The most pathetic person in the world is someone who has sight but has no vision– Helen Keller

‘পথের পাঁচালি’ চলচ্চিত্রে অপু আর দুর্গা স্টিম ইঞ্জিনের ট্রেন দেখতে কাশবনের ভেতর দিয়ে দৌড়ায়। সেই কালে স্টিম ইঞ্জিনের রেলগাড়ি ছিল দেখার বস্তু।

এই কালে মেট্রোরেল। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মানুষগুলো এমন করে উপরের দিকে তাকিয়ে আছে যেন আকাশের চাঁদ কিংবা সার্কাসের দড়ির ওপর দিয়ে হাঁটা দেখছে। অথবা দেখছে, ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই...।’ আসলে দেখছে পরেরটা ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই।’ বিজয় বটে, সদ্য চালু হওয়া উত্তরা-আগারগাঁও মেট্রোরেল। অকল্পনীয় কিছু হাতে পেলে যেমন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস উপচে পড়ে ঘটনা এক্ষেত্রে তাই টক অব দ্য টাউন মেট্রোরেল। এক এক করে আমার স্বপ্ন পূরণের গল্প এবং স্বপ্নের ফেরিওয়ালা নিয়ে আজকের নিবন্ধ।

এক.

আশি সালে অস্ট্রেলিয়ায় যাই পড়াশোনা করতে। সেই সময় মহাসমারোহে চলছিল ভারত-অস্ট্রেলিয়া ক্রিকেট ম্যাচ। আবার মাত্র জন্ম নেয়া দিন-রাত্রির ওয়ানডে ম্যাচ খেলতে নিউজিল্যান্ডও অস্ট্রেলিয়ায়! বাংলাদেশের ক্রিকেট তখন হামাগুড়ি দিচ্ছে মাত্র। অস্ট্রেলিয়ায় বসে খেলা দেখি আর ভাবি, বাংলাদেশ কোনো দিন কি পারবে অস্ট্রেলিয়ায় এসে খেলতে, পারবে কি ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পা রাখতে কিংবা দিনে-রাতে খেলার আয়োজন করতে? আমার আকাশকুসুম কল্পনা বা পাইপ ড্রিম চলতেই থাকল।

সিডনি শহরে এক বাসায় সস্ত্রীক ভাড়া থাকতেন আমার পরিচিত ডাক্তার রেজাউল। ওই বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পাই বাড়ির মালিক, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যাচেলর, শুধু টিভি দেখে সময় পার করেন। এ চ্যানেল তো ওই চ্যানেল। ভাবি, এ দেশে সারারাত টিভি চলে? বিস্ফোরিত চোখে নিজেকে জিজ্ঞেস করি, বাংলাদেশে টিভি কবে চলবে বিরামহীন?

আমার শিক্ষক জক এন্ডারসন গবেষণাকাজে প্রায়ই বাংলাদেশে আসতেন। ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইংল্যান্ডের ক্যাম্পাসে দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতাম, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ কেমন মনে হয় তোমার? উত্তরে বলতেন, তোমাদের ওই যমুনা নদীর ওপর যতদিন ব্রিজ না হবে, তোমাদের অর্থনীতি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলবে। আর ওই নদী বাগে এনে ব্রিজ বানানো সিমিংলি ইম্পসিবল।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে, এমনকি কলকাতার মেট্রোরেলে চড়ে মনে হতো আমার জীবদ্দশায় এমন একটা মহাকাণ্ড ঘটবে কি বাংলাদেশে? আশা-নিরাশায় দুলি আমি; ঘটুক আর না ঘটুক করোটিতে সারাক্ষণ একই প্রশ্ন বারবার উঁকি মারে—কেন আমার দেশে নেই এসব সুবিধা, কে বানাবে যমুনার ওপর সেতু, মেট্রোরেল কিংবা করবে দিন-রাত ক্রিকেট খেলার আয়োজন? মোট কথা, নচিকেতার বিখ্যাত সে গানটি আমার তখনকার মনের অবস্থা প্রতিফলিত করে—

‘যখন সময় থমকে দাঁড়ায়,

নিরাশার পাখি দু’হাত বাড়ায়

খুঁজে নিয়ে মন নির্জন কোণ

কি আর করে তখন

স্বপ্ন-স্বপ্ন-স্বপ্ন, স্বপ্ন দেখে মন

স্বপ্ন-স্বপ্ন-স্বপ্ন, স্বপ্ন দেখে মন’

দুই.

একদিন সেই যমুনার ওপর নির্মিত হয় বঙ্গবন্ধু সেতু তথা বঙ্গবন্ধু মাল্টিপারপাস ব্রিজ। ১৯৯৮ সালের জুনে তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটি উদ্বোধন করেন এবং খুলে দেয়া এ সেতুটি উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে পূর্বাঞ্চল তথা রাজধানীর সংযোগ মাল্টিপ্লায়ার এবং লিংকেজ প্রভাব সৃষ্টি করে জিডিপি বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। পরবর্তী সময়ে বিদেশে কনফারেন্সে দেখা হলে আমি কিছু বলার আগেই আমার প্রিয় সেই অধ্যাপক জক এন্ডারসন একগাল হেসে অভিনন্দন জানিয়ে বলতেন, ‘তোমরা অসম্ভবকে সম্ভব করেছ; তোমাদের উন্নয়ন এখন হাতের নাগালে।’

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাঙ্গনে বর্তমান বাংলাদেশ একটা খুব পরিচিত নাম। এ বাংলাদেশ বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আয়োজনও করেছিল সে কথা যখন ভাবি, মনে হয় আকাশকুসুম কল্পনায় ডুবে আছি। নারী ক্রিকেট আর ফুটবলে এ অঞ্চলে সবচেয়ে শক্তিশালী দল বাংলাদেশ আমার স্বপ্ন স্মরণ করিয়ে দেয় মাত্র। বাংলাদেশে এখন টিভি চ্যানেল আছে সম্ভবত দুই ডজন কিংবা তারও বেশি এবং সেগুলো চলে সারা রাত। সিডনিতে দেখা আমার সেই স্বপ্ন এখন যেন সত্য হয়ে ধরা দেয়।

মোট কথা, আমাদের সবার কল্পনার বাইরে থাকা ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করে শেখ হাসিনা এবং তার দল প্রমাণ করেছে তিনি স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। কথাটা একটু খুলেই বলি।

এত দিন পদ্মা নদীর পরিচয় ছিল গল্প, কবিতা কিংবা উপন্যাসে বিশেষত জেলেদের জীবন কাহিনী নিয়ে। আর নদীটি বিখ্যাত ছিল ইলিশ মাছ উৎপাদনে, এমনকি প্রতিবেশী পশ্চিম বাংলায়। এবার পদ্মা নদী বিখ্যাত হলো একটা সেতু নির্মাণের কারণে। এতকাল এ প্রমত্ত পদ্মা দক্ষিণাঞ্চলের সঙ্গে পূর্বাঞ্চল তথা রাজধানীকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল। যমুনা সেতুর চেয়েও দীর্ঘ এবং আরো বড় চ্যালেঞ্জিং এ সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েও ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে পিছিয়ে যায় যদিও পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয় যে দুর্নীতির অভিযোগ সত্য ছিল না। স্বপ্ন যখন চুরমার হওয়ার পথে ঠিক সেই মুহূর্তে সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একক সিদ্ধান্ত নিলেন ৩০ হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প তার সরকার নিজস্ব অর্থায়নে শেষ করবে। এবং করেছেও তাই। এ সেতুর আর্থসামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন করা বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য নয় তবে এতটুকু বলাই যথেষ্ট যে ১০ ঘণ্টার খুলনায় এখন ৪ ঘণ্টায় যাওয়া যায়; দক্ষিণাঞ্চলের আর্থসামাজিক উন্নয়নে এ সেতু প্রধান নিয়ামক হিসেবে কাজ করবে বলে ধারণা।

তিন.

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর আমাদের জাতীয় জীবনের তিন তিনটি মাইলফলক এ দেশের মানুষের মনে ছাপ ফেলে, যেমন— পদ্মা এবং যমুনার ওপর সেতু নির্মাণ, বিশ্বকাপ ক্রিকেট আয়োজন ও সম্প্রতি মেট্রোরেলের নির্মাণ এবং উদ্বোধন। লক্ষণীয়, এসবই অর্জিত হয়েছে শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্বে এবং পরিকল্পিত উন্নয়নের প্রবক্তা আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

চার.

