দেশের আমদানি বাণিজ্যের উল্লেখযোগ্য অংশ সম্পন্ন হয় সমুদ্রবন্দর দিয়ে। কিন্তু এক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) করা সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় উঠে এসেছে, আমদানি পণ্য খালাসে সবচেয়ে বেশি সময় ব্যয় হয় সমুদ্রবন্দরে। বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরে এক্ষেত্রে গড়ে সময় লাগে ১১ দিন ৬ ঘণ্টা। এটা উদ্বেগজনক। আমদানি পণ্য খালাসে শম্বুক গতির নেতিবাচক প্রভাব স্বভাবত দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পোৎপাদন সবখানে পড়ছে। তাই বিরাজমান প্রতিবন্ধকতাগুলো দূর করে বন্দর কার্যক্রমে গতি আনা এখন জরুরি।
চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য খালাসে বেশি সময় লাগার বিষয়টি দীর্ঘদিনের। এ সময়সীমা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের চেয়ে অনেক বেশি। বিশ্বের বড় বড় বন্দরের চেয়ে প্রায় পাঁচ গুণ সময় লাগে চট্টগ্রাম বন্দরে। ব্যবসায়ীরা নানা সময় অভিযোগ করলেও এখনো পুরোপুরি প্রতিকার মেলেনি। পণ্য খালাসে দেরি হওয়ার পেছনে নানা ফ্যাক্টর রয়েছে। এক্ষেত্রে কিছু অবকাঠামোগত আর কিছু ব্যবস্থাপনাগত। সময়ান্তরে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার হলেও বন্দরটির জেটির কাঠামোগত অবস্থা এখনো নাজুক রয়েছে। নাব্যতা সংকটে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। ফিডার ভেসেল দিয়ে বহির্নোঙ্গর থেকে কনটেইনারগুলোকে নিয়ে আসতে হয়। আবার আধুনিক যন্ত্রপাতি সংকটে সেগুলো নামাতেও সময় যায় অনেক। তার মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষের বড় ধরনের ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতাও বিদ্যমান। ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে মূলত তিনটি ধাপ রয়েছে। জাহাজ থেকে পণ্য নামার পর শুল্কায়ন পর্যন্ত একটা ধাপ, শুল্কায়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন আরেকটি ধাপ এবং পণ্য খালাস আরেকটি ধাপ। এ তিন প্রক্রিয়াতেই সময় লাগে অনেক। সব মিলিয়ে বিলম্বিত হচ্ছে আমদানি পণ্যের খালাস।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য উন্নয়নে অন্যতম প্রধান শর্ত হলো বন্দর সুবিধা। সুবিধা ও ব্যবস্থাপনা বিবেচনায় বরাবরই প্রথম দিকে থাকছে জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও বেলজিয়াম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আপেক্ষিকভাবে এগিয়ে আছে ভারত। শুল্কায়ন, অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক জাহাজীকরণ, বিভিন্ন পর্যায়ে আনুষঙ্গিক কার্যক্রম সুবিধাসহ সক্ষমতা বাড়াতে দেশটি নানামুখী পদক্ষেপ নিয়েছে। অর্থনীতির প্রসারণের সঙ্গে সংগতি রেখে বন্দর ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ও ডিজিটালাইজেশনের প্রবর্তন নিশ্চিত করেছে। ফলে সেখানে আমদানি পণ্য খালাস এবং রফতানি পণ্য ডেলিভারিতে সময়সীমা কমে আসায় লক্ষণীয় উন্নতি ঘটেছে সাম্প্রতিক সময়ে, যা আমাদের জন্য অনুসরণীয়।
এনবিআরের স্ট্র্যাটেজিক কর্মপরিকল্পনায় বিশেষ করে চট্টগ্রাম বন্দরকে সচল ও গতিশীল করতে হলে পণ্য চালানের শতভাগ কায়িক যাচাই-বাছাই এবং ছাড়পত্র প্রদানসংবলিত বিদ্যমান ব্যবস্থা বদলে ফেলার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, যত বেশি পর্যায়ে কায়িক যাচাই-বাছাই হবে, ততই দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্নীতির ফাঁকফোকর সৃষ্টি হয়। কিন্তু অনেকটা সময় পার হলেও আলোচ্য কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা যায়নি। চালু করা যায়নি স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা। মূলত নিজেদের অনিয়ম জিইয়ে রাখতেই একশ্রেণীর শুল্ক কর্মকর্তা সেকেলে ব্যবস্থাটি এখনো চালু রেখেছেন। স্বয়ংক্রিয় শুল্কায়ন চালু করা গেলে অনিয়ম যেমন কমে আসবে, তেমনি পণ্য খালাসেও আসবে গতি। সুতরাং অবিলম্বে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে শুল্কায়নের ব্যবস্থা চালু করাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এজন্য দরকার উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নজরদারি।
