১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিওতে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় এক প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে পানিসম্পদের জন্য একটি বিশেষ দিন ঘোষণার দাবি তোলা হয়। ওই প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে পানি বিষয়ে সচেতনতা ও গুরুত্বকে তুলে ধরার নিমিত্তে সারা বিশ্বে প্রতি বছর ২২ মার্চ ‘বিশ্ব পানি দিবস’ পালন হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশ এ বছরও ‘বিশ্ব পানি দিবস’ পালন করতে যাচ্ছে। প্রতি বছরের মতো এবারের বিশ্ব পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ওয়াটার ফর পিস’, যা বাংলায় ‘শান্তির জন্য পানি’ নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতিপাদ্যটি সময়োপযোগী ও স্পর্শকাতর। প্রতিপাদ্যে পানিকে শান্তির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তাই পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করার নিমিত্তে সঠিক ব্যবস্থাপনায় যেতে হবে। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বিশ্বের ২৬ শতাংশ মানুষ সুপেয় পানি সংকটে ভুগছে। অন্যদিকে বাংলাদেশের ৪১ শতাংশ মানুষ নিরাপদ পানি পায় না। 

পৃথিবীতে পানিসম্পদের মোট পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৩৭০ মিলিয়ন কিউবিক কিলোমিটার। পৃথিবীতে পানিসম্পদের উৎস-ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ। এর মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানির জোগান উজানের ভূতলের প্রবাহ, স্থানীয় বন্যা ও বৃষ্টিপাতের অনুপ্রবেশ থেকে আসে এবং ভূতলের বিভিন্ন স্তরের অ্যাকুইফারে অবস্থান করে। অন্যদিকে ভূ-উপরিস্থ পানি মহাসাগর, সাগর, উপসাগর, হ্রদ, নদ-নদী, খাল-নালা-বিল, পুকুর-ডোবা ও বায়ুমণ্ডলে অবস্থান করে। এ বিশাল পানিসম্পদের সব পানিই ব্যবহার উপযোগী নয়। পানিসম্পদের মধ্যে—১) সুপেয় পানি ২ দশমিক ৫ শতাংশ ও ২) লবণ পানি ৯৭ দশমিক ৫ শতাংশ। অবস্থানগত দিক থেকে সুপেয় পানি—ক) ভূগর্ভে ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ, খ) ভূ-উপরিস্থ শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ এবং গ) বরফ ও অন্যান্য ৬৮ দশমিক ৯ শতাংশ রয়েছে। আবার ভূপরিস্থ সুপেয় পানি লেকে ৫২ শতাংশ, মাটির রসে ৩৮ শতাংশ, বাষ্পীয়ভবনে ৮ শতাংশ, নদীতে ১ শতাংশ এবং বিভিন্ন লিভিং অর্গানিজমে ১ শতাংশ রয়েছে (সূত্র: ইউনাইটেড স্টেটস জিওলজিক্যাল সারভে (ইউএসজিএস)। 

বিশ্ব পানি দিবস-২০২৪-এর প্রতিপাদ্যে ইংরেজি ‘পিস’ শব্দে ‘শান্তির’ ব্যাপক অর্থে বিশ্ব শান্তিকে বোঝানো হয়েছে। বিশ্ব শান্তি হলো, সমগ্র বিশ্বের সব জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মাঝে শান্তি ও ভ্রাতৃত্ববোধকে বোঝায়। বিশ্ব পরিবেশের প্রধান চারটি উপাদানের মধ্যে অন্যতম উপাদান হচ্ছে পানি। পৃথিবীর ২৯ শতাংশ স্থল ও ৭১ শতাংশ জল। যুগে যুগে ক্ষমতাসীনরা জলভাগের চেয়ে স্থলভাগগুলো নিজেদের দখলে নেয়ার চেষ্টায় দেশে দেশে অনেক যুদ্ধবিগ্রহ হয়েছে। বিগত দিনে ক্ষমতাসীনদের কাছে জলভাগ তেমন মূল্য ও গুরুত্ব পায়নি। বর্তমান যুগে জলভাগ প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর। যেমন মৎস্যসম্পদ, জলজসম্পদ ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ ছাড়াও নৌ চলাচলের সুবিধা রয়েছে। তাই বর্তমানে বিশ্বে জলভাগ নিজেদের দখলে নেয়ার জন্য চলছে বিভিন্ন কলাকৌশল ও বাকযুদ্ধ থেকে শীতলযুদ্ধ। অনেকের ধারণা, অনাগত দিনে প্রাকৃতিক পানিসম্পদ নিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ হতে পারে। 

