বাংলাদেশের সঙ্গে টাকা ও রুপিতে বাণিজ্য পরিচালনার নির্দেশনা দিয়েছে ভারতের বৃহৎ ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (এসবিআই)। ব্যাংকটির প্রধান কার্যালয় থেকে সব শাখায় পাঠানো এ নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আমদানি খরচ বাড়ায় এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে প্রতিবেশী দেশের বিদেশী মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ সংকটে পড়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যে টাকা ও রুপিতে লেনদেন করলে ঝুঁকি কম হবে। এরই মধ্যে ভারত এ প্রক্রিয়ায় রাশিয়া ও ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য শুরু করেছে। অব্যাহত ডলার সংকটের মুখে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোকে সম্প্রতি চীনের মুদ্রা ইউয়ানে অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সন্দেহ নেই, বৈদেশিক লেনদেনে ডলারের পাশাপাশি অন্যান্য মুদ্রা ব্যবহার বাংলাদেশের ডলারের রিজার্ভের ওপর চাপ কিছুটা কমাবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রুপি বা ইউয়ানের জোগান আসবে কোত্থেকে? তাছাড়া বাংলাদেশের ব্যাংক ব্যবস্থা কি এ বিনিময় হারে লেনদেনে প্রস্তুত? বাংলাদেশের রফতানিকারক কি চাইবে রুপি বা ইউয়ানে পেমেন্ট নিতে? বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে বাংলাদেশ ব্যাংক যথাযথ ও কার্যকর ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন দেশ বৈদেশিক লেনদেনে নিজস্ব মুদ্রা বা সংশ্লিষ্ট দেশের মুদ্রা ডলারের বিকল্প হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতা বেড়ে উঠছে। ভারত বৈদেশিক বাণিজ্যের লেনদেনে কিছু পরিমাণে রুপির ব্যবহার করছে। যেমন রাশিয়া-ভারতের মধ্যে বাণিজ্যিক লেনদেনে রুবল ও রুপির হিসাব খোলা হয়েছে এবং তারা রাশিয়াকে রুপিতে অর্থ পরিশোধ করছে। আবার রাশিয়াও ভারতকে রুবলে অর্থ পরিশোধ করছে। শুধু রাশিয়া নয়, যাদের সঙ্গে ভালো বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে, তাদের সঙ্গেও ভারত কিছু পরিমাণে রুপিতে অর্থ পরিশোধের পথে হাঁটছে। চীনও কারেন্সি সোয়াপের মাধ্যমে বাণিজ্য পরিচালনায় আগ্রহী এবং তারা এক্ষেত্রে অগ্রণীও বটে। বাংলাদেশও এ পথ অনুসরণ করতে পারে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সমস্যা হলো ভারত বাংলাদেশের কাছ থেকে যা ক্রয় করে, তার চেয়ে সাত-আট গুণ বেশি বাংলাদেশ তাদের কাছ থেকে ক্রয় করে এবং উভয় দেশের মধ্যে ব্যাপক বাণিজ্য ঘাটতি বিদ্যমান। চীনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এক্ষেত্রে চীন ও ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যের পুরোটাই টাকা-ইউয়ান বা রুপিতে লেনদেন করা কঠিন হতে পারে। একটা মাত্রা পর্যন্ত বাংলাদেশী টাকা যাতে তারা পেমেন্ট হিসেবে গ্রহণ করে সে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। উভয় দেশের সুসম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে এটি সম্ভব। এক্ষেত্রে কূটনৈতিক তত্পরতাও বাড়াতে হবে। এর মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় ঘটবে। তাতে টাকার চাহিদা সৃষ্টি হবে এবং টাকার মান বাড়বে।

অন্যান্য মুদ্রায় বৈদেশিক লেনদেনে একটি বড় সমস্যা হলো তার জোগান। বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রা আসে রফতানি এবং রেমিট্যান্স থেকে। দুটিই আসে ডলারে। বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের, আর ভারত ও চীনের সঙ্গে ঘাটতি। ফলে ভারত ও চীনের সঙ্গে রুপি ও ইউয়ানে লেনদেন করতে গেলে বিপুল পরিমাণ রুপি ও ইউয়ানের প্রয়োজন পড়বে, যা জোগাড় করা বাংলাদেশের জন্য কঠিন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ দেশ দুটি যে পরিমাণ পণ্য রফতানি করে সে পরিমাণ রুপি বা ইউয়ান গ্রহণ করতে পারে বা দেশগুলোকে ওই পরিমাণ বাংলাদেশের টাকা গ্রহণের প্রস্তাব দিতে পারে। ভারত ও চীন শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ হওয়ায় তাদের বাংলাদেশী মুদ্রা গ্রহণে চাপ প্রয়োগ করা হয়তো কঠিন হবে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে রুপি ও ইউয়ানে লেনদেন করতে হবে। ভারতে যেহেতু বাংলাদেশের রফতানি ১ বিলিয়ন ডলারেরও কম সেহেতু রুপির জোগান বেশি থাকবে না। বাংলাদেশের যদি রফতানি বেশি হতো তাহলে রুপি বেশি জমা থাকত। তবে ভারত ও চীনের সঙ্গে মুদ্রা বিনিময়ের মাধ্যমে লেনদেন সম্ভব। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা দেখবেন বিনিময়ে টাকার মূল্যমানের সঙ্গে ইউয়ানের মূল্যমান কত হয়। তাদের আশ্বস্ত করতে হবে। রফতানিকারকদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে তারা কত ডলার আয় করছে। যারা রফতানি করছে তারা রুপি বা ইউয়ানে পরিশোধ নাও চাইতে পারে। সেক্ষেত্রে জটিলতা বাড়বে। তাছাড়া রুপি বা ইউয়ানের রেট কেমন হবে ইত্যাদি বিষয় পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। বড় বিষয় হলো দেশের ব্যাংকগুলোকেও এর জন্য প্রস্তুত করতে হবে। কীভাবে এটি পরিচালিত হবে, রুপি বা ইউয়ানের ক্ষেত্রে কোনো প্লাটফরম তৈরি করা হবে নাকি ব্যাংক টু ব্যাংক পার্থক্য হবে, তাও বিবেচনার বিষয়।

চীন এখন পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তিশালী অর্থনীতি। তাদের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও বেশ ভালো এবং তাদের সঙ্গে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের শক্তিশালী বাণিজ্যিক সম্পর্ক আছে। সেক্ষেত্রে চীনের মুদ্রার ওপর ভরসা করা যায়। ভারতের অর্থনীতি চীনের মতো শক্তিশালী না হলেও তারাও বড়। তাছাড়া বাংলাদেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। তাই রুপিতেও বাণিজ্য হতে পারে। ইউয়ান ও রুপি এখনো ডলারের মতো আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তবে চীন ও ভারতের ওপর বাংলাদেশ আস্থা রাখতে পারে বন্ধু দেশ হিসেবে। চীন ও ভারতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার উদ্যোগটি বাংলাদেশের ডলার রিজার্ভের ওপর চাপ প্রশমনে সাময়িক সহায়তা করবে। কিন্তু অদূরভবিষ্যতে দেশগুলোয় রফতানি বাড়ানোর মাধ্যমে আরো রুপি ও ইউয়ানের জোগান বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করতে হবে। দেশগুলোকে এ সুযোগে চাপ প্রয়োগ করা যেতে পারে, যাতে তারা আরো পণ্য বাংলাদেশ থেকে আমদানি করে। সর্বাগ্রে ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিষয়টিতে আস্থা প্রতিষ্ঠা করতে হবে। কারেন্সি সোয়াপ একটি জটিল বিষয়। এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেয়া একান্তভাবে কাম্য।

রফতানিকারকদের সঙ্গে রফতানির বিষয়টা বন্দোবস্ত করতে গেলে বাংলাদেশের বিশেষ চুক্তি করতে হবে। কারণ প্রত্যেক রফতানিকারক আলাদা। রফতানিকারকরা ব্যাংক থেকে ব্যাংকের মাধ্যমে আলাদাভাবে লেনদেন করে। ভারতের ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়। রফতানিকারকদের পণ্য এক করে রফতানি করার ব্যবস্থা করতে হতে পারে। আবার ভারতের ব্যবসায়ীরা যে মূল্য পরিশোধ করবেন, সেটাও এক করে করতে হবে। তবে রফতানিকারকদের সহজে রাজি করানো যাবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। সেক্ষেত্রে রফতানিকারকদের আশ্বস্ত করতে হবে, ভারতে পণ্য পাঠালে সরকার রফতানি আয়ের সমপরিমাণ ডলার তাদের দিয়ে দেবে। সেটা দিয়ে তারা বাইরে থেকে কাঁচামাল কিনতে পারবে। বাংলাদেশ ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাজি হলে দ্বিপক্ষীয় মুদ্রা বিনিময় কিংবা কারেন্সি সোয়াপ করা সম্ভব। বাস্তব রুপি বা বাস্তব টাকা দরকার নেই; কাগুজে রুপি বা কাগুজে টাকা হলেই সেটা হবে। ভারত ও চীন রাশিয়ার সঙ্গে এ ধরনের মুদ্রা বিনিময় করে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল আনতে পারছে। কারণ তাদের বাণিজ্যে ভারসাম্য আছে। কিন্তু ভারতের সঙ্গে  বাংলাদেশের রফতানি বাণিজ্য মাত্র আড়াই বিলিয়ন ডলারের। সে কারণে রুপি কিংবা ইউয়ান বিনিময় করে খুব একটা লাভবান হওয়া কঠিন। আর সেটা করতে গেলেও বাংলাদেশের বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকিও আছে। মনে রাখতে হবে, সুইফট সিস্টেমের মতো একটা নিরাপদ ব্যবস্থাকে কিন্তু হ্যাক করে আমাদের অর্থ সরিয়ে নেয়া হয়েছে। চীন কিংবা ভারতের বিকল্প পেমেন্ট সিস্টেম সুইফট থেকে দুর্বল। ফলে হ্যাকিং হলে আমাদের বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা আছে। সেজন্যই সতর্ক থাকা ভালো। এক্ষেত্রে বুঝেসুঝে সিদ্ধান্ত নেয়াটাই যুক্তিযুক্ত।