ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউটের (আইএবি) সভাপতি। তার আগ্রহের বিষয় বায়োক্লাইমেটিক আরবান ডিজাইন, টেকসই শহর ও সবুজ স্থাপত্য। রাজধানীর বুকে প্রথম মেট্রোরেল নির্মাণের নানা দিক, বিশেষ করে স্টেশন ডিজাইনে দেশীয় ঐতিহ্যকে ফুটিয়ে তোলা এবং স্থানীয় স্থাপত্যবিদদের যুক্ত করা নিয়ে তিনি বণিক বার্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আল ফাতাহ মামুন
বহু প্রতীক্ষা শেষে ঢাকাবাসী এখন মেট্রোরেলে যাতায়াত করছে, বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?
আমি অত্যন্ত খুশি যে দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে ঢাকাবাসী মেট্রোরেলের মতো আধুনিক গণপরিবহন পেয়েছে। পর্যায়ক্রমে এর যাত্রীসেবা আরো বাড়বে, নেটওয়ার্কও বড় হবে। আমার মনে হয়, ঢাকা শহরের যে বিশাল জনগোষ্ঠী, তাদের চলাচলে সঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছার বিষয়টি অনেক সহজ করে দেবে মেট্রোরেল। মেট্রোরেলের সবচেয়ে বড় সুবিধা ট্রাফিকের বাধা নেই। বাধাহীনভাবে গন্তব্যে পৌঁছার ব্যাপারটিই যাত্রীদের বেশি আকৃষ্ট করবে। পরবর্তী সময়ে যখন মেট্রোরেল আরো পরিধি নিয়ে চলবে তখনো একটা ব্যাপার দেখা যাবে, মেট্রোর কারণে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা অনেকাংশেই ফিরে আসবে। যেহেতু বড় সংখ্যক যাত্রী মেট্রোতে চলাচল করবে, এতে সড়কে যাত্রীর চাপ কমার পাশাপাশি যানের সংখ্যাও কমে আসবে। যেমন আমরা যাত্রীবাহী লঞ্চের কথা বলতে পারি। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর পরই সংশ্লিষ্ট নৌপথগুলোয় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। যাত্রী কমার পাশাপাশি অনেক নৌযানও কমে গেছে। এখন যারা নৌপথে যাতায়াত করছেন তারা নির্বিঘ্নে যাতায়াত করতে পারছেন। ঢাকার নগর জীবনে মেট্রোরেলের ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী।
মেট্রোর বাকি কাজগুলোর ক্ষেত্রে কোন বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া প্রয়োজন?
বাকি কাজগুলোর ক্ষেত্রে আরবান ডিজাইন তথা স্থাপত্য নকশার দৃষ্টিভঙ্গি মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। কোনো সন্দেহ নেই মেট্রোরেলের একেকটা স্টেশন বড় বড় স্থাপনা। যদি আমি স্থাপত্য নকশার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্টেশনগুলোর নকশা প্রণয়ন করি তাহলে শহরের সমস্যা সমাধানের পাশাপাশি শহরকে আরো বেশি নান্দনিক রূপও দিতে পারব। তাহলেই কেবল এগুলো ভ্যালু অ্যাডিশন করবে। শহরের যানজট সমস্যা মোকাবেলার একটা ব্যাপার তো আছেই, ভ্যালু অ্যাডিশনের বিষয়টিরও কিন্তু এখানে প্রয়োজন আছে। পোল্যান্ডের একটি সাবওয়ে ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হ্যারিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করেছে। বিশেষ করে ঢাকার মূল শহরের ভেতরে তাও আবার ঘনবসতি শহর, এমন জায়গায় পাতাল রেল স্থাপন করাটা বেশি যুক্তিযুক্ত বলে আমি মনে করি। কেননা আমাদের শহরের উপরের