গেল দেড় দশকে (বিশেষত ২০০৯-১০ থেকে ২০২১-২২ অর্থবছরে) বাংলাদেশে অনেকটা ‘নজিরবিহীন বিপ্লব’ ঘটেছে এবং উদাহরণস্বরূপ এর কিছু নির্দেশক উপস্থাপন করা যায়, মাথাপিছু জাতীয় আয় উন্নীত হয়েছে ৮৪৩ ডলার থেকে ২৮২৪ ডলারে, জাতীয় উৎপাদনের বৃদ্ধি প্রায় চার গুণ, কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এবং সাক্ষরতার হার ঊর্ধ্বমুখী, প্রত্যাশিত আয়ুতে দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ, নিম্নমুখী শিশুমৃত্যু হার ও খর্বাকৃতি ইত্যাদি। এটা তাই কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয় যে উন্নীত আর্থসামাজিক নির্দেশক বাংলাদেশেকে ‘রোল মডেলের’ মর্যাদা এনে দিয়েছে। মোটকথা, আর্থসামাজিক নির্দেশকের বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো পেছনে ফেলে আগুয়ান বাংলাদেশ। এ ‘বিপ্লবে’র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চালক হিসেবে বিবেচনা করা হয় প্রবৃদ্ধির প্রশংসনীয় উল্লম্ফনকে, যা নিয়মিত ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা ধারণ করে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭ শতাংশের মাইলফলকে পৌঁছে আর ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির হার দাঁড়ায় এযাবত্কালের সীমা পেরিয়ে ৮ শতাংশে।

সুখবরের এখানেই শেষ নয়। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের কলামিস্ট সদানন্দ ধুম ২০১০ সালের ১ অক্টোবর লিখেছিলেন, ‘প্রায় ৪০ বছর পূর্বে, স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধিশালী পাকিস্তানের বিপরীতে, একমাত্র সবচেয়ে বেপরোয়া বাজিকর বন্যাপ্রবণ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের ওপর বাজি ধরত, কিন্তু উচ্চতর প্রবৃদ্ধি, পড়ন্ত জন্মহার এবং অধিকতর আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক অর্থনীতি নিয়ে গতকালের তলাবিহীন ঝুড়ি হয়তো শেষ হাসিটা হাসবে।’ এবং সময়ের আবর্তে ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) কাতার হতে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজনীয় সকল মানদণ্ড পূরণ করতে পেরেছে। ২০১৫ সালে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে নিম্ন-মধ্য আয়ের দেশের শ্রেণীভুক্ত হয়েছে এবং দশকব্যাপী ৭ শতাংশ হারে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনও সম্ভব হয়েছে।’

পাঁচ.

তার পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্রষ্টা সোনার বাংলা স্বপ্নের ফেরিওয়ালা। বঙ্গবন্ধু দেশটা স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন কিন্তু তার স্বপ্ন সফল হওয়ার আগেই ঘাতকের বুলেটে তিনি নিহত হন। ১৯৮১ সালের ১৭ মে দীর্ঘ নির্বাসন শেষে দেশে ফিরে এসে এবার তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত স্বপ্ন পূরণে প্রতিশ্রুত হলেন। একের পর এক স্বপ্নের কথা বলছেন এবং তা বাস্তবায়ন করছেন। ‘আমরা চাই ২০৩১ সালের মধ্যে চরম দারিদ্র্যের অবসান ও উচ্চ-মধ্যম আয়ের সোপানে উত্তরণ, এ দেশ থেকে ২০৪১ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের অবলুপ্তিসহ উচ্চ-আয়ের উন্নত মর্যাদায় আসীন করতে’—এমন একটা স্বপ্ন পূরণেও যে তার প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব সফল হবে সে বিষয়ে সংশয়ের অবকাশ আছে বলে মনে হয় না।

স্বপ্নের ফেরিওয়ালা শেখ হাসিনা, আপনি আমাদের সালাম নিন, আপনার দীর্ঘ উৎপাদনশীল জীবন কামনা করি। বিজয় নিশান উড়ুক বাংলার ঘরে ঘরে—

‘বিজয় নিশান উড়ছে ঐ

উড়ছে ঐ উড়ছে ঐ উড়ছে ঐ

বিজয় নিশান উড়ছে ঐ

খুশির হাওয়ায় ঐ উড়ছে

উড়ছে উড়ছে উড়ছে

বাংলার ঘরে ঘরে

বাংলার ঘরে ঘরে’

 

আব্দুল বায়েস: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও অর্থনীতির অধ্যাপক; বর্তমানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির খণ্ডকালীন শিক্ষক