চারপাশে নদী আবৃত ঢাকা হতে পারত পরিবেশবান্ধব ও গতিশীল যোগাযোগের এক টেকসই শহর। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা আর যানবাহনের চাপে বিপর্যস্ত রাজধানীবাসীর চলাচলের সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় আগে বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগ নেয়াও হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে প্রায় চার দফায় পরিকল্পনা প্রণয়ন ও প্রকল্প গ্রহণের পর নানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। ঘাটগুলোকেও সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্কের মধ্যে আনতে পারার দূরদর্শিতার অভাব যেমন ছিল, তেমনি ছিল শিল্পবর্জ্যের দূষণ, নদী ভরাট, নাব্য সংকটসহ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব। অথচ এসবের কোনোটিরও সমাধান না করে সম্প্রতি টঙ্গী নদীবন্দর থেকে ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথে প্রথমবারের মতো চালু হয়েছে বেসরকারি স্পিডবোট সেবা। যথাযথ পরিকল্পনা সমীক্ষা ছাড়াই এ উদ্যোগেরও শতভাগ সুফল মিলবে না বলেই অনুমেয়।
প্রসঙ্গত, ১৯৯৯ সালে প্রথম বৃত্তাকার নৌপথ চালুর উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় ২০০২ সালে সরকার অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘ঢাকা শহরের চারদিকে নৌপথ চালুকরণ, যানজট নিরসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা’ শীর্ষক প্রকল্প হাতে নেয়। কয়েক দফায় ২০০৪ সালের শেষ দিকে সদরঘাট-আশুলিয়া পথের কাজ শেষ হয়। দ্বিতীয় পর্বে পরের বছর আশুলিয়া সেতু-টঙ্গী-কাঁচপুর রুটের কাজ শুরু হলেও ২০১২ সালের মধ্যে সব কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ আরো বাড়ানো হয়। কিন্তু নানামুখী অসংগতির কারণে বারবার বন্ধ হয়ে যায়। সব মিলিয়ে এর আগ পর্যন্ত চারবার এ রুট চালু করেও তা সচল রাখা যায়নি। আগে যে কয়টি পদক্ষেপ নেয় হয়েছিল সেগুলো কেন ব্যর্থ হয়েছে? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইলে দেখা যায়, আগের প্রায় প্রতিটি উদ্যোগই যাচাই-বাছাই না করে গৃহীত। প্রকল্পের আওতায় যে কয়টি ঘাট বা পন্টুন নির্মাণ করা হয়েছিল সেগুলোর সঙ্গে সড়ক পরিবহনের সংযোগ ছিল না। তাছাড়া যে ওয়াটার বাসগুলো নামানো হয়েছিল তা মোটেও যাত্রীবান্ধব ছিল না। সর্বোপরি একটি ইন্টার-ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থা ব্যতীত এককভাবে নৌপথ সার্ভিস কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
একটা সময় লন্ডনের টেমস নদী ছিল মানবসৃষ্ট বর্জ্য, পশুবর্জ্য ও শিল্প-কলকারখানার বর্জ্যের ডাম্পিং গ্রাউন্ড। পানির ওপরে ও নিচে জমে থাকা বর্জ্য থেকে আসা অপ্রতিরোধ্য দুর্গন্ধ শহরের বাসিন্দারা আর সহ্য করতে পারছিলেন না বলে ১৮৫৮ সালে তারা ঘর থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেন। নাগরিকদের প্রতিবাদের মুখে মাত্র ১৮ দিনের মধ্যে পার্লামেন্টে বিল পাস হয় এবং টেমস সংস্কারের আইন তৈরি হয়। আমাদের দেশে খাল সংরক্ষণবিষয়ক আইন আছে, দ্য ক্যানেলস অ্যাক্ট ১৮৬৪, ল’স অব বাংলাদেশ নামে। আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, আইন থাকলেও আমরা তা প্রয়োগ করতে পারছি না বা করছি না। তাই আমাদের নদীগুলো ভরাট, নাব্য সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ সংকটে যেমন ভুগছে, তেমনি শিল্পবর্জ্যের দূষণে আক্রান্ত। টঙ্গী ও ঢাকার শিল্প তরল বর্জ্যের ডাম্পিং স্টেশন বলা যায় তুরাগ নদকে। সঙ্গে রয়েছে পলিথিন বর্জ্যও। এ নদীতে স্পিডবোট চলাচল অনেকটাই অসম্ভব। কেননা স্পিডবোট চলাচলের ক্ষেত্রে পানি পরিষ্কার থাকাটা জরুরি। তাছাড়া দূষিত ও গন্ধযুক্ত পানিতে স্পিডবোটের মতো গতির জলযান চলাচলে স্বাভাবিকভাবেই পানিতে আলোড়ন বেশি হবে। ফলে দুর্গন্ধও বেশি ছড়াবে। তাছাড়া তুরাগে বালি বোঝাই ধীরগতির জলযানেরও চলাচল রয়েছে। এক্ষেত্রে স্পিডবোটের মতো গতিশীল বাহনে যাত্রীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে কিনা সে বিষয়টিতেও নজর দেয়া জরুরি। শিল্পবর্জ্যের কারণে তুরাগে ট্রলার চালানোই মুশকিল। শুষ্ক মৌসুমে পানি আরো নিচে নেমে যাবে। তখন পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে যাবে।
আমরা চাই, রাজধানীর বৃত্তাকার পথটি সচল থাকুক। কিন্তু এ পথের ব্যাপারে বারবারই সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতার ঘাটতি দৃশ্যমান। সমস্যা সমাধানে ব্যক্তিমালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে এগিয়ে আসার কথা বলা হচ্ছিল। ভালো ভালো নৌযানের সঙ্গে যদি গতি ও সেবার মান ভালো হয়, অবশ্যই মানুষ এসব নৌপথে যাতায়াত করবে। কিন্তু এবার যখন প্রথমবারের মতো বেসরকারি বিনিয়োগ এল, তখন দেখা যাচ্ছে কোনো রকম সমীক্ষা ছাড়াই পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর মাওয়া রুটে যাত্রীর অভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়া স্পিডবোটগুলো এখানে দেয়া হয়েছে। একটি কোম্পানি ঢাকার বৃত্তাকার নৌপথে বোট চালাতে আগ্রহী হওয়ায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) বিষয়টি চূড়ান্ত করে, যা একেবারেই দায়সারা কাজ। কারণ দূষণে বিপর্যস্ত তুরাগ দিয়ে স্পিডবোট চলতে পারবে কিনা, তার কোনো পরীক্ষাই করা হয়নি।
এর আগে কয়েক দফায় রাজধানীর চারপাশে নৌপথ প্রকল্পের উদ্দেশ্য ভেস্তে যাওয়ার জন্য বিআইডব্লিউটিএর উদাসীনতাকে দায়ী করেছিল পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বৃত্তাকার নৌপথের উভয় পথের উভয় পাড়ে রাস্তা নির্মাণ ও ঘাটগুলোর সঙ্গে অভ্যন্তরীণ লিংক রোড তৈরি করার ব্যাপারে বারবার জোর দেয়া হয়েছিল। গুরুত্ব দেয়া হয়েছিল নদীতে বর্জ্য ফেলা বন্ধসহ আশুলিয়া ও টঙ্গী ব্রিজ এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে কার্গোসহ অন্যান্য বড় নৌযান চলাচল করতে পারে। বিআইডব্লিউটিএর মনিটরিং ব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি নজর দিতে বলা হয়েছিল ওয়াটার বাস সার্ভিস যাত্রী সহায়ক ও আকর্ষণীয় করার প্রতিও। তাই পুনরায় কোনো ধরনের সমীক্ষা ছাড়াই বিআইডব্লিউটিএর দায়সারা উদ্যোগটি কতটা ফলপ্রসূ হবে তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
আমরা জানি, সমন্বয়হীনতা ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণেই ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্রমে ভঙ্গুর হচ্ছে। অথচ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সচল করা গেলে একদিকে যেমন শহরের সড়কের ওপর চাপ অনেক কমত, অন্যদিকে নদীপথে চলাচলে মানুষের স্বস্তিও মিলত। কিন্তু বারবার সমন্বয়হীন পরিকল্পনার কারণে ঢাকার নৌপথের এ দশা। নৌপথ কখনো একা টিকে থাকতে পারে না, এর সঙ্গে সড়কের সমন্বয় বা সংযোগ থাকতে হবে; যা পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোয় দেখা যায়। তাই নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থাকে সমন্বিত পরিবহন নেটওয়ার্কের মধ্যে আনার পাশাপাশি এর সুফল পাওয়ার জন্য যথাযথ সমীক্ষা ও পরিকল্পনাও জরুরি।