রাস্তাগুলোতেই শহরের ফাঁকা জায়গা, তো এ অবকাঠামোটা যদি শহরের নিচ দিয়ে করা যায়, হতে পারে শহরের বাইরে গিয়ে আবার ভূপৃষ্ঠে লাইন করা হলো, এতে সুবিধাই হবে। আলো-বাতাসের প্রয়োজনে এ খোলা জায়গা অপরিহার্য। নির্মাণকালীন যে ধকল নগরবাসী ও কর্তৃপক্ষকে পোহাতে হয় সেটা থেকেও বাঁচা যাবে। রেল চলার সময়ও নগরবাসী শব্দদূষণ থেকে বেঁচে যাবে। বিশেষভাবে একটি বিষয় বলতে চাই, মেট্রোরেলের স্টেশন ডিজাইনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশীয় মেধাকে প্রাধান্য দিতে হবে। আমাদের ডিজাইন সক্ষমতা ও ডিজাইন মান আন্তর্জাতিক মানের। আমাদের স্থপতিরা বহু বিদেশী কম্পিটিশনে নিজেদের সেরা প্রমাণ করতে পেরেছেন। বহু বিদেশী স্থপতিদের টেক্কা দিয়ে তারা পুরস্কার জিতেছেন। আমরা যদি এ সক্ষমতাকে ব্যবহার না করি, উল্টো বিদেশী পরামর্শকদের সুযোগ করে দিই, তাহলে আমাদের দেশীয় প্রতিভাকে বঞ্চিত করা হবে। পাশাপাশি নান্দনিক স্থাপনার যে কথা বললাম সে সুযোগও আমাদের হাত ছাড়া হয়ে যাবে। যারা আমাদের দেশে থাকেন তারাই কিন্তু দেশীয় ঐতিহ্য ও সুবিধাদি বিবেচনা করে দৃষ্টিনন্দন স্থাপনার ডিজাইন করতে পারবেন। বিদেশীরা প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টে ভালো, প্রজেক্ট ডেলিভারি নিয়ে কোনো কথা নেই, কিন্তু দেশীয় ইতিহাস-ঐতিহ্য না জানার কারণে তাদের চেয়ে আমাদের স্থপতিদের ডিজাইন অনেক অনেক ভালো হয় এতে কোনো সন্দেহ নেই। আগামীতে পাতাল রেলেও স্থাপত্য নকশা খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। আলো-বাতাস, বন্যা, পানি এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে নকশা করার প্রয়োজন হবে, যা আমাদের স্থপতিদের চেয়ে ভালো আর কেউ বুঝবে না।
ঠিক এ মুহূর্তেই কি ঢাকায় মেট্রোরেলের প্রয়োজন ছিল বলে মনে করেন?
অবশ্যই প্রয়োজন ছিল। বরং আমি বলব, ঢাকার মতো জনবহুল শহরে আরো আগেই জনপরিবহন ব্যবস্থার বা ম্যাস ট্রান্সপোর্ট ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। যদি আরো আগে আমরা ঢাকায় মেট্রোরেল করতে পারতাম তাহলে জনমনে আরো স্বস্তি, চলাচলে আরো সুবিধা আনা যেত। খেয়াল করতে হবে, ঢাকায় জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২৪ লাখ বা তার উপরে। এ বিশাল জনগোষ্ঠী কীভাবে চলাচল করে? নগরবাসীর এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে হলে আমাদের যে পরিমাণ রাস্তা আছে সেটা অপ্রতুল। যে পরিমাণ গণপরিবহন আছে সেটা অপ্রতুল। সবচেয়ে বড় কথা, যদি পর্যাপ্ত বাসও দেয়া হতো, এ রাস্তা দিয়ে কিন্তু এত বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াত কঠিন হতো। এখানে দরকার হলো ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট। একসঙ্গে বড় জনগোষ্ঠীকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নিয়ে যেতে পারবে এমন পরিবহন ব্যবস্থা। আবার র্যাপিড বা দ্রুত হতে হবে। ধীরগতির হলে হবে না। কোনো ধরনের বাধাবিঘ্ন থাকা চলবে না। মেট্রোরেল এমনই একটি পরিবহন ব্যবস্থা। বেশি যাত্রী