কোনো একজন ব্যক্তি ভুল করলে ভোগে সেই ব্যক্তি, আর কেউ নয়। বড় জোর তার পরিবার অবশ্যই। অন্য কেউ এর ভাগীদার হয় না। যদি একটি ব্যাংক ভুল করে তাহলে? তাহলে এর ফলাফল ভোগ করবে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক। ভোগ করবে কর্মচারী-কর্মকর্তারা। শেষ পর্যন্ত এর ফল অবশ্যই ভোগ করবে ব্যাংকের মালিকপক্ষ। তবে কথা আছে ভুলটি যদি মারাত্মক হয়, আত্মবিধ্বংসী হয় তাহলে ব্যাংকের এই ভুলের জন্য বা অপরিণামদর্শী সিদ্ধান্তের জন্য ভুগবে শেষ পর্যন্ত ব্যাংকের আমানতকারীরা। ব্যাংক বন্ধ হতে পারে, সরকার অধিগ্রহণ করতে পারে। পুনর্গঠন স্কিম হবে। আমানতকারীদের টাকা পেতে অসহ্য ভোগান্তি পোহাতে হবে। অবশ্য এতে অন্য ব্যাংকের আমানতকারীদের শাস্তি ভোগ করতে হবে না। ব্যাংক খাতে সামান্য প্রভাব পড়তে পারে। তবে তা সহ্য করে নেয়ার মতো ক্ষমতা অর্থনীতির থাকে। এবারে প্রশ্ন, ভুলটি যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংক অর্থাৎ বাংলাদেশ ব্যাংক করে? এখানেই কথা উঠবে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক কী ভুল করতে পারে? তারা হচ্ছে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ। শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করে, দৈনন্দিন ব্যাংকিংয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে তারা জড়িত নয়। তারা আমানত গ্রহণ করে না, ঋণও দেয় না সাধারণ মানুষকে। তাদের ভুল হলে অসুবিধা কোথায়? আর সবচেয়ে বড় কথা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভুল ধরার কে আছে? সরকারের লোক কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালায়। গভর্নর, ডেপুটি গভর্নর, ব্যাংকের পরিচালক সবাই সরকারের অনুমোদিত/মনোনীত লোক। অতএব তাদের ভুল কে ধরবে? বাণিজ্যিক ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ভুল, অনিয়ম, জাল-জালিয়াতি ধরার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক রয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোর ভুল-ত্রুটি, অনিয়ম ধরার জন্য রয়েছে ‘ইন্স্যুরেন্স ডেভেলপমেন্ট রেগুলেটরি অথরিটি’ (আইডিআরএ)। মাইক্রোক্রেডিট প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য রয়েছে মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ)। প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই নিয়ন্ত্রক সংস্থা আছে, যারা তাদের অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দেখভাল ও তদারকি করে। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকি করার জন্য কি কেউ আছে? তারা ভুল-ভ্রান্তি করছে কিনা, তাদের ওখানে কোনো অনিয়ম হচ্ছে কিনা তা দেখার কেউ কি আছে? বলতে পারেন সরকারি বাণিজ্যিক অডিট (কমার্শিয়াল অডিট) রয়েছে। তারা অনিয়ম দেখে। অবশ্যই দেখতে পারে। তা হচ্ছে আর্থিক অনিয়ম। আমি এ কথা বলছি না। আমি বলছি নীতিগত, পদ্ধতিগত ভুল-ভ্রান্তি, মারাত্মক ভুল-ভ্রান্তির কথা। এগুলো দেখার কে আছে? প্রতি বছর অন্তত দুবার, যতদূর জানা যায়, গভর্নর সাহেবকে নাকি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে হাজিরা দিতে হয় কাগজপত্র নিয়ে। কিন্তু এই কমিটির কার্যবিবরণী খবরের কাগজে দেখি না বিধায় সেখানে কী হয় আমরা জানি না। যদি দেখতাম ভুল-ভ্রান্তির জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংককে শাসানো হচ্ছে তাহলে বুঝতাম—না, দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জবাবদিহিতার জন্য ব্যবস্থা আছে। আসলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভুল-ত্রুটি এবং এর বিচার-আচারের কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান নয় বলেই কথাগুলো ওঠে। সব প্রতিষ্ঠানের ও ব্যাংকের লোকেদের ভুল-ত্রুটি, অনিয়ম, জাল-জালিয়াতির জন্য মামলা খাওয়ার, জেলে যাওয়ার উদাহরণ আছে—কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এমন কিছু আছে কিনা কেউ তা জানি না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা ভিন্নতর। ব্যাংকের ক্ষেত্রে ভুল-ত্রুটি, অনিয়ম ধরার জন্য ব্যবস্থা আছে, তার বিচারের জন্য ব্যাংকের বোর্ড রয়েছে। বোর্ডের চেয়ারম্যান দৈনন্দিন ভিত্তিতে ব্যাংক পরিচালনা করেন না, তার কোনো নির্বাহী ক্ষমতা নেই। অতএব বিচারের কাজ করা তার জন্য অনেকটা সহজ। কিন্তু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বেসর্বা হচ্ছেন গভর্নর। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর স্বয়ং ওই বোর্ডের চেয়ারম্যান, আবার ব্যাংকের সব নির্বাহী ক্ষমতাও তার। এমতাবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বোর্ডের অন্য সদস্যরা কার্যত গভর্নরের কাজকেই অনুমোদন দেন। কারণ গভর্নর ‘বোর্ডের সকলই সমান’ এই নীতির ঊর্ধ্বে। ঐতিহাসিকভাবেই এ ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরকে দেয়া হয়েছে, যাতে শক্ত হাতে তিনি ব্যাংক ও ব্যাংক খাতের হাল ধরতে পারেন। তাকে সরাসরি সাহায্য-সহযোগিতা করার জন্য রয়েছে ডেপুটি গভর্নর এবং নির্বাহী পরিচালক। এমতাবস্থায় ধরেই নেয়া হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে, বিচারের ঊর্ধ্বে, জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে! তারা ব্যাংকিং ক্ষেত্রে ‘পাহাড়কে দরিয়া করতে পারেন, দরিয়াকে পাহাড় করতে পারেন’—কারো কিছু বলার নেই এতে। এহেন অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে যাচ্ছে দৃশ্যত জবাবদিহিতার ঊর্ধ্বে। বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের ভুল ধরলে ‘খবর আছে’। কারণ গভর্নর নয়, ওই ব্যাংকের একজন সহকারী পরিচালক ফোন করলে ব্যাংকের প্রধান নির্বাহীরা ভয়ে তটস্থ হয়ে পড়েন। তাদের কত অনৈতিক ‘অনুরোধ’ যে কার্যকর করতে হয় তার কোনো হিসাব নেই। এখানেই প্রশ্ন: তবে কি তারা দোষ-ত্রুটি, ভুল-ভ্রান্তির ঊর্ধ্বে? একটা সাম্প্রতিক ঘটনা বা সিদ্ধান্ত থেকে মনেই হয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ভুল করে, যার মাশুল পুরো ব্যাংক খাতকেই গুনতে হয়। সিদ্ধান্ত/পদক্ষেপটি কী? কী আছে এতে?

কয়েকদিন আগে একটি খবর পড়লাম যার শিরোনাম: ‘ঋণখেলাপিদের জন্য এবার গণছাড়’। এতে অনেক কথা আছে। প্রধান কথা কয়েকটা। প্রথমত, ‘ডাউন পেমেন্ট’ যা দিয়ে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করতে হয়। এর জন্য ব্যবসায়ীর ‘ক্যাশ’ টাকার দরকার হয়। এটা জোগাড় করা কষ্টকর। এর জন্য ব্যবসায়ীর ওপর চাপ সৃষ্টি হয়, ব্যাংকেরও কিছু টাকা আদায় হয়। তবে পুনঃতফসিলের ঋণ/নতুন ঋণ দেয়া হলে ওই চাপ বহুলাংশে লাঘবই হয়ে যায়। দেখা যাচ্ছে আগে বকেয়ার ১০ থেকে ৩০ শতাংশ টাকা ‘ক্যাশ’ জমা দিয়ে পুনঃতফসিল করতে হতো। নতুন গভর্নর আসার পর তা করা হয়েছে আড়াই থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ। বিরাট ছাড় বৈকি! দ্বিতীয়ত, প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে ঋণ পরিশোধের সময় অনেক বেড়েছে। আগে খেলাপি ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে সময় পাওয়া যেত মাত্র দুই বছর। এখন পাওয়া যাবে পাঁচ থেকে আট বছর। বিশাল, বিশাল ছাড়, যাকে বলা হচ্ছে— ‘গণছাড়’। বোঝাই যায় দারুণ ‘কষ্টে জর্জরিত’ বড় বড় ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের জন্য এ শিথিলতা আনা হয়েছে। আগেও নিয়ম-নীতিতে শত শত শিথিলতা আনা হয়েছে। কত শিথিলতা তার কোনো হিসাব নেই। আজ একটা, তো কাল আরেকটা। কথা মনে হচ্ছে একটাই। খেলাপি ঋণের (ক্লাসিফায়েড লোন) পরিমাণ বাড়ানো যাবে না। কীভাবে তা করা যায়: বকেয়া টাকা আদায় করে যা খুবই কঠিন। কেউ পাওনা টাকা ফেরত দিতে চায় না। এর উদাহরণ পাওয়া গেল একটি আত্মহত্যা থেকে। একটি কোম্পানির কাছ থেকে পাওনা টাকা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে প্রেস ক্লাবের ভেতরে একজন কিছুদিন আগে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দেয় এবং পড়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ব্যাংক তো আর আত্মহত্যা করতে পারে না। তাই করণীয় কী? করণীয় হচ্ছে ‘সংজ্ঞা পরিবর্তন করা। শত হোক খেলাপি ঋণ কী’—এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। যেহেতু