২০১৮ সালে জাপানের ওকায়ামার সোঝা শহরে অ্যালুমিনিয়াম প্লান্টে একটি দুর্ঘটনা ঘটে। না, কারখানায় আগুন লেগে যায় না। বন্যার কারণে প্লান্টটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটে। চারপাশে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিস্ফোরণের পর সেখানের ৩০০ স্থানীয় বাসিন্দাকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়। অ্যালুমিনিয়াম প্লান্ট কর্তৃপক্ষ ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্ঘটনা ঘটায়নি, তবে তারা একটি ভুল করেছিল, তা হচ্ছে ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে কখনো জাপানের সিটি গভর্নমেন্ট ও স্থানীয়দের আগে থেকে সতর্ক করেনি বা জানায়নি।
দুর্ঘটনা ঘটার পর কেন এতগুলো লোককে ভুগতে হলো এবং আগে থেকে ঝুঁকিগুলো না জানার কারণে দেশটির সরকার ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর কাজে কী ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল, তা নিয়ে রীতিমতো গবেষণা করা হয়। এরপর এ ধরনের দুর্ঘটনার জন্য আরো ভালো প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেয়া হয় সরকারের পক্ষ থেকে এবং কারখানা কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় পৌরসভার মধ্যে দুর্ঘটনা ঝুঁকির পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য ভাগাভাগি করে নেয়ার কঠোর বিধান জারি এবং ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এড়াতে কী কী করণীয়, এ-সম্পর্কিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
ভাবার অবকাশ নেই যে ভবিষ্যতে আমাদের দেশে রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি আর হবে না। হবে বৈকি, যদি না আমরা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার সমাধানে নজর না দিই। স্বেচ্ছাচারিতার যে যুপকাষ্ঠে আমরা বন্দি, সেখানে এ ধরনের ট্র্যাজেডি অনেকটাই নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে উঠেছে। সাধারণ মানুষ-শ্রমিকের জীবন এভাবে খরচ হয়ে গেলেও একটা সময় পর তেমন কোনো অগ্রগতির কথা শোনা যায় না। আশা করছি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে অবস্থিত হাসেম ফুডস অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুসের কারখানায় প্রাণঘাতী অগ্নিকাণ্ডে দায়ীদের যথোপযুক্ত শাস্তি হবে।
নীতিনির্ধারকদের প্রতি অনুরোধ থাকবে, আমরা যেন আগামী কিংবা পরশুর নতুন কোনো ঘটনায় বেমালুম ভুলে না যাই পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া ১২ বছরের শান্তা, ১৪ বছরের মুন্না, ১৫ বছরের শাহানাদের। যেমন রানা প্লাজার ১ হাজার ১৩৬ জনের কথা আমরা আজ অনেকটাই ভুলে গেছি। যেমন ভুলে গেছি তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের কথা। সেখানেও শতাধিক মানুষ পুড়েছিল।
কভিডকাল চলছে। চলছে লকডাউন। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া ৫২ (গতকালের তথ্য পর্যন্ত) শ্রমিক সামান্য রুটি-রুজির বন্দোবস্ত করতেই কাজে এসেছিলেন এখানে। অভিযোগ শোনা যাচ্ছে, হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ওই কারখানাটিতে আগুন লাগলে গেট বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। ‘কেন?’ এ প্রশ্নের উত্তর দেয়া জরুরি। আগুন বা কোনো দুর্ঘটনার সময় কর্তৃপক্ষ জিনিস চুরির ভয়ে কারখানার গেট বন্ধ করে দেয় বলে শোনা যায়। নারায়ণগঞ্জের কারখানায়ও আগুন লাগার পর চারতলার গেট বন্ধ করে দেয়ার কথা শোনা যাচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের তথ্য বলছে, পুড়ে যাওয়া ৪৯টি মরদেহই চারতলায় পড়ে ছিল! এছাড়া ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (অপারেশন) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান গণমাধ্যমের কাছে বলেছেন, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে কারখানা কর্তৃপক্ষ এটিকে গুরুত্ব দিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করলে মৃত্যুর সংখ্যা হয়তো কম হতো।
২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড ও ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসে বহু শ্রমিক হতাহত হওয়ার ঘটনায় পোশাক খাতের উত্পাদন ব্যবস্থায় নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়। নিরাপদ কর্মপরিবেশ না থাকায় অনেক ক্রেতা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন। একই অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের শুল্কমুক্ত রফতানি সুবিধা জিএসপি স্থগিত করে। পরপর দুই বড় দুর্ঘটনার ফলে আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অবস্থান অনেকটাই নড়বড়ে হয়ে যায়। পোশাক কারখানার পরিবেশ উন্নয়নের উদ্যোগ নেয় অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স। কারখানার পরিবেশ ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা তৈরিতে প্রায় চার হাজার কারখানা পরিদর্শন করা হয় এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার নিশ্চিত করা হয়। প্রথমে পরিদর্শনে কারখানার দুর্বলতা চিহ্নিত করা হয়। এরপর কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হয়। সরকারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পাঁচ বছর মেয়াদের অতিরিক্ত আরো দুই বছর সফলভাবে সংস্কারকাজ শেষ করে গত বছর কার্যক্রম সমাপ্ত ঘোষণা করে জোটটি। তবে এ খাতের অগ্রগতির ধারা ধরে রাখতে গঠিত হয়েছে আরএমজি সাসটেইনেবিলিটি কাউন্সিল।