বহনের পাশাপাশি দ্রুত যাতায়াতে সক্ষম। আপনি দেখেন, ঢাকায় দুই-আড়াই কোটি মানুষের বসবাস, এটা কিন্তু অনেক বড় সংখ্যা। আমরা যদি আপেক্ষিক বিবেচনা করি, সমগ্র শ্রীলংকার জনগণও এর চেয়ে কম। আপনি যদি গ্রিস বা পর্তুগাল অথবা পোল্যান্ডের কথাই বলেন, ঢাকা শহরের অর্ধেক সংখ্যক জনগণ তাদের পুরো দেশের জনগণের সমান। একইভাবে সুইডেন, ইউএই, ডেনমার্কের জনগণও আরো অনেক কম। ওই দেশেও তো গণপরিবহন আছে, ওই দেশের চেয়েও বেশি জনগণ আমার দেশে বসবাস করছে একটা শহরের মধ্যেই। এ বিশাল জনসংখ্যার অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা এবং জীবনমানের জন্য কোনো ধরনের ট্রাফিক জ্যাম বা বাধাবিঘ্ন ছাড়া গন্তব্যে পৌঁছা দরকার। এসব বিবেচনায় আমি অবশ্যই মনে করি, ঢাকায় মেট্রোরেলের প্রয়োজন ছিল। আমাদের আর্কিটেক্টের ভাষায় আমরা এটাকে ‘মোবিলিটি’ বলি, ট্রান্সপোর্ট বলি না। আরবান ডিজাইনে মোবিলিটি হলো বাধাহীনভাবে এক গন্তব্য থেকে আরেক গন্তব্যে যাওয়ার যে সুযোগ, সে মোবিলিটি ডিসকাশনে শুধু মেট্রোরেল থাকবে তা নয়, বাস, সাইকেল বা গাড়ি থাকতে পারে, এমনকি ফুটপাতও মোবিলিটির অংশ। মেট্রো থেকে নেমে হেঁটে যাওয়ার ব্যবস্থা লাগবে কিংবা নন-মোটরাইজড কোনো বাহনে চড়তে হতে পারে। তাই মোবিলিটির সংজ্ঞা অনেক ব্যাপক। এই মোবিলিটির দৃষ্টিতে ম্যাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট খুব বড় একটা অধ্যায় বা অংশজুড়ে থাকে। আমার মনে হয়, নগর যোগাযোগে সরকার খুবই যুগোপযোগী একটা কাজ করতে পেরেছে। নগরের মোবিলিটির সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নতি, যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা, সামাজিক ব্যবস্থাপনা এবং পরিবেশগত যে সুবিধা আমরা পাই, যেমন মাথাপিছু জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমে যাওয়া, এ সবকিছুই মেট্রোরেলের পরিধি বাড়ার সঙ্গে ইতিবাচক ফলাফল দিতে থাকবে। যেমন আমরা মোবাইল ফোনের ক্ষেত্রে দেখেছি, যখন মোবাইল ফোনের প্রচলন হয় এবং এটি যখন জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে চলে আসে, তখন এর অর্থনৈতিক প্রভাবও ব্যবহারকারীর জীবনে পড়েছিল। শুধু যোগাযোগের কারণেই এত ব্যাপক প্রভাব সৃষ্টি হয়। একইভাবে মেট্রোরেলও একটা যোগাযোগ ব্যবস্থাপনা। এটির কারণে মানুষের জীবনমানের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন চলে আসবে। মানুষের কর্মঘণ্টা যখন বেঁচে যাবে, তখনই মেট্রোরেলের অর্থনৈতিক প্রভাব দৃশ্যমান হতে থাকবে। আরেকটা ব্যাপার আছে, ট্রাফিক জ্যাম নগরবাসীর মানসিক স্বাস্থ্যেও ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্যাফিক জ্যামে বসে থাকার কারণে মন-মেজাজ খিটখিটে হয়ে পড়ে, মানসিক চাপ বাড়ে, মেট্রোরেল এ সমস্যা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেবে। সময়মতো বাসায় চলে গেলে নগরবাসী পরিবারকে যেমন সময় দিতে পারবে তেমনি সামাজিক কর্মকাণ্ডে সাবলীলভাবে অংশ নিতে পারবে।
দেশের অন্য বড় শহরগুলোয় কি মেট্রোরেলের প্রয়োজন আছে?