সত্য যে, বিগত সময়ে সরকার চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। বে টার্মিনাল নির্মাণের প্রকল্পসহ নির্মাণের পাশাপাশি গ্যান্ট্রি ক্রেনসহ কিছু যন্ত্রপাতি সংযোজন করা হয়েছে। ফলে জাহাজ ও পণ্য হ্যান্ডলিং আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু বড় ধরনের কাঠামোগত দুর্বলতা এখনো রয়ে গেছে। এক্ষেত্রে বড় সমাধান জেটির সংখ্যা বাড়ানো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেটির সংখ্যা না বাড়ালে দ্রুত পণ্য খালাসের প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রতার সমস্যা স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব হবে না। নিশ্চয়ই সেটি সময়সাপেক্ষ কাজ; কিন্তু তাই বলে বন্দরের জাহাজজট ও পণ্য খালাসের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়ায় গতি সঞ্চারের উদ্যোগ ফেলে রাখা কাম্য নয়। বন্দরের সংস্কার কার্যক্রম নিয়মিত চালাতে হবে, কনটেইনার রাখার জায়গা বা ইয়ার্ড সম্প্রসারণ এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা আরো জোরালো করতে হবে।
শুধু চট্টগ্রাম বন্দর নয়; দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর মোংলার দিকেও নজর দিতে হবে। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকার সবচেয়ে কাছের সমুদ্রবন্দরে রূপ নিয়েছে মোংলা বন্দর। এরই মধ্যে বন্দরটি দিয়ে তৈরি পোশাকপণ্য রফতানি শুরু হয়েছে। এছাড়া খাদ্যশস্য, কাঁচামাল ও গাড়ি আমদানিতে মোংলা বন্দর ব্যবহূত হচ্ছে বেশকিছু বছর ধরে। সাম্প্রতিক সময়ে লাভজনকও হয়ে উঠেছে এ বন্দর। এসবই আশাজাগানিয়া বিষয়। কিন্তু মোংলা বন্দরকে অর্থনৈতিকভাবে অধিকতর আকর্ষণীয় করতে হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ড্রেজিং বাবদ ব্যয় কমাতে এবং পোর্টের সুবিধা সম্প্রসারণ করতে হবে। বন্দরের অবকাঠামো এখনো আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নয়। পদ্মা সেতু নির্মাণের ফলে মোংলা বন্দরের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে সেটির সদ্ব্যবহারে যথাযথ ব্যবস্থাও নিতে হবে। কাজেই সেখানেও অবকাঠামোগত দুর্বলতাগুলো দূর করতে হবে। পাশাপাশি শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায়ও আনতে হবে গতি।
এনবিআরের টাইম রিলিজ স্টাডিতে আমদানি পণ্য খালাসে যে দীর্ঘসূত্রতার চিত্র উঠে এসেছে তা হতাশাজনক। কাজেই এক্ষেত্রে অবশ্যই উন্নতি ঘটাতে হবে। দেশের অর্থনীতি একটা উত্তরণশীল পর্যায়ে রয়েছে। অর্থনীতির আকার ক্রমেই বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ ভোগ থেকে শিল্প-কারখানার কাঁচামালের প্রয়োজনে বিভিন্ন পণ্য আমদানি হচ্ছে। কিন্তু বন্দর সুবিধার অপ্রতুলতা এবং শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার জটিলতায় পণ্য খালাস প্রলম্বিত হচ্ছে। কনটেইনারে বেশি সময় রাখতে হচ্ছে পণ্য। ফলে ব্যবসায়ীদের বাড়তি মাসুল গুনতে হচ্ছে। ব্যবসার খরচ বাড়ছে, যার পরোক্ষ চাপ গিয়ে পড়ছে ভোক্তার ওপর। শুধু আমদানি নয়, রফতানির ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা তৈরি হচ্ছে। যা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর প্রতিবন্ধক। সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য খালাসের সময় কমিয়ে আনতে পর্যাপ্ত আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন ও সর্বাধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ার ধাপ কমানোরও কথা বলছেন তারা। এসব বিষয় আমলে নিয়ে সরকার ও কর্তৃপক্ষের সচেষ্টতাই এখন প্রত্যাশিত।