পানির আরেক নাম জীবন। এ পানি সংকট এখন গোটা বিশ্বজুড়েই। বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ পানি সংকটে ভুগছে। বাংলাদেশেও প্রায় ২ দশমিক ৬ কোটি লোক পানি সংকটে দিনাতিপাত করছে। বিশ্বে ২৬০টির বেশি আন্তঃসীমান্ত নদীর অববাহিকা রয়েছে, আর জনসংখ্যার ৪০ শতাংশ এসব নদীর অববাহিকার ওপর নির্ভরশীল। যে কারণে শত শত আন্তর্জাতিক চুক্তি হয়েছে। বিশ্বের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, দ্রুত শিল্পায়ন ও নগরায়ণের ফলে পানিসম্পদের ওপর চাপ বাড়ছে। ওই চাপ মোকাবেলায় নদী অববাহিকায় উজানের দেশগুলো বিশাল আকারের বাঁধ বা ড্যাম নির্মাণ করেছে। এর খেসারত ভাটির প্রাণ ও প্রকৃতিকে দিতে হচ্ছে। এসব নদীর পানির হিস্যা নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে। যাতে দেশগুলোর মধ্যকার ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে দেশগুলোর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে শত শত আন্তর্জাতিক পানি চুক্তি টিকবে কিনা তা নিয়ে নতুন করে ধোঁয়াশা তৈরি হচ্ছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—নীল নদের ওপর ইথিওপিয়ার রেনেসাঁ ড্যাম নির্মাণে ইথিওপিয়া ও মিসর এবং ইউফ্রেটিস নদীর পানি বণ্টনজনিত সমস্যায় তুরস্ক, সিরিয়া ও ইরাক। এশিয়া মহাদেশে চীন ও ভারতের মধ্যে পানিবণ্টন নিয়ে ঠাণ্ডাযুদ্ধ চলছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রবাহিত ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদীর ৫৪টি ভারত এবং তিনটি মিয়ানমার থেকে এসেছে। বাংলাদেশ ভাটির দেশ হিসেবে নদীর পানির হিস্যার দাবিদার। ভারত অভিন্ন ৫৪টি নদীর মধ্যে ৪৭টি নদীর গতিপথে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক বাঁধ নির্মাণ করেছে। এতে পানিপ্রবাহ কমে শুষ্ক মৌসুমে নদী শুকিয়ে সাগরের পানি ঢুকে ভাটি অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে। আবার উজানের উৎসে ক্যাচমেন্ট এরিয়ার ৯০ শতাংশ পানি জিবিএম (গঙ্গ, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা) বাংলাদেশের ৭ শতাংশ এরিয়া দিয়ে প্রবাহের ফলে দেশ প্রতি বছর ব্যাপক এলাকা বন্যাকবলিত হয় (সূত্র: জেআরসিবি)। ফলে বর্ষাকালে বন্যার তোড়ে এ অঞ্চলে পানীয় জলের স্থানীয় উৎসগুলো ধ্বংস করে দিচ্ছে। বাংলাদেশেও গঙ্গা, তিস্তা ও অন্যান্য নদীর পানির হিস্যা দিন দিন ভয়াবহ অবস্থার দিকে যাচ্ছে। এছাড়া বিশ্বের অনেক দেশ পানি নিয়ে ছোটখাটো সমস্যা রয়েছে।