দেশের তৈরি পোশাক কারখানাগুলো নিয়ে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া হলেও পোশাক শিল্পের বাইরে অন্য শিল্পগুলোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়ে না। এদের তদারকির দায়িত্ব মূলত শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের। এছাড়া নিয়মিত কারখানার পরিবেশ, শ্রমিকদের নিরাপত্তার বিষয়গুলো তদারকির দায়িত্ব রয়েছে সংশ্লিষ্ট কিছু সংস্থার ওপরও। যেমন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের দায়িত্বই শ্রমিকদের কল্যাণের বিষয়গুলো দেখা। পেশাগত স্বাস্থ্য ও কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তামূলক ব্যবস্থাগুলো ঠিক আছে কিনা তা তদারক করা। এছাড়া বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কাজের মধ্যে রয়েছে কারখানার অগ্নিনিরাপত্তার বিষয়গুলো তদারকির বিষয়টি। এজন্য কারখানাগুলোকে নিয়মিত প্রদর্শন করা, কর্মী অনুযায়ী ফায়ার এক্সিটের ব্যবস্থা রয়েছে কিনা তা দেখা এবং নিয়মিত কারখানা কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তা মহড়ার আয়োজন করে কিনা তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা তাদের দায়িত্বটুকু ঠিকমতো পালন করছেন কিনা, তা নিয়ে প্রশ্নের অবকাশ রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার রূপগঞ্জের ওই কারখানার নিচতলায় আগুনের সূত্রপাত হলে শ্রমিকরা আগুন থেকে বাঁচার জন্য উপরে উঠে যান। কিন্তু কারখানাটির নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা না থাকায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন থেকে জীবন বাঁচাতে উপায় না পেয়ে অনেকেই উঁচু থেকে লাফ দিতে বাধ্য হন। তাতে আহত হয়েছেন অনেকেই। ভবনটিতে যদি ফায়ার এক্সিট ডোর ও বাইরে থেকে জরুরি অবতরণের সিঁড়ি থাকত তাহলে অসহায় এ মানুষগুলোকে চারতলা থেকে লাফ দিতে হতো না বা এত মানুষকে পুড়ে মরতে হতো না।
তাই আমরা যেন তাজরীন কারখানার আগুনের মতো রূপগঞ্জের মৃত্যুগুলোকে ভুলে না যাই। তাহলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বাড়বে। আশার কথা, ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় কারখানাটির চেয়ারম্যান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাসহ (সিইও) আটজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণ সাপেক্ষে তাদের শাস্তি হোক—এমন প্রত্যাশা থাকবে। আরো প্রত্যাশা করি দ্রুত বিচারের। একই সঙ্গে সরকারের দায়িত্বরত মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অন্যান্য কারখানার পরিবেশ ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত দিকগুলো দেখভালের নির্দেশনা দিতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দিষ্ট সময় পরপর কারখানাগুলোয় সশরীরে গিয়ে প্রদর্শন করতে হবে। অসংগতি থাকলে তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে হবে। কাজগুলো করতে হবে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে। শ্রমিকসহ কারখানার ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে যারা নিয়োজিত, তাদের দুর্ঘটনা-সম্পর্কিত প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। প্রয়োজনীয় সুরক্ষা সরঞ্জাম নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ। ধারাবাহিকভাবে কয়েক মাস পরপর তদারকির কাজগুলো করতে হবে। বছরে একবার একটি কারখানা পরিদর্শন করে সারা বছর আর এর খোঁজ না নিলে কার্যক্রম ফলপ্রসূ হবে না।
আইন অনুসারে কারখানাগুলোয় নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সেজান কারখানার মতো দেশের অনেক কারখানায়ই তা নেই বলেই অনুমেয়। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি কঠোর হয়, তাহলেই এ ধরনের অসংগতি ক্রমে দূর করা সম্ভব। তাজরীন অগ্নিকাণ্ডের পর শ্রমিকদের বিক্ষোভের মুখে একটা সময় কারখানা মালিককে গ্রেফতার করা হয়। সেজানকাণ্ডে আমরা দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করতে দেখলাম। কিন্তু তাজরীনের মতো বিচার কার্যক্রম শেষ না করে মালিক যেন জামিন নিয়ে বিদেশ চলে যেতে সমর্থ না হন, তা নিশ্চিত হোক। এ কাজের দায়িত্ব প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। সুষ্ঠু তদন্ত নিশ্চিত করে দ্রুত সময়ে শাস্তির দৃষ্টান্ত স্থাপনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারী ও নিয়মভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা প্রদান করাটা ভীষণ জরুরি।
লেখক: সাংবাদিক










