সামষ্টিক অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বেশ স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছে। বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ২০১৯ সালে আমরা আশাব্যঞ্জক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছি। তবে আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ইতিবাচক প্রভাব পুঁজিবাজারে প্রতিফলিত হয়নি। উল্লিখিত বছরটি শুরু হয়েছিল বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে কিন্তু বছর শেষে আমরা দেখেছি পুঁজিবাজার তাত্পর্যজনক মূল্য ও সূচক উভয় হারিয়েছে। এটা পুঁজিবাজারে লগ্নি করতে বিনিয়োগকারীদের নিরুৎসাহিত করেছে। অবশ্য আমরা যদি একটি দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিকোণ-প্রেক্ষিত নিই, তাহলে আমরা বলতে পারি যে বাজার সংশোধন দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে এবং আমরা আশা করতে পারি যে যথাসম্ভব দ্রুত আমাদের অর্থনৈতিক অর্জনগুলোর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ একটি বাজার দেখব।
২০১৯ সালের প্রধান প্রধান প্রতিবন্ধকতা
২০১৯ সালে পুঁজিবাজার বেশ কয়েকটি বাধার সম্মুখীন হয়েছিল। উল্লিখিত বছরজুড়ে ব্যাংকিং খাত উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত সম্পর্কিত ইস্যুগুলোর দিক থেকে ভয়াবহ চাপের মুখোমুখি হয়েছিল। কিছু ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান (এনবিএফআই) সংকটে পড়েছিল। এর মধ্যে ছিল পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিসেস। এটি একটি তালিকাভুক্ত এনবিএফআই, আর্থিক স্বাস্থ্যের ক্রমাবনতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক যাকে অবসায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি ব্যাকিং খাতে নিম্ন আস্থার ডমিনো ইফেক্ট সৃষ্টি করেছে এবং বেশ কয়েকটি এনবিএফআই থেকে বিপুল পরিমাণ আমানত প্রত্যাহার করেছেন আমানতকারীরা। এর ফল হলো, তারল্য সংকটের অধিকতর অবনতি এবং ঋণদান বাধাগ্রস্ত হওয়া। ঋণ-আমানত অনুপাত বাড়ানোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক উল্লিখিত সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেছে।
অধিকন্তু, এই পরিপক্ব বাজারে অধিকসংখ্যক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান লাভজনক পরিচালনকে কঠিন করে তুলেছে। একটি বড় পুঁজিবাজার খাতে ব্যাংকগুলো যেহেতু প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী, সেহেতু ব্যাংকের জটিলতাগুলো নেতিবাচকভাবে শেয়ারবাজারেও প্রভাব ফেলেছে।
২০১৯ সালে আরেকটি বড় প্রতিবন্ধকতা ছিল বিদেশী তহবিলগুলোর প্রস্থান, কারণ বৈশ্বিক বাজারের তুলনায় বাংলাদেশের পুঁজিবাজার বাজেভাবে নৈপুণ্য দেখিয়েছে। ২০১৯ সালে যেখানে ডিএসইসির সূচক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশে নেমেছিল, তখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শেয়ারবাজারের সূচক অনেক ছাড়িয়ে গিয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ভারত, পাকিস্তান ও ভিয়েতনামে যথাক্রমে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ, ১০ দশমিক ৭ ও ৮ দশমিক ১ শতাংশে ফিরেছিল। বিদেশী তহবিল প্রত্যাহার বা প্রস্থান ২০১৯ সালে আমাদের বাজারে নিম্নমুখী চাপ ত্বরান্বিত করেছিল। অধিকন্তু সঞ্চয়পত্রে উচ্চ সুদহার ব্যাংকিং খাত থেকে সঞ্চয়পত্রের দিকে তহবিল রিডাইরেক্ট করেছিল। এটি ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকট বাড়িয়েছিল।
২০১৯ সালে বিদেশী তহবিলের অন্তর্ভুক্তি