বাংলাদেশে মোট পানিসম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪০৪ দশমিক ১ বিসিএম (বিলিয়ন কিউবিক মিটার)। এর মধ্যে ভূ-উপরিস্থ পানি ১ হাজার ৩৫০ বিসিএম এবং ভূগর্ভস্থ পানি ৫৪ দশমিক ১০ বিসিএম। দেশের পানিসম্পদ থেকে কৃষি খাতে ৮৭ শতাংশ, গৃহস্থালিতে ১০ ও শিল্প কারখানায় ৩ শতাংশ ব্যবহার হয়। কৃষি ও শিল্প-কারখানায় ভূগর্ভস্থ ও ভূ-উপরিস্থ পানি এবং অন্যদিকে দেশের অধিকাংশ এলাকায় গৃহস্থালিকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার হলেও কিছু কিছু এলাকায় ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার হচ্ছে। তবে পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের সিংহভাগ পানি সেচকাজে ব্যবহার হয়। সারা বছর সেচে ৬০-৭০ বিসিএম পানি ব্যবহার হয় এবং বিভিন্ন প্রযুক্তিগত দুর্বলতায় ৪০-৫০ শতাংশ অপচয় হয়। ওই অপচয় রোধে কৃষিতে আধুনিক লাগসই এবং টেকসই প্রযুক্তির প্রিসিশন টাইপ ও বারিড পাইপ সেচ, এডব্লিউডির ব্যবহার, সেচযন্ত্রে ফ্লু মিটার সংযোজন, পানি আয়তনিক ও পানির পুনর্ব্যবহার, আবহাওয়াবার্তাসহ সেচের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। জার্মানভিত্তিক ডয়চে ভেলের পরিসংখ্যানে এক কিলোগ্রাম (কেজি) ওজনের কটন, ওভেন ফ্যাব্রিকস ডায়িং ও ওয়াশিং কাজে ১৫০-২০০ লিটার এবং এক কেজি ডেনিমে সর্বোচ্চ ২৫০ লিটার পানি ব্যবহার হয়। ফলে বছরে পোশাক প্রক্রিয়াজাতে কারখানাগুলোয় প্রায় ১ দশমিক ৫ বিসিএম পানি ব্যবহার হচ্ছে। আবার পোশাক প্রক্রিয়ায় ডায়িং ও ওয়াশিং কাজে কেমিক্যাল মিশ্রিত প্রচুর পানি অপরিশোধিত অবস্থায় খাল-বিল ও নদীতে ফেলা হয়। এতে একদিকে মাটি, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ, অন্যদিকে জলজ ও ভূপৃষ্ঠের প্রাণী এবং ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হচ্ছে। ফলে পানির প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যাচ্ছে। তাই শিল্প-কারখানার পানির অপচয় রোধে পানির পুনর্ব্যবহারের নিমিত্ত ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপনের মাধ্যমে রাসায়নিক বর্জ্য মিশ্রিত পানি এবং এসটিপি (স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) স্থাপনের মাধ্যমে পয়ঃপ্রণালি ও ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত পানি পরিশোধন করতে হবে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তির ওজোন গ্যাস ব্যবহার করতে হবে। বর্তমানে দেশে গৃহস্থালিকাজে প্রায় নয় বিসিএম পানি ব্যবহার হচ্ছে। গৃহস্থালিকাজে (অজু-গোসল, হাত-মুখ ধোয়া, বাথরুম ব্যবহার, রান্না-খাওয়া, কাপড়-চোপড় ধোয়াসহ অন্যান্য প্রাত্যহিক প্রয়োজনে) পানি ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। ওই অপচয় রোধে যথাযথ ব্যবহারের নিশ্চিতকল্পে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও সচেতনতা বাড়াতে হবে। এছাড়া গৃহস্থালিতে ব্যবহৃত পানি পরিশোধনের নিমিত্ত এসটিপির সাহায্যে পয়ঃপ্রণালি ও ময়লা-আবর্জনা মিশ্রিত পানি পরিশোধন এবং ডব্লিউটিপি (ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্ট) সাহায্যে পানযোগ্য ও নিরাপদ পানিতে রূপান্তর করতে হবে। সর্বোপরি শিল্প-কারখানা ও গৃহস্থালিকাজে আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণের মূলমন্ত্র থ্রি-আর (রিডিউস, রিইউজ, রিসাইকেল) প্রযুক্তি গ্রহণ করা। 

আবার বিশ্বের প্রতিটি দেশ পানি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি হাজামজা ও ভরাট নদী, নালা, খাল, বিল, পুকুর, ডোবা ও অন্যান্য জলাধার খনন, পুনঃখনন ও সংস্কারের মাধ্যমে জলাধারের এলাকা বৃদ্ধি এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহের অবকাঠামো নির্মাণের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। পানি সংরক্ষণ কার্যক্রমে ভাটির দেশগুলোর হিস্যার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে।

বিশ্বে পানি সমস্যা বিষয়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস সতর্ক করে বলেছেন, পানির স্বল্পতা বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। এছাড়া এফএও (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচারাল অর্গানাইজেশন) জরিপে জানা যায়, ভূগর্ভস্থ পানির উৎস দ্রুত শেষ হয়ে যাচ্ছে। তাই পানির স্বল্পতাকে সারা বিশ্বের জন্য অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে (২৭.০২.২০১৭ জনকন্ঠ)। জলবায়ু বিষয়ক জাতিসংঘের প্যানেলের গবেষণায় প্রতি ডিগ্রি তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে প্রায় ২০ শতাংশ বিশুদ্ধ পানি কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে এ শতাব্দীর মাঝামাঝি কয়েকটি উন্নয়নশীল অঞ্চলে জোগানের তুলনায় পানির চাহিদাও ৫০ শতাংশ বাড়বে। এভাবে চলতে থাকলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৪০ শতাংশ এলাকায় পানি সংকট দেখা দেবে। এ ভয়াবহ তথ্যাবলি থাকা সত্ত্বেও পৃথিবীতে পানির অপচয় চলছে আপন গতিতে। বিংশ শতাব্দীর পৃথিবী জ্বালানি তেল নিয়ে বহু যুদ্ধ দেখেছে। একুশ শতাব্দীর পৃথিবী পানি নিয়ে প্রাণঘাতী যুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাই পানির ন্যায্য হিস্যা, অপচয় রোধ ও যথায়থ ব্যবহার নিশ্চিতকল্পে সারা বিশ্বে শান্তির বাণী পৌঁছে যাক। 

মো. জিয়াউল হক: প্রকৌশলী ও অবসরপ্রাপ্ত সদস্য পরিচালক (ক্ষুদ্র সেচ), বিএডিসি