সম্প্রতি প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রমের গঠন প্রণালি ও তার বাস্তবায়ন জাতীয় চিন্তার এক বড় অংশে পরিণত হয়েছে। এখানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তনের দিকনির্দেশনা রয়েছে, যা ২০২৩ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রস্তাবিত জাতীয় শিক্ষাক্রমে উল্লেখ করা হয়েছে: ১. তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থা থাকবে না, থাকবে শিক্ষার্থী মূল্যায়ন; ২. দশম শ্রেণীর আগে কোনো পাবলিক পরীক্ষা হবে না, গুরুত্ব পাবে ক্লাস মূল্যায়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক পরীক্ষা; ৩. এইচএসসি পরীক্ষা হবে দুবার: প্রতি বিষয়ে ৫০ নম্বরের পরীক্ষা স্কুলেই হবে, বাকি ৫০ নম্বরের পরীক্ষা নেবে শিক্ষা বোর্ড ইত্যাদি।

প্রস্তাবিত নতুন পদ্ধতিকে প্রথমেই স্বাগত জানাই। কেননা পুরনো পদ্ধতির অভিজ্ঞতা যখন সুখকর না হয়, তখনই নতুনের মধ্যে ভালো কিছুর আশা থাকে। পুরনো পদ্ধতিতে লেখাপড়া মানেই ছিল চাপিয়ে দেয়া শিক্ষা, মুখস্থ বিদ্যা, অধিক নম্বরের প্রতিযোগিতা, সার্টিফিকেট উদ্ধার, আর ভালো রেজাল্টের জন্য কোচিং, গাইড নির্ভরতা। এর মধ্য দিয়ে লেখাপড়া হারিয়েছে জ্ঞানের মূল্য, প্রায়োগিক গুরুত্ব, আর বাস্তবতার মধ্যে নিজেকে বিকাশের সুযোগ। পরীক্ষা মানেই ছিল প্রতিযোগিতা; জ্ঞান অর্জনের চেয়ে গুরুত্ব পেত অধিক স্কোর প্রাপ্তি আর সহপাঠীদের টপকানোর আনন্দ। এ কাজে অনেক ফুয়েল জোগাত কোচিং আর গাইড বাণিজ্য। ফলে শিক্ষা বাণিজ্যের অন্যতম উপাদানে পরিণত হয়। দিনে দিনে বাড়তে থাকে শিক্ষা বণিকশ্রেণী। যেসব অভিভাবক প্রতিযোগিতামুখী শিক্ষা স্রোতের সঙ্গে তাল মেলানোর খরচ জোগাতে পারতেন না, তারা তাদের সন্তানদের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়তেন। ‘সারভাইভাল অব দ্য ফিটেস্ট’ নীতি মেনে নিতে বাধ্য হতেন। লেখাপড়ায় পিছিয়ে পড়াকে নিয়তির পরিহাস মনে করতেন। এসব বিবেচনায় নতুন কারিকুলামকে স্বাগত জানানোই স্বাভাবিক। আমি মনে করি, নতুন কারিকুলামের মধ্যে নতুনত্বের আকর্ষণ রয়েছে, সেই আকর্ষণের প্রতিফল আমরা দেখতে পাব। তবুও গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, পরিবর্তিত রূপরেখার ধরন ও অর্জনের চ্যালেঞ্জ কতটুকু তা দেখা।

নতুন রূপরেখার ধরনের মধ্যে যে বিষয়টা স্পষ্ট তা হলো, বার্ষিক পরীক্ষার চেয়ে শিখনকালীন মূল্যায়নকে অগ্রাধিকার দেয়া। এ রূপরেখায় দেখানো হয়, নবম-দশম শ্রেণীর শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৫০ নম্বর এবং বার্ষিক মূল্যায়ন ৫০ নম্বর; চতুর্থ-পঞ্চম ও ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণীতে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ৬০ নম্বরের এবং বার্ষিক মূল্যায়ন হবে ৪০ নম্বরের। আর প্রথম-তৃতীয় শ্রেণীতে শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে ১০০ নম্বরের, বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই। এর মানে প্রতিযোগিতাকে বার্ষিক পরীক্ষাকেন্দ্রিক না করে ক্লাস অ্যাসেসমেন্টের ওপর জোর দেয়া হবে। প্রতিযোগিতা থাকবে কিন্তু এর উপকেন্দ্রকে গুরুত্ব

দিতে হবে।

প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো, ক্লাসে শিখনকালীন মূল্যায়ন কীভাবে হবে? এ মূল্যায়নের জন্য দরকার শিক্ষকের জ্ঞানগত ও গুণগত মান। আমরা জানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের সামাজিকীকরণ তিনভাবে হয়: শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সাহচর্যে, প্রতিষ্ঠানের নিয়মকানুন মানার প্রক্রিয়ায়, আর পাঠ্যপুস্তকের মধ্যে সন্নিবদ্ধ জ্ঞানচর্চার মধ্য দিয়ে। শিখনকালীন মূল্যায়ন অগ্রাধিকার পেলে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া অগ্রাধিকার পাবে। শিক্ষকের গুণগত মানের ওপর নির্ভর করবে শিখনকালীন মূল্যায়নের মান। প্রশ্ন হলো, আমরা কীভাবে সেই মানে পৌঁছতে পারব? আমরা হয়তো বলব অনেক উন্নত দেশে শিখনকালীন মূল্যায়নকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। তাই আধুনিক বিশ্বের শিক্ষা মানের সঙ্গে তাল মেলাতেই হবে। যেমন ইংল্যান্ডের কথাই যদি বলি, সেখানে ১৯৪৪ সালের শিক্ষা আইন অনুযায়ী শিক্ষাকে অভিন্ন নীতিমালায় আনা হয়, শিক্ষাগত ব্যবধান লাঘবে শিক্ষাকে পাবলিক স্কুলিংয়ের আওতায় নিয়ে আসা হয়, আর শিক্ষা কার্যক্রমের সার্বিক তত্ত্বাবধানের জন্য ১৪৬টি স্থানীয় শিক্ষা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়; এমনকি ১৯৭২ সালের জেমস রিপোর্টের আলোকে শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য সুবিন্যস্ত সুপারিশ প্রণীত হয়।

এর মানে উচ্চমানের শিখনকালীন মূল্যায়ন তখনই সম্ভব যখন প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উচ্চমানের শিক্ষক নিয়োগ ও তত্সংশ্লিষ্ট উচ্চতর নীতিমালা থাকবে। আমরা এও জানি, যেসব উন্নত দেশের সঙ্গে তাল মেলাতে চাই, সেসব দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষকের বেতন পাবলিক হাসপাতালের একজন ডাক্তারের চেয়ে বেশি। যেখানে মেধাবীরাই শিক্ষক হতে চাইবেন, সেখানে মেধাবী শিক্ষকদের মাধ্যমে ন্যায্য মূল্যায়ন আশা করতে পারি। এর ব্যত্যয় হলে শিখনকালীন মূল্যায়ন তার ন্যায্যতা হারাতে পারে। প্রাথমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকের শিক্ষকদের গুণগত মান বৃদ্ধির আধুনিক কৌশল নিরূপণ ও বাস্তবায়ন না করলে শিখনকালীন মূল্যায়ন দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে পড়ার সম্ভাবনাই অধিক। একজন গণিতের বা ইংরেজির শিক্ষক এমনভাবে পড়াতে চাইবেন (ব্যতিক্রম বাদে), যাতে ছাত্রছাত্রীরা স্যারের বাসায় গিয়ে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য হয়। যারা প্রাইভেট পড়বে না আর যারা পড়বে, তারা সবাই কি ন্যায্য মূল্যায়ন পাবে? তখন কোচিং আর গাইড বাণিজ্য ভিন্নরূপে দেখা দেয়াই স্বাভাবিক। যাদের প্রাইভেট পড়ার সামর্থ্য নেই, তারা আবার সেই নিয়তিবাদের অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হবে। যদি ধরেই নিই যে শিক্ষকদের প্রাইভেট পড়ানো বন্ধ করলে এর আশু ফল আসবে, সেক্ষেত্রে দুই ধরনের ঝুঁকি আছে: অজ্ঞাতসারে নিজ বাসা বা অন্য স্থানে প্রাইভেট পড়াতে পারে, তা না হলে ভালো মানের শিক্ষক অন্য পেশা বেছে নিতে পারেন। ফলে শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত হবে ভালো শিক্ষকের শিক্ষণ থেকে আর শিখনকালীন মূল্যায়নের ন্যায্যতা থেকে। মূল্যায়নের অন্যায্যতা শিক্ষার্থীদের মনে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করবে। আর তখন ‘ভালো থাকা’ নামের বই পড়ানো হলেও অনেকেই ভালো থাকতে পারবে না।

শিখনকালীন মূল্যায়নের আরেকটা ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ আছে, যা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে আন্তঃপ্রতিষ্ঠান প্রতিযোগিতা রয়েছে। সরকারের বা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নজর কাড়তে সেই প্রতিযোগিতা ভিন্ন মাত্রা পেতে পারে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের রেজাল্টের উচ্চমান দেখাতে চেষ্টা করবে। এ চেষ্টায় বাধা ছিল সমন্বিত পাবলিক পরীক্ষা। অথচ ৫০ নম্বরের পরীক্ষা যদি স্কুলের হাতেই থাকে, আর বাকি ৫০ নম্বরের পরীক্ষা শিক্ষা বোর্ড নেয়, তাহলে প্রতিটা প্রতিষ্ঠান ৫০ শতাংশ সুযোগ কাজে লাগিয়ে মূল্যায়নের ন্যায্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে। যেহেতু প্রাইভেট ও পাবলিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষা কাঠামোয় বিদ্যমান, সেজন্য প্রাইভেট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ব্যবসায়িক চিন্তা থাকবে, সেই চিন্তা থেকে ৫০ শতাংশ সুযোগ খাটিয়ে প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান চাইবে তাদের মানের স্বীকৃতি। ভালো স্বীকৃতি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকে শিক্ষাবান্ধব না করে ব্যবসাবান্ধব করতে পারে। এ কারণে শিখনকালীন মূল্যায়ন নীতি ও আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে পারে। এ অবস্থায় কীভাবে এই আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করা যায়, সে ব্যাপারে সুস্পষ্ট ধারণা পাইনি।

আমি মনে করি, এক্ষেত্রে কিছু সংস্কার ও নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা জরুরি।

১. প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার নীতি ও কৌশল বাস্তবায়ন এবং তদারকির জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা কমিশন গঠন করা  প্রয়োজন। ২.  এ কমিশনের কাজ হবে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় স্থাপন এবং প্রতিটি স্তরের শিক্ষার প্রায়োগিক দিক তদারকি। ৩. শিখনকালীন মূল্যায়নের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করবে স্বতন্ত্র শিক্ষা কমিশন, যা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কার্যকর হতে পারে। ৪. স্বতন্ত্র শিক্ষা কমিশন প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত শিক্ষকদের জন্য শিক্ষা বাজেট পরিধি বৃদ্ধিপূর্বক নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় আলোচনা সাপেক্ষে তা চূড়ান্ত ও বাস্তবায়ন করবে, যাতে এর নেতিবাচক প্রভাব শিখনকালীন মূল্যায়নের ওপর না পড়ে। ৫. প্রত্যেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিখনকালীন মূল্যায়নের রিপোর্ট নীতিমালা সাপেক্ষে শিক্ষা কমিশনে পেশ করবে; শিক্ষা কমিশন তদারকির ভিত্তিতে সে মূল্যায়ন গ্রহণ বা পরিমার্জনের ব্যবস্থা করবে। শিখনকালীন মূল্যায়নের প্রায়োগিক ন্যায্যতা যাচাই করে এ পদ্ধতি কতটুকু কার্যকর তার ওপর প্রতিবেদন পেশ করবে শিক্ষা কমিশন। সে আলোকে ভিন্ন মানসম্পন্ন পদ্ধতির প্রস্তাব পেশ করতে পারবে। ৬. মানসম্পন্ন শিক্ষা কমিশন গঠনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে অভিজ্ঞতা, নিষ্ঠা ও নির্মল ব্যক্তিত্ব বিবেচনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের  অধ্যাপক, আইনজ্ঞ, বিজ্ঞানবিদ ও শিক্ষা সচিবদের নিয়ে ১০ সদস্যের কেন্দ্রীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করতে হবে। প্রতিটি জেলায় শিক্ষা কমিশনের শাখা থাকবে। প্রত্যেক শাখায় শিক্ষানীতি অনুযায়ী শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে।

আমরা আশা করি, পাঠ্যপুস্তকের মান বৃদ্ধি এবং শিক্ষানীতি বাস্তবায়নের জন্য স্বতন্ত্র শিক্ষা কমিশন গঠনের দিকটি সরকার আগামীতে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।

 

ড. আশেক মাহমুদ: সহযোগী অধ্যাপক

সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়