২০১৯ সালে সার্বিক বিদেশী তহবিলের অন্তর্ভুক্তি সন্তোষজনক ছিল না। আমি আগেই উল্লেখ করেছি, অন্য উদীয়মান বাজারগুলো ২০১৯ সালে ভালো নৈপুণ্য দেখিয়েছে, ভালো করেছে। কিন্তু আমাদের পুঁজিবাজার ঋণাত্মক প্রবণতায় পর্যবসিত হয়েছিল। কয়েকটি কারণে এটি আলোচনা করা দরকার। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও মার্কেট অপারেটরের মধ্যকার ভূমিকা বিচ্ছিন্ন করতে বিশ্লেষকরা এটিতে গুরুত্ব দিয়েছেন। বাংলাদেশের মোট বাজার মূলধনে গ্রামীণফোনের একার অংশই ১৪ শতাংশ এবং বিদেশী বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য অংশই প্রতিষ্ঠানটির। অবশ্য নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও কোম্পানিগুলোর মধ্যকার উত্তেজনা বিদেশী বিনিয়োগকারীদের আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। অন্য উদাহরণ হতে পারে ব্যাংকিং খাত এবং ঋণের সুদহার এক অংকে নির্ধারণ বা নামিয়ে আনার ইস্যু। নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ ও শিল্পের মধ্যকার এসব উত্তেজনা বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো, বিনিময় হার। কিছু বিশ্লেষক বলেন, আমাদের মুদ্রা তাত্পর্যজনকভাবে অতিমূল্যায়িত। যদি বিদেশী বিনিয়োগকারীরাও একই ধারণা পোষণ করেন, তাহলে এটি বোধগম্য যে তারা নতুন বিনিয়োগ আনেননি। সংশোধনের সময়ে বিনিময় হার পড়ে যাওয়ার শঙ্কার কারণে এটি মূলত হয়েছে।
সামষ্টিক অর্থনৈতিক পর্যায়ে আমাদের রেকর্ড উচ্চ আর্থিক ঘাটতি উল্লিখিত বছরে ব্যাংকিং খাতের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করেছে। ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঘাটতি মেটাতে ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা নেয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এটি ব্যক্তি খাতের ঋণ পাওয়া হুমকিতে ফেলবে বলে অনেকে মনে করেন। এটি সেই সময়ে ঘটেছে, যখন লিকুইডিটি ক্রাইসিস বিস্তৃত হয়েছে। এটি ঋণাত্মক বিনিয়োগ মনোভাবকে লালন করবে।
এছাড়া আলোচ্য বছরে এমন সব ঘটনা ঘটেছে, যেখানে নিয়ন্ত্রকদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সিটি অব লন্ডন ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (সিএলআইএম) ইউনিটহোল্ডারের অনুমোদন ছাড়া ক্লোজড অ্যান্ড মিউচুয়াল ফান্ডগুলোর মেয়াদ সম্প্রসারণে অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানিগুলোকে সুযোগ দেয়ার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিরুদ্ধে মামলা করেছিল; যেহেতু ইউনিটহোল্ডাররা অ্যাসেটের মালিক। ইবিএল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডের মেয়াদ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ২০১৯ সালে ফান্ডটির অবসায়ন থেকে মুনাফা পেতে সিএলআইএমকে বাধাগ্রস্ত করেছিল। এ ঘটনা বাংলাদেশে আইনের শাসন দ্বারা বিনিয়োগকারীদের অধিকার পর্যাপ্তভাবে সুরক্ষিত কিনা, তা নিয়ে সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করেছে।
পুঁজিবাজারের চিত্র কিছুটা তমসাচ্ছন্ন হলেও আমাদের ভোক্তা অর্থনীতি বেশ ভালো করছে। আমাদের মধ্যবিত্ত ও সচ্ছল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে এবং দক্ষিণ এশিয়ার বাজারের মধ্যে আমাদের শহুরে জনসংখ্যার গড় বেশি। সামর্থ্য ও মান বৃদ্ধির কারণে ভোক্তাবাজারে আমরা লক্ষণীয় বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ আশা করছি। এটি ছাড়াও আমরা আইটি ও প্রযুক্তি খাত সম্পর্কেও আশাবাদী। কারণ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং আইটি প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য কর সুবিধা প্রদানের মতো বিধি পরিবর্তন দ্বারা এটি ভবিষ্যতে আরো বিকশিত হবে। ২০১৯ সালে আমরা স্মার্টফোন উৎপাদক স্যামসাং, ভাইভোর দিক থেকেও এফডিআই আসতে দেখেছি। যদিও বাণিজ্য বিধিগুলোয় সাম্প্রতিক পরিবর্তন এক্ষেত্রে কিছুটা ভূমিকা রেখেছে, তবে আমি মনে করি যে ভোক্তা প্রবৃদ্ধি দ্বারাও দেশে আরো অধিক এফডিআই প্রবাহ আসবে।
