামাজিক বিভিন্ন পরিস্থিতিও এসব ঘটনার জন্য দায়ী। চারদিকের এসব ভয়াবহ ঘটনা শিশুদের মানসিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব যে ফেলছে। ইন্টারনেটের এই সময়ে এসে চারদিকে ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনা শিশুদের কানেও এখন পৌঁছে যাচ্ছে নানাভাবে। তবে শুধু যে এটাই একমাত্র প্রভাবক সেটা কোনোভাবে নয়। পারিবারিক কলহ থেকে শুরু নানা নিয়ামক এসব ঘটনার জন্য দায়ী। বাইরের পাশাপাশি ঘরেও শিশু নানাভাবে নিপীড়নের শিকার হচ্ছে।
শুরুতেই উল্লেখ করেছি, হাজার লোকের মৃত্যু আমাদের কাছে পরিসংখ্যান বা একটি সংখ্যা মনে হলেও প্রতিটি মৃত্যু প্রত্যেক পরিবারের কাছে এক একটা ট্র্যাজেডি। এই যে ১৯০ জন স্কুলপড়ুয়া শিশুর মৃত্যু, প্রতিটি পরিবারের জন্য সারা জীবন ধরে বয়ে নিয়ে চলা এক একটা ট্র্যাজেডি। আমরা ভুলে যাব কিছুদিনের মধ্যেই। কিন্তু এসব পরিবার আমৃত্যু তার ক্ষত টেনে যাবে। তবে কি এসব ঘটনা চলতেই থাকবে, বাড়তেই থাকবে? না তার জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা। সেই চেষ্টা হবে কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, ব্যক্তি ও সমাজ ব্যবস্থার রক্ষার জন্য নয়। বরং বিশ্বের সব শিশুর রক্ষার জন্য। এই যেমন ইরানের যে স্কুল শিশুদের ওপর বিমান হামলা করে হত্যা করা হলো, তাদের কি বেঁচে থাকার অধিকার ছিল না? তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব কি এই বিশ্বের নয়? যদিও আমরা দেশ, জাতি, ধর্ম, ধনী ও গরিব এমন নানারূপে বিভক্ত হয়ে এ অধিকার রক্ষা করছি। যে কারণে ইরানে স্কুলে নির্বিচারে শিশুদের হত্যা করলেও দু-একদিনের মধ্যেই জাতিসংঘে দাঁড়িয়ে মেলানিয়া ট্রাম্প শিশুদের শিক্ষার অধিকার রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। যদিও সেই ভাষণে তিনি ইরানের ওই শিশুদের হত্যা নিয়ে কোনো কথা বলেননি। কথা বলেননি তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নিয়ে। একইভাবে সীতাকুণ্ডের ঘটনাও ব্যক্তি-শ্রেণী ধনী-গরিবের ওই ভেদাভেদে একসময় হারিয়ে যাবে হয়তো। ফলে কেবল ভুরি ভুরি আইন নয়। বিশ্বের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ নয়। দরকার যেকোনোভাবেই হোক শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করা। সুরক্ষিত নিরাপত্তা বলয় তৈরি করা। সারা ও ইরাদের জন্য নিরাপদ বাসযোগ্য পৃথিবীটা গড়ে তোলা।
আল আমিন হুসাইন: সিনিয়র ম্যানেজার (মিডিয়া রিলেশন্স), ওপাস কমিউনিকেশন্স লিমিটেড