কোনো শহরে মেট্রোর প্রয়োজন আছে কিনা এক্ষেত্রে তিনটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হয়। ঘনত্ব, জনগণ এবং প্রবৃদ্ধির চাহিদা। শহরে যদি ঘনত্ব না থাকে তাহলে মেট্রোর প্রয়োজন নেই। যেমন আমেরিকার অনেক শহরে মেট্রো নেই, করা সম্ভবও নয়। কারণ শহরটা ছড়িয়ে গেছে। প্ল্যানিংয়ের সময় গাড়ির কারণে শহর ছড়িয়ে গেছে। সেখানে একটা মেট্রোরেল বা বাসস্টেশন করলে তো লোকজন জড়ো হবে না। এজন্য ঘনত্ব প্রয়োজন। আমাদের ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় কিন্তু ঘনত্ব আছে। চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট সব জায়গাতেই আছে। তারপর জনগণও আছে। মেট্রো করা হলো কিন্তু যাত্রী নেই তাহলে তো হবে না। আমার মনে হয়, অন্যান্য বড় শহর বিশেষ করে চটগ্রামে মেট্রোর কথা ভাবাই যায়। আমি মনে করি, দেশের অন্য বড় শহরগুলোতেও মেট্রোর কথা ভাবার সময় এসেছে। তবে আগে দেখতে হবে বাস র্যাপিড ট্রান্সপোর্ট দিয়ে সমাধান করা যায় কিনা।
ঢাকাবাসীকে মেট্রোরেলে অভ্যস্ত করার ক্ষেত্রে কী কী চ্যালেঞ্জ আছে বলে মনে করেন?
যখনই কোনো নতুন প্রযুক্তির প্রবর্তন করা হয়, তখন অবশ্যই কিছু চ্যালেঞ্জ সামনে চলেই আসে। মেট্রোরেল চালু করার পরও আমরা কিছু চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। এগুলো বেশিরভাগই প্রযুক্তিগত ও ব্যবহারিক চ্যালেঞ্জ। আমরা সেগুলো উত্তরণ করছি। আমার মনে হয় না, সামনের দিনগুলোয় যেসব চ্যালেঞ্জ আমাদের সামনে আসবে সেগুলো মোকাবেলা করতে খুব একটা বেগ পেতে হবে। লন্ডনে যখন প্রথম আন্ডারগ্রাউন্ড রেল যাত্রা করে তখন কী অবস্থা ছিল? এটা ১৮৬৩ সালের কথা। তখন লন্ডনের রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি চলছে, নিচে রেল চলছে। ১৮৮৬ সালে পোল্যান্ডে মেট্রোরেল শুরু হয়। ১৮৯৭ সালে শিকাগোয় শুরু হয়। ১৮ শতাব্দীতে কিন্তু তখনো ব্যাপকভাবে গাড়ির ব্যবহার শুরু হয়নি। তখন রাস্তায় রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি চলছিল। এ কথাটা এজন্য বললাম, আমরা যখন মেট্রো শুরু করেছি তখন কিন্তু গাড়ি চলছে। আমাদের হাতে হাতে মোবাইল আছে। আমরা অনেক প্রযুক্তির এক্সপোজার পেয়ে গেছি। ফলে এটার সঙ্গে অভ্যস্ত হওয়ার বিষয়টি খুব চিন্তার কারণ হবে না। যে অংশে মেট্রো চলছে সেখানে কিন্তু যাত্রীরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। সামনেও তাই হবে।