আমাদের আরেকটি বিকাশমান খাত হালকা প্রকৌশল শিল্প (এলইএস), যা
তৈরি পোশাক শিল্প, জাহাজ ভাঙা শিল্প এবং কৃষিসহ প্রধান শিল্পগুলোর সঙ্গে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ বজায় রাখে। আলোচ্য খাত বিভিন্ন খুচরা যন্ত্রাংশ, হালকা যন্ত্রপাতি, ফ্যান, তারসহ বৈদ্যুতিক পণ্য প্রভৃতি উৎপাদন করে। আমাদের হালকা প্রকৌশল খাতের ব্যাপারে যেটি উল্লেখযোগ্য তা হলো, এটি বিদেশী প্রতিযোগীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে সক্ষম এবং এটি আমদানীকৃত বিভিন্ন যন্ত্রাংশের ব্যয়সাশ্রয়ী বিকল্প হিসেবে কাজ করছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বিকাশ বিস্তৃত হওয়ায় শিল্পগুলোর দিক থেকে চাহিদা ছাড়াও ভোক্তাপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। যথার্থ কারণেই প্রধানমন্ত্রী হালকা প্রকৌশল পণ্যকে চলতি বছরের বর্ষপণ্য ঘোষণা করেছেন। তিনি এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।
বিদেশী বিনিয়োগ অংশগ্রহণের ওপর পাবলিক ইস্যু রুলে পরিবর্তনের প্রভাব
পাবলিক ইস্যু-সম্পর্কিত সাম্প্রতিক পরিবর্তনগুলো বিদেশী বিনিয়োগ অংশগ্রহণ বা আকর্ষণের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে; কারণ ব্যতিক্রমী সুফল নিশ্চিতে খোদ ভোক্তাবাজারের আকার ও প্রবৃদ্ধির জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। কাজেই লক ইন পিরিয়ড যদি প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে বেশি হয়, তাহলে এটি বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে, ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এসব লক-ইন পিরিয়ডের কারণে প্রাথমিক পর্যায়ের কোম্পানিগুলো গুণগত ও মানসম্পন্ন বহিঃস্থ অর্থায়ন আকর্ষণে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে পারে। উপরন্তু, হাই ইনিসিয়াল বার্ন রেটসম্পন্ন উদ্ভাবনমূলক টেকনোলজি স্টার্টআপগুলোও তহবিল সংগ্রহে সমস্যায় পড়তে পারে। অবশ্য ব্যবসার প্রধান বিষয় যদি মৌলিকভাবে শক্তিশালী হয়, তাহলে এটি সমস্যা হবে না।
২০২০ সালের জন্য প্রত্যাশা ও চ্যালেঞ্জ
সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে যে ২০১৫-২০৫০ সময়পর্বের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতির তিনটি অর্থনীতির একটি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশের। আমাদের ভোক্তা অর্থনীতি একটি স্বাস্থ্যকর-সবল হারে বাড়ছে এবং সামনের বছরগুলোয় এটি আমাদের বিনিয়োগকারীদের জন্য আকর্ষণীয় বাজার হবে।
তবে আমাদের অর্থনৈতিক নৈপুণ্য ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে উচ্চমাত্রার সমরৈখিকতা বজায় রাখে। খাতটি যেহেতু অন্য খাত ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে ব্যাপকভাবে সংযুক্ত, সেহেতু ব্যাংকিং খাতের সংস্কারসাধন খুব গুরুত্বপূর্ণ। করপোরেট সুশাসন প্রতিষ্ঠার চ্যালেঞ্জ অবশ্যই মোকাবেলা করতে হবে এবং আর্থিক শৃঙ্খলা ধারাবাহিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে। ব্যবসায় স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা এবং পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য সরকার ও শিল্প খাতের নেতাদের মধ্যকার সহযোগিতা অত্যধিক জরুরি।
মামুন রশীদ: অর্থনীতি বিশ্লেষক










