ঢাকা শহরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে, ভূতত্ত্ববিদরা এমন আশঙ্কা করলেও জনবহুল এ নগরীতে পরিকল্পিত নগরায়ণ গড়ে ওঠেনি। এক্ষেত্রে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষকে (রাজউক) অভিযুক্ত করা হলেও তারা দায় চাপিয়েছে ভূমিদস্যুদের ওপর। আবার আবাসন কোম্পানিগুলো ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করে প্লট ব্যবসা চালিয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নীরবতা নিঃসন্দেহে দুঃখজনক। সম্প্রতি তুরস্ক ও সিরিয়ার ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির ঘটনার পর ঢাকাকে নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তার উদ্রেক হয়েছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, রাজধানীর অদূরে কেরানীগঞ্জে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) ঝিলমিল আবাসন প্রকল্প রয়েছে। ঝিলমিলের মতোই পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের বড় একটা অংশও ভূমিকম্প ও ভূমিধসের ঝুঁকিতে রয়েছে বলে জানিয়েছেন নগর বিশ্লেষকরা। ২০১৭ সালে শুরু ঝিলমিল প্রকল্পের আওতায় বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী ৪৮০ বিঘা জমিতে ৮৫টি বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ৬০টি ভবন হবে ২০ তলাবিশিষ্ট এবং বাকিগুলো ২৫ তলার। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার পরিবেশ-প্রকৃতি ও জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনায় সেখানে সুউচ্চ ভবন নির্মাণের প্রকল্পটি রাজউকের সঠিক সিদ্ধান্ত নয়। এছাড়া রাজউক অনুমোদিত আবাসন প্রকল্পগুলোর প্রায় সবই রাজধানীর পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাধার কিংবা নিচু ভূমি ভরাট করে গড়া হয়েছে। এগুলোও ভূমিকম্পের অতিঝুঁকিতে রয়েছে। ভূমিকম্প ও পরিবেশগত ঝুঁকি যাচাই ছাড়া আবাসন প্রকল্প ও ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয়ার বিষয়টি অপরিকল্পিত নগরায়ণের বহিঃপ্রকাশ। ফলে ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি স্বাভাবিকের চেয়ে তীব্রভাবে বেড়েছে।

রাজধানীতে ভূমির শ্রেণী পরিবর্তন করে আবাসন দীর্ঘদিন ধরেই হচ্ছে। বিশেষ করে জলাধার দখল করে সেখানে ভবন নির্মাণ করায় একদিকে যেমন শহরের উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভূমিকম্পের ঝুঁকি। এছাড়া নগরবাসী সুপেয় পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির প্রতি বেশি নির্ভর করায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরো বাড়ছে। ঢাকা ভূতাত্ত্বিক গঠনের দিক থেকে মধুপুর ট্র্যাক্টের অন্তর্ভুক্ত। যদিও এ ট্র্যাক্টের বেশির ভাগ অংশেরই মাটি শক্ত। সে হিসেবে প্রাকৃতিকভাবেই ঢাকায় ভূমিকম্পের প্রবণতা কম। তবে এ অঞ্চলে ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে থাকা কিছু ত্রুটিপূর্ণ ভূমি রয়েছে, এক্ষেত্রে গবেষকরা মূলত খাল-বিল ও নদ-নদীর পার্শ্ববর্তী ভূমিগুলোই ত্রুটিপূর্ণ ভূমি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এ বিবেচনায় রাজউকের গড়া পূর্বাচল নতুন শহর, ঝিলমিল ও উত্তরা থার্ড ফেজ—এ তিন আবাসন প্রকল্পই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে রয়েছে। তাছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ণের কারণে শক্ত মাটির এলাকায়ও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গবেষকরা সতর্ক করেছেন। সে হিসেবে ঢাকাকে এখন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ নগরী বলে গণ্য করা যায়।

এদিকে নগরায়ণ পরিকল্পনায় ভুল থাকলেও রাজউকের আবাসন প্রকল্পের কারণে নয়, বরং ভূমিদস্যুদের কারণে রাজধানীর শক্ত অংশেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি বাড়ছে বলে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে নদী ও খাল-বিল ভরাট করে আবাসন প্রকল্প নির্মাণকে কারণ হিসেবে দেখাচ্ছেন রাজউকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। যদিও এটাকে তারা কাঠামোগত ভুল হিসেবে স্বীকার করছেন, কিন্তু এ ভুলের মাশুল যে কতটা মারাত্মকভাবে দিতে হতে পারে তা চিন্তা করাও কঠিন। অন্যদিকে জলাভূমি ভরাটের কারণে সারা দেশে ভূ-গর্ভস্থ পানি রিচার্জ হচ্ছে না। ঢাকা শহরে বসবাসরত প্রায় দুই কোটি মানুষের নিত্য ব্যবহার্য পানির বেশির ভাগই নেয়া হচ্ছে ভূ-গর্ভস্থ উৎস থেকে। এটি ঢাকায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে তুলছে। অথচ ভূমির উপরিভাগের পানি ব্যবহারে যথাযথ পরিকল্পনা নেই, বরং জলাধার, খাল-বিল দখল করে সেখানে অপরিকল্পিতভাবে ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকার বাসযোগ্যতা বিনির্মাণে যথাযথ ওয়াটার মডেলিং তৈরি করা প্রয়োজন।

একটা বিষয় জলের মতো পরিষ্কার যে, ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের কাছে মানুষ বড় অসহায়। তুরস্ক, নেপাল, ইরান, ইন্দোনেশিয়া এমনকি জাপানের মতো দেশ যারা পরিকল্পিতভাবে নগরায়ণের ভিত্তিতে শহর গড়ে তুলেছিল তারাই ভূমিকম্পে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেখানে ঢাকার মতো অপরিকল্পিত শহরে যদি ভূমিকম্প হয় তাহলে কী পরিণতি হবে সেটা ভাবাটাই দুষ্কর। সার্বিকভাবে আমাদের দেশে ভূমিকম্প নিয়ে কোনো সমন্বিত পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। এর ফলে কোনো নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই ভবন গড়ে উঠেছে। এর সঙ্গে আমাদের অসচেতনতার বিষয়টি জড়িত। খোদ গ্রামেই এখন পুকুর ভরাট করে ভবন নির্মাণ করা হয়। সেখানে ঢাকা শহরে বুড়িগঙ্গা নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণের পাশাপাশি খাল ও জলাশয়গুলো দখল করে ভবন তৈরি করা হচ্ছে। ইউরোপ মহাদেশে অবস্থিত ইতালির ভেনিসের উদাহরণ বিশ্বজুড়ে অনন্য। কিন্তু এ উদাহরণ আমাদের দেশের রাজধানী ঢাকা শহরের জন্য যেন অরণ্যে রোদন হিসেবেই গণ্য হয়। 

ঢাকার বসবাসযোগ্যতার কথা বিবেচনা না করে শুধু মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের কথা ভাবা হয়েছে। ঠিক যেন পাহাড় কেটে বাস করা মানুষগুলোর মতো, সেখানে বৃষ্টির ফলে ভূমিধস হতে পারে এটা যেন ভাবাই হয়নি। একের পর এক ভবন শুধু নির্মাণ করা হয়েছে, কিন্তু ভবনগুলো বানাতে গিয়ে যে পানির প্রাকৃতিক উৎস এবং সঞ্চালনকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে সেটি দেখার যেন কারো সময় হয়ে ওঠেনি। শুধু বাণিজ্যিক চিন্তা করে এভাবে অবকাঠামো নির্মাণ করায় ঢাকা এখন ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ চাইলেই ঢাকা শহরের জলাশয়গুলো রক্ষা করে পরিকল্পিত শহর নির্মাণ করা যেত। কিন্তু সেটি না করে ঢাকাকে বিশ্বের বসবাসের অযোগ্য নগরীগুলোর তলানিতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

এভাবে ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ শহরে পরিণত করে বর্তমানে ঢাকা শহরকে নিয়ে নতুন করে চিন্তা করা হচ্ছে। বস্তুত খাল, জলাশয় যেগুলো দখল হয়ে গেছে সেগুলো পুনরুদ্ধার করার সাহসী পরিকল্পনা এখন প্রয়োজন। আর সেটি যদি নাও হয়, তাহলে অন্তত ‍যতটুকু জলাশয় এখনো অবশিষ্ট রয়েছে সেগুলো রক্ষা করতে হবে। এর সঙ্গে বিল্ডিং কোড মেনে ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে কিনা সেটি তদারকি করার জন্য রাজউকের অধিক তৎপরতা প্রয়োজন। এজন্য নিজেদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার কথা ভেবেই রাজউক কর্মকর্তাদের স্বচ্ছতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে। সেই সঙ্গে প্রয়োজনে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্যানেল তৈরি করে কীভাবে ঢাকা শহরে ভূমিকম্পের ঝুঁকি হ্রাস করা যায়, সেটির উপযুক্ত মডেল নির্মাণ করা জরুরি। একটা বিষয় মনে রাখতে হবে, দুর্যোগ এসে গেলে তখন অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তাই দুর্যোগ যেন না হয়, সেজন্য দুর্যোগ প্রতিরোধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করে ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী শহর হিসেবে নির্মাণ করতে হবে।