তারা সংজ্ঞা নির্ধারণ করে, অতএব তারা তা পরিবর্তন/পরিবর্ধনও করতে পারে। এটা তাদের ইচ্ছা। এখন যেহেতু ‘নির্দেশিত’ তাই খেলাপি ঋণের পরিমাণ বাড়তে দেয়া যাবে না। এটা কীভাবে সম্ভব? ‘দেশপ্রেমিক’ ব্যবসায়ী, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরা তো বকেয়া টাকা ফেরত দেন না। বরং তাদের ঋণের পরিমাণ দিন দিনই বাড়ে। বাড়তে বাড়তে ২, ৪, ৬, ৮ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত হয়েছে অথচ দেশের ৮০ লাখ ছোট-মাঝারি ‘এন্টারপ্রাইজ’ অর্থাভাবে অচল হওয়ার উপক্রম। এতৎসত্ত্বেও সংজ্ঞা ঘন ঘন পরিবর্তন করা হচ্ছে। অজুহাত তো আছে। আছে দুই হাত, তার ওপর অজুহাত। প্রথম অজুহাত ‘করোনা-১৯’। এবার অজুহাত ‘ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ’। দৈনন্দিন অজুহাত তো আছেই। এসব অজুহাতের প্রতিকার করতে গিয়ে নীতির ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রায় দেউলিয়া হওয়ার পথে। নীতির জঙ্গলে পরিণত হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এত সব পরিবর্তন—তার হদিস রাখতে গিয়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কর্মকর্তাদের বারোটা বেজে যাচ্ছে। প্রশ্ন হলো, যদি দুদিন পরপর নীতিমালা পরিবর্তন/সংশোধন/পরিবর্ধন করতে হয় তাহলে বাণিজ্যিক ব্যাংকের হাতেই বিষয়টি ছেড়ে দিলে কী অসুবিধা। ব্যবসা করে বাণিজ্যিক ব্যাংক। গ্রাহকের সুবিধা-অসুবিধা দৈনন্দিন দেখভাল করে ব্যাংক। ব্যাংকই বোঝে তাদের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা। তারা হাড়ে হাড়ে টের পায় যে ব্যবসা কোনো অংক নয়, ‘অ্যারিথমেটিক’ নয়। দুইয়ে দুইয়ে চার হয়। ব্যবসায় তা নাও হতে পারে। একটা ঘটনা ব্যবসার মঙ্গল ডেকে আনতে পারে। আবার একটা ঘটনা ব্যবসার ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। এ খবর দৈনন্দিন ভিত্তিতে পাচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংক। অতএব তাকে অধিকতর ক্ষমতা দিতে কেন আপত্তি। অনিয়ম হলে ধরা হোক। কিন্তু দৈনন্দিন কাজে তাদের অধিকতর স্বাধীনতা দিতে ক্ষতি কী? কেন্দ্রীয় ব্যাংক কি মনে করে তাদের ‘বুদ্ধিই’ সর্বোত্কৃষ্ট, আর ব্যাংকের ‘বুদ্ধি’ খর্বকায়? অবশ্যই তা মনে করার কোনো কারণ নেই। এর সাক্ষ্য পেলাম কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি সিদ্ধান্তে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যে ভুল করে এবং ভুলের কারণে পুরো ব্যাংক খাত যে ভোগে তার পরোক্ষ একটি উদাহরণ দিলেন নতুন গভর্নর। নতুন প্রক্রিয়ায় ‘খেলাপি ঋণে কী সুবিধা দেয়া হবে, তা নির্ধারণ করার পুরো ক্ষমতা বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। ফলে ব্যাংক মালিকরাই ঠিক করবেন, কী সুবিধা পাবেন ঋণখেলাপিরা। আগে বিশেষ সুবিধায় ঋণ নিয়মিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনুমোদন লাগত, যা স্বয়ং গভর্নর অনুমোদন করতেন। নতুন গভর্নর দায়িত্ব নিয়ে সেই ক্ষমতার পুরোটাই ব্যাংকগুলোর হাতে তুলে দিয়েছেন।’ এর ফলাফল কী হবে তা পরে জানা যাবে। তবে ঋণ দেয়া, পুনঃতফসিলীকরণ, পুনর্গঠন করা, সুবিধা প্রদান করার যে নির্বাহী ক্ষমতা সেটা কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিজের হাতে নিয়ে অনেক ক্ষতি করেছে। খারাপ ঋণ অধিগ্রহণ করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে ব্যাংকের ক্ষমতা হরণ করেছে তাতে ব্যাংক খাতের কোনো উপকার হয়নি। বরং উল্টো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক দপ্তর ‘অনিয়মের ডিপোতে’ পরিণত হয়েছে। ক্ষমতা, অতিরিক্ত ক্ষমতা, জবাবদিহিতাহীন ক্ষমতা ক্ষতি ছাড়া ভালো করে না। ভালো কথা, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অধিকতর স্বাধীনতা দিচ্ছে। এবার ‘নয়-ছয়’ নীতির ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেয়া হোক। মূল্যস্ফীতি, ডলারের মূল্যের নিরিখে এ নীতি অকার্যকর হয়ে পড়েছে। এ কথা অর্থমন্ত্রীর নজরে আনা দরকার।

 

ড. আর এম দেবনাথ: অর্থনীতি বিশ্লেষক

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক