বাংলাদেশের জনগণের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি স্তরে চীনের উপস্থিতি এখন এতটাই স্বাভাবিক যে আমরা তা আলাদা করে খেয়াল করি না। সংখ্যার দিকে তাকালে ছবিটা স্পষ্ট হয়। চীনের কাস্টমস পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সালে চীন থেকে বাংলাদেশে পণ্য এসেছে ২ হাজার ২১০ কোটি ডলারের; ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪৫০ কোটি এবং ২০২৫ সালে তা পৌঁছেছে ২ হাজার ৭৩০ কোটি ডলারে। বিপরীতে বাংলাদেশ থেকে চীনে রফতানি ওই তিন বছরে যথাক্রমে ছিল মাত্র ৯৮, ১২০ ও ১৪২ কোটি ডলার। সহজ ভাষায় বললে, চীন আমাদের কাছে ১৯ টাকার পণ্য বিক্রি করলে আমরা তাদের কাছে বিক্রি করতে পারি মোটে ১ টাকার। অথচ এ অসম চিত্রের পাশেই আছে আরেক বাস্তবতা। চীন এখন বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার, বৃহত্তম অবকাঠামো ঋণদাতা, প্রধান সমরাস্ত্র সরবরাহকারী এবং ক্রমবর্ধমান হারে আমাদের শিক্ষার্থীদের গন্তব্য। প্রশ্ন হলো, এ সম্পর্ক কি উন্নয়নের অংশীদারত্ব, নাকি কাঠামোগত নির্ভরতা? উত্তরটি সহজ নয়। ২০২৬ সালের নভেম্বরে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সদ্য সম্পাদিত বাণিজ্য চুক্তির প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটি এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে জরুরি।

শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, বিআরআই ও চীনা বিনিয়োগ

প্রথমে সুযোগের দিকটি দেখা যাক। চীন সম্প্রতি বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দিয়েছে। অর্থাৎ কাগজে-কলমে ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল ভোক্তাবাজারের দরজা আমাদের জন্য খোলা। এমন সুবিধা যুক্তরাষ্ট্র কোনোদিন দেয়নি, ইউরোপ দিয়েছে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে, যা উত্তরণের পর ধাপে ধাপে উঠে যাবে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) আওতায় অবকাঠামোয় চীনা অর্থায়নের ছাপও এখন দৃশ্যমান। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ চালু হওয়ায় ঢাকা থেকে যশোর এখন কয়েক ঘণ্টার পথ, কর্ণফুলীর তলদেশে টানেল দিয়ে গাড়ি চলছে, পায়রার বিদ্যুৎ কেন্দ্র জাতীয় গ্রিডে যোগ করছে ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। গত বছর প্রধান উপদেষ্টার বেইজিং সফরে এসেছে ২০০ কোটির বেশি ঋণ, অনুদান ও বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি, যার মধ্যে মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে ৪০ কোটি ডলার উল্লেখযোগ্য। এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ঋণ টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ অমূলক নয়, তবে স্বীকার করতে হবে, এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ঋণ ব্যবস্থাপনায় তুলনামূলক সতর্কতার পরিচয় দিয়েছে। বিনিয়োগের প্রবাহও ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৩ সালে ৬৫ কোটি, ২০২৪ সালে ৮৫ কোটি এবং ২০২৫ সালে ৯২ কোটি ডলারের চীনা বিনিয়োগ এসেছে, যার বড় অংশই বস্ত্র ও বিদ্যুৎ খাতে। লক্ষণীয়, এ দুই খাতই আমাদের রফতানিমুখী শিল্পের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজের কেন্দ্রে। অর্থাৎ সঠিক নীতি পেলে যে বিনিয়োগ আজ আসছে, সেটিই আগামীকাল আমদানি বিল কমানোর হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।

শুল্কমুক্ত সুবিধায়ও রফতানি বাড়ছে না কেন

এখানেই এ সম্পর্কের কেন্দ্রীয় ধাঁধা। ৯৮ শতাংশ পণ্যে শূন্য শুল্ক পাওয়ার পরও চীনে আমাদের রফতানি দেড় বিলিয়ন ডলারের ঘর পেরোতে পারছে না। কারণটি শুল্ক নয়, কাঠামো। বাংলাদেশ চীনে বিক্রি করে চামড়া, পাট, হিমায়িত খাদ্য ও সাধারণ পোশাকের মতো কম মূল্য সংযোজনের পণ্য; আর কেনে বস্ত্র যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, রাসায়নিক ও মূলধনি যন্ত্রের মতো উচ্চ মূল্যের পণ্য। বাণিজ্য ভারসাম্য যে এতটা একপেশে, তার বড় কারণই বস্ত্র খাতের যন্ত্রপাতি আমদানির বিপুল পরিমাণ। যে দেশ পোশাক বেচে সংসার চালায়, তার সেলাই মেশিন, সুতা আর কাপড় আসে প্রতিযোগীর কারখানা থেকে।

এ নির্ভরতা কতটা ভঙ্গুর, তা আমরা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলাম ২০২০ সালের গোড়ায়। উহানে করোনা ছড়িয়ে পড়ায় চীনের কারখানাগুলো যখন বন্ধ হয়ে গেল, গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের শত শত পোশাক কারখানা কাঁচামালের অনিশ্চয়তায় পড়েছিল, ক্রয়াদেশ হাতে নিয়েও মালিকরা জানতেন না উৎপাদন চালু রাখতে পারবেন কিনা। শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির ৩০-৩৫ শতাংশ একটি মাত্র দেশ থেকে আসার অর্থই হলো, সে দেশে হাঁচি দিলে আমাদের জ্বর আসে। মহামারী কিংবা ভূরাজনৈতিক সংকটে এ নির্ভরতা মুহূর্তেই দুর্বলতায় রূপ নিতে পারে। আম-কাঁঠাল রফতানির প্রতীকী কূটনীতি দিয়ে এ ব্যবধান কমবে না। টেকসই সমাধান একটাই। চীনা কারখানাকে বাংলাদেশের ভেতরে আনা, যাতে যে সুতা ও কাপড় আজ আমদানি হয় তা আগামীকাল দেশেই উৎপাদিত হয়ে রফতানি আয়ে যুক্ত হয়।

শ্রীলংকার সতর্কবার্তা, ভিয়েতনামের অনুপ্রেরণা

এ পথে আমাদের সামনে দুটি আয়না আছে। প্রথমটি শ্রীলংকা। হাম্বানটোটা বন্দরের ঋণ শোধ করতে না পেরে দেশটিকে বন্দরটি ৯৯ বছরের জন্য চীনা কোম্পানির হাতে তুলে দিতে হয়েছিল, যা আজও ঋণনির্ভর উন্নয়নের ঝুঁকির সবচেয়ে উদ্ধৃত উদাহরণ। দ্বিতীয় আয়নাটি ভিয়েতনাম। মার্কিন-চীন বাণিজ্যযুদ্ধের সুযোগে দেশটি চীনা ও বহুজাতিক কারখানাকে নিজের মাটিতে টেনে এনেছে, ফলে যে পণ্য আগে চীন থেকে রফতানি হতো, তা এখন ভিয়েতনামের কারখানা থেকে বিশ্ববাজারে যাচ্ছে এবং রফতানি আয়ে দেশটি আমাদের অনেকটাই পেছনে ফেলেছে। শিক্ষাটি পরিষ্কার। চীনের টাকা নিজে কোনো আশীর্বাদ বা অভিশাপ নয়; প্রশ্ন হলো, টাকাটা কোথায় যাচ্ছে। ভাড়া করা অবকাঠামোয় গেলে তা শ্রীলংকার পথ, উৎপাদনশীল কারখানায় গেলে ভিয়েতনামের পথ। বাংলাদেশকে এখন বেছে নিতে হবে কোন আয়নায় সে নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে চায়।

প্রতিরক্ষায় ৬৭ শতাংশের প্রশ্ন

বাণিজ্যের বাইরে সম্পর্কের আরেকটি স্তম্ভ প্রায়ই আলোচনার বাইরে থেকে যায়। বাংলাদেশের সমরাস্ত্র আমদানির প্রায় ৬৭ শতাংশ আসে চীন থেকে। নৌবাহিনীর সাবমেরিন ও যুদ্ধজাহাজ থেকে সেনাবাহিনীর ট্যাংক, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা থেকে খুচরা যন্ত্রাংশের সরবরাহ, প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের পুরো ইকোসিস্টেমই গড়ে উঠেছে চীনা প্রযুক্তির ওপর। এখানে একটি কঠিন সত্য মনে রাখা দরকার। বাণিজ্যনির্ভরতা চাইলে কয়েক বছরে বহুমুখী করা যায়; কিন্তু প্রতিরক্ষানির্ভরতা বদলাতে লাগে দশক, কারণ অস্ত্রের সঙ্গে আসে প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির শেকল। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তুরস্কের মতো নতুন উৎস থেকে সমরাস্ত্র কেনার মধ্য দিয়ে ঢাকা বহুমুখীকরণের সূচনা করেছে বটে, তবে তা এখনো প্রান্তিক পর্যায়ে। ফলে পশ্চিমা বিশ্বের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলে যুক্ত হওয়ার যে চাপ ঢাকার ওপর বাড়ছে, তার সঙ্গে এ নিরাপত্তানির্ভরতার ভারসাম্য রক্ষাই হবে সামনের দিনের কঠিনতম কূটনৈতিক পরীক্ষা।

সহযোগিতার সুযোগ হবে শ্রেণীকক্ষ থেকে কারখানা

সম্পর্কের নরম স্তরটিও উপেক্ষণীয় নয়। ২০২৫ সালের হিসাবে প্রায় ১৪ হাজার ৮০০ বাংলাদেশী শিক্ষার্থী চীনে অধ্যয়নরত, যাদের বড় অংশই পড়ছেন চীন সরকারের বৃত্তিতে। বছরে প্রায় ৪২ হাজার ৫০০ পর্যটক ও ব্যবসায়ী দুই দেশে যাতায়াত করছেন, আর দেশে সক্রিয় রয়েছে তিনটি ভাষা ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। তাৎপর্যপূর্ণ হলো, এ শিক্ষা বিনিময়ের প্রধান ক্ষেত্র বস্ত্র প্রকৌশল ও ডিজাইন। অর্থাৎ যে খাতে চীনা বিনিয়োগ আসছে, ঠিক সে খাতের দক্ষ জনশক্তিই তৈরি হচ্ছে চীনের শ্রেণীকক্ষে। এ তরুণরা যখন ডিগ্রি নিয়ে ফিরবেন, তারা শুধু চাকরিপ্রার্থী নন, তারা হতে পারেন প্রযুক্তি হস্তান্তরের জীবন্ত সেতু। পাশাপাশি দেশের ভেতরেও চীনা ভাষা শেখার চাহিদা বাড়ছে চোখে পড়ার মতো। চীনা কোম্পানিগুলোর প্রকল্প ও কারখানায় দোভাষী ও মধ্যম পর্যায়ের ব্যবস্থাপকের চাহিদা এতটাই যে মান্ডারিন জানা তরুণদের বেতন সাধারণ স্নাতকদের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি। নীতিনির্ধারকরা এসবকে শুধু শিক্ষা খাতের বিষয় ভাবলে ভুল করবেন; এটি প্রকৃতপক্ষে ভবিষ্যৎ শিল্পায়নের মানবসম্পদ পাইপলাইন।

‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ শর্তের ছায়া

এতক্ষণের হিসাবনিকাশ যদি কেবল দ্বিপক্ষীয় হতো, নীতিগত উত্তরও তুলনামূলক সহজ হতো। কিন্তু বাস্তবতা ত্রিভুজাকার, আর ত্রিভুজের তৃতীয় বাহুটির নাম যুক্তরাষ্ট্র। মনে রাখা দরকার, আমাদের রফতানি আয়ের সিংহভাগ আসে পশ্চিমা বাজার থেকে, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র একক বৃহত্তম গন্তব্য। এ খাতের সঙ্গে জড়িয়ে আছে প্রায় ৫০ লাখ পোশাক শ্রমিকের রুটি-রুজি, যাদের বেশির ভাগই নারী। সাম্প্রতিক শুল্ক আলোচনায় ওয়াশিংটন এ নির্ভরতাকেই ব্যবহার করেছে দরকষাকষির হাতিয়ার হিসেবে। শুরুতে ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছিল ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের খড়্গ; দীর্ঘ আলোচনায় হার কমে এলেও প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে আমাদের ব্যবধান এখন এতই সামান্য যে উৎপাদন ব্যয় সামান্য বাড়লেই ক্রয়াদেশ প্রতিবেশীর কারখানায় সরে যেতে পারে।

তবে আসল কাঁটা লুকিয়ে আছে চুক্তির ভেতরে। বিশ্লেষকদের অভিমত, সদ্য সম্পাদিত পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তিতে ‘নন-মার্কেট ইকোনমি’ হিসেবে চিহ্নিত দেশগুলোর সঙ্গে নতুন বাণিজ্য চুক্তির পথ কার্যত সংকুচিত করা হয়েছে। কথাটা শুনতে জটিল, অর্থটা সহজ। যুক্তরাষ্ট্র যেসব দেশের অর্থনীতিকে রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত মনে করে, সেগুলোই তাদের ভাষায় নন-মার্কেট ইকোনমি, আর সে তালিকার শীর্ষেই আছে চীন। অর্থাৎ চীনের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মতো বড় পদক্ষেপে গেলে ওয়াশিংটনের খড়্গ আবার নেমে আসার ঝুঁকি থাকছে। অথচ যে দেশ থেকে আসে শিল্পের এক-তৃতীয়াংশ কাঁচামাল, ৬৭ শতাংশ সমরাস্ত্র এবং বৃহত্তম অবকাঠামো ঋণ, তার সঙ্গে রাতারাতি দূরত্ব তৈরি কোনো নীতি সুইচ নয়; এটি এক দশকের কাঠামোগত প্রকল্প। সময়ও অনুকূল নয়। আঙ্কটাডের হিসাবে এলডিসি উত্তরণের পর বাংলাদেশের বার্ষিক রফতানি আয়ের প্রায় ১৪ শতাংশ বা ৫ হাজার ৭৩ কোটি ডলার পর্যন্ত ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে। চীন উত্তরণ-পরবর্তী তিন বছর পর্যন্ত শুল্কমুক্ত সুবিধা অব্যাহত রাখার আগ্রহ দেখিয়েছে; এবং এটিকে চলমান রাখার জন্য চেষ্টা চালিয়ে নেয়া যেতে পারে। ত্রিভুজের কথা বললেও হিসাবটা আসলে চতুর্ভুজের, কারণ পাশেই আছে ভারত। আমাদের দ্বিতীয় বৃহত্তম আমদানি উৎস ও নিকটতম প্রতিবেশী দিল্লি ঢাকার প্রতিটি চীনমুখী পদক্ষেপ গভীর মনোযোগে পর্যবেক্ষণ করে। তিস্তা প্রকল্পের মতো উদ্যোগ কে বাস্তবায়ন করবে, সে প্রশ্নও তাই আর নিছক প্রকৌশলের থাকে না, হয়ে ওঠে কূটনীতির। দড়ির ওপর হাঁটার এ খেলায় ভুলের মাশুল গুনতে হবে পুরো অর্থনীতিকে, আর সবার আগে গুনবেন সেই পোশাক শ্রমিকরাই।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর ও তার সম্ভাব্য প্রভাব

এ আলোচনা আরো প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক চীন সফরের পর। সফরে দুই দেশ সম্পর্ককে নতুন যুগে চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের অংশীদারত্বে উন্নীত করার ঘোষণা দেয়। স্বাক্ষরিত হয় ১৫টি সমঝোতা স্মারক, দুটি চুক্তি এবং ১৬ দফা যৌথ ইশতাহার, যার পরিধি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, সংযোগ, সবুজ উন্নয়ন, শিক্ষা ও সংস্কৃতি পর্যন্ত বিস্তৃত। চীন প্রায় ৩০ কোটি ডলার অনুদান সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আর ঢাকা বিভিন্ন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের চীনা অর্থায়ন চেয়েছে। শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বাণিজ্য ঘাটতি কমানো ও রফতানি বহুমুখীকরণে চীনের সহযোগিতা চেয়েছেন। পাশাপাশি পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় পর্যায়ে ‘টু প্লাস টু’ সংলাপ চালুর সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ, যা সম্পর্ককে বাণিজ্যের গণ্ডি ছাড়িয়ে কৌশলগত স্তরে নিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত।

সফরের সবচেয়ে আলোচিত ফল সম্ভবত তিস্তা। দেড় দশকের ভারত-বাংলাদেশ আলোচনায় যে প্রকল্প এগোয়নি, সেই তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে চীন সাধ্যের মধ্যে সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং দুই দেশ দ্রুত সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন করতে সম্মত হয়েছে। দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রকল্পটি ‘বিলম্ব ছাড়াই’ এগোবে। উত্তরাঞ্চলের কোটি মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে জড়িত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা হবে দৃশ্যমান জনকল্যাণ; তবে ভারত সীমান্তের এত কাছে চীনা কোম্পানির উপস্থিতি দিল্লির নিরাপত্তা ভাবনায় নতুন মাত্রা যোগ করবে, সে বাস্তবতাও অস্বীকারের উপায় নেই।

দ্বিতীয় বড় আলোচ্য ছিল প্রস্তাবিত চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডর। ইউনান প্রদেশ থেকে মিয়ানমার হয়ে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর পর্যন্ত বিস্তৃত এ সংযোগ বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধে পরিণত হতে পারে, কমতে পারে পরিবহন ব্যয়, বাড়তে পারে শিল্প বিনিয়োগ। তবে রাখাইনসহ মিয়ানমারের চলমান সংঘাত করিডরের স্থলপথকে আপাতত অনিশ্চিত করে রেখেছে। তবে সমুদ্রপথে চট্টগ্রাম বা মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে আরাকানের চকফু সমুদ্রবন্দরের মধ্যে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ, চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডরের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এর মধ্য দিয়ে চীনের কুনমিং থেকে মিয়ানমারের মান্দালে ও চকফু হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত একটি অর্থনৈতিক করিডর শিগগিরই চালু করা সম্ভব। এর বাইরে সফরে চীনা শিল্প স্থানান্তর, চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় বাংলাদেশের অংশীদারত্বে সমর্থন এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন আলোচনায় সহায়তার প্রতিশ্রুতিও এসেছে।

সফরটি নিয়ে বিশ্লেষকদের পাঠ দুই রকম। কেউ একে বেইজিংমুখী ঐতিহাসিক মোড় হিসেবে দেখছেন, কেউ বলছেন এটি নিছক বাস্তববাদী অর্থনৈতিক কূটনীতি; প্রধানমন্ত্রী নিজে একে কোনো পক্ষ বেছে নেয়া নয়, বরং সবার আগে বাংলাদেশ নীতির প্রকাশ বলে ব্যাখ্যা করেছেন। প্রভাব যেদিকেই গড়াক, একটি বিষয় স্পষ্ট: সফরের প্রতিশ্রুতিগুলো এ নিবন্ধে আলোচিত সুযোগ ও ঝুঁকি দুটোকেই বড় করেছে। অনুদান, বিনিয়োগ, তিস্তা ও করিডর যেমন সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলেছে, তেমনি গভীরতর কৌশলগত সম্পৃক্ততা ওয়াশিংটন ও দিল্লির সঙ্গে ভারসাম্য রক্ষার কাজটিকে করেছে আরো সূক্ষ্ম। শেষ বিচারে প্রতিশ্রুতিকে প্রকল্পে এবং প্রকল্পকে জনকল্যাণে রূপান্তরের দক্ষতাই নির্ধারণ করবে—এ সফর ইতিহাসে কীভাবে লেখা থাকবে।

ভারসাম্যের অর্থনীতি, ভারসাম্যের কূটনীতি

তাহলে পথ কী? চারটি করণীয় স্পষ্ট। প্রথমত, চীনা বিনিয়োগকে সুনির্দিষ্টভাবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে প্রবাহিত করতে হবে। স্পিনিং, ডায়িং, ফ্যাব্রিক ও যন্ত্রাংশ সংযোজনে চীনা কারখানা দেশে এলে একদিকে আমদানি বিল কমবে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান ও রফতানি সক্ষমতা বাড়বে। চট্টগ্রামের আনোয়ারায় নির্মাণাধীন চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোয় এ খাতে লক্ষ্যভিত্তিক প্রণোদনা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, ৯৮ শতাংশ শুল্কমুক্ত সুবিধার জানালাটি কাজে লাগাতে ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, কৃষি প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ও হালকা প্রকৌশল পণ্যে চীনের বাজার উপযোগী রফতানি উন্নয়ন কর্মসূচি নিতে হবে। চীনের মধ্যবিত্ত ভোক্তা কী কেনে, কোন মানদণ্ড চায়, কোন ই-কমার্স প্লাটফর্মে কেনাকাটা করে, তা না জেনে শুধু দরজা খোলা রাখলে লাভ নেই; দরজা দিয়ে ঢোকার মতো পণ্যও লাগবে। পাটের বহুমুখী পণ্য, হিমায়িত চিংড়ি কিংবা সিরামিকের মতো যেসব খাতে আমাদের সক্ষমতা আছে, সেগুলোকে চীনা ভোক্তার রুচি ও মান অনুযায়ী ঢেলে সাজানোই হতে পারে প্রথম পদক্ষেপ। তৃতীয়ত, এলডিসি-পরবর্তী তিন বছরের ট্রানজিশন সুবিধাকে কূটনৈতিকভাবে নিশ্চিত করতে হবে, তবে পূর্ণাঙ্গ মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির মতো স্পর্শকাতর পদক্ষেপে যাওয়ার আগে মার্কিন চুক্তির শর্তগুলোর আইনি পরিসর খুঁটিয়ে বুঝে নেয়া জরুরি। চতুর্থত, চীনে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীদের দক্ষতাকে শিল্পনীতির অংশ করতে হবে। ফেরত আসা স্নাতকদের জন্য বস্ত্র ও প্রকৌশল খাতে চাকরি সংযোগ, উদ্যোক্তা ঋণ ও গবেষণা সুযোগ তৈরি করা গেলে তারাই হবেন দেশের কারখানায় প্রযুক্তি হস্তান্তরের সেতু। শেষ কথা হলো, বাংলাদেশের ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার পররাষ্ট্রনীতি আজ ইতিহাসের কঠিনতম পরীক্ষার মুখে। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের লক্ষ্য ওয়াশিংটন বা বেইজিংয়ের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়া নয়; লক্ষ্য হওয়া উচিত বেছে না নেয়ার অধিকারটুকু ধরে রাখা। আর সে অধিকারের ভিত্তি হবে ভারসাম্যপূর্ণ বাণিজ্য, বহুমুখী সরবরাহ শৃঙ্খল ও দৃঢ় অর্থনৈতিক কূটনীতি। সংখ্যাগুলো আমাদের সতর্ক করছে; এখন সিদ্ধান্ত নীতিনির্ধারকদের।

এসকে তৌফিক এম হক: অধ্যাপক ও পরিচালক, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি

মুমতাহিনাহ‍্ জসীম: গবেষণা সহযোগী, সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব পলিসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (এসআইপিজি), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি