গতকাল সারা বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশেও আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়েছে। দিনটির পেছনে রয়েছে শ্রমজীবী নারীদের অধিকার আদায়ে লড়াইয়ের ইতিহাস। নারীরা শক্ত হাতে, যত্ন করে যেমন সংসারের হাল ধরেন, তেমনই বহির্জগতেও তারা অনন্যা। নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন। জীবনের নানা স্তরে বৈষম্যের শিকার হয়েও সেই বাধা পেরিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নজির গড়ছেন। আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জাতিসংঘের এবারের প্রতিপাদ্য ‘প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে লিঙ্গসাম্য প্রতিষ্ঠা’ করা। জাতিসংঘের মহাসচিব এন্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, লিঙ্গসাম্য একদিকে যেমন মানুষের মৌলিক অধিকারগুলো সুনিশ্চিত করে, তেমনই অন্যদিকে পৃথিবীর অনেক খুঁটিনাটি সমস্যারও সমাধান করে। কিন্তু বর্তমান সময়ে মানুষের এ মৌলিক অধিকারই সুনিশ্চিত নয়। লিঙ্গবৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে, সাফল্যের এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে নীতিনির্ধারণ ও অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে নারী সমাজকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান হারানো, আয় কমে যাওয়া ইত্যাদি কারণে জীবনযাত্রার মানে যে অবনতি ঘটেছে, তার বিরূপ প্রভাব নারীদের ওপরই বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাহলে নারী ও মেয়েশিশুদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টি পরিস্থিতির অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। এদিকে বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। ঘরে-বাইরে সর্বত্র নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো উদ্যোগ দরকার।
বাংলাদেশের উন্নয়নশীল প্রক্রিয়ায় বিশেষত তৃণমূল পর্যায়ের নারীদের ব্যবহার করা হচ্ছে দারিদ্র্যের বোঝা বহন করতে, ঘরে দিতে হচ্ছে বিনামূল্যে শ্রম, উৎপাদিত পণ্যের দাম পায় কম, কাজের বিনিময়ে খাদ্য বা অনিশ্চিত নাগরিক কাজের ক্ষেত্রও সংকুচিত। ভূমি ব্যবহার ও মূলধন প্রাপ্তিতে তাদের প্রবেশাধিকার নেই, উৎপাদনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতায়ও তাদের প্রবেশাধিকার নেই। বর্তমানে উন্নয়নে নারীর সস্তা শ্রমকে শোষণ করা হয়–তেমন ব্যবস্থাকে জোরদার না করে উচিত সামাজিক ও অর্থনৈতিক শোষণের কারণ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করা, যা শ্রেণী ও লিঙ্গবৈষম্যের জন্ম দেয়। নারীর সমমর্যাদা অর্জনের জন্য প্রয়োজন নারীর পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, নিরাপদ ও নারীবান্ধব কর্মপরিবেশ। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ও গুণগত মান বা সত্যিকার অর্থে মর্যাদা বৃদ্ধি। নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও একই বিষয় প্রযোজ্য।
নারী আন্দোলনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় নারী সমাজের যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন হলেও লিঙ্গসমতার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এ চিত্র শুধু বাংলাদেশেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র দৃশ্যমান। অথচ দেশ কিংবা সমাজের উন্নয়ন নির্ভর করে জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক অবদান ও অংশগ্রহণের ওপর। অর্থাৎ সমাজের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর (নারী) অংশগ্রহণ ছাড়া কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে সত্য; কিন্তু তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছে। শুধু তা-ই নয়, নারী নির্যাতন ও বঞ্চনাও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করা সম্ভব হয়নি। দেশের নারী সমাজ এখনো নানা ধরনের পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন-বঞ্চনার শিকার। শিল্প ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকের বঞ্চনা আলোচিত ঘটনা।
১৯৯৭ সালে জাতীয় নারী উন্নয়ননীতি বাস্তবায়নের কথা বলা হলেও আজও তা বাস্তবায়ন না হওয়ার ফলে নারীরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত; ফলে সম্পত্তি থেকেও বঞ্চিত। মুসলিম নারীরা নামমাত্র সম্পত্তির অংশ পেলেও অমুসলিম নারীদের পিতা ও স্বামীর সম্পত্তিতে কোনো অংশীদারত্ব নেই। জাতীয় রাজনীতিসহ সর্বক্ষেত্রে নারীর ৩৩ শতাংশ অংশগ্রহণ এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়ন ফলপ্রসূ হচ্ছে না। সংরক্ষিত নারী আসন ও সংরক্ষিত নারী কোটা নারীকে আরো পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সংসদে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীর জন্য বরাদ্দের কথা বলা হলেও আজও বাস্তবায়নের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি সরকারিভাবে ঘোষণা দেয়া সত্ত্বেও সব নারী আজও ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করতে পারেন না। এ ব্যাপারে নারীকে নানা হয়রানির মুখোমুখি হতে হয়। যৌতুকের কারণে নারীকে নানা নির্যাতনের শিকার হতে হয়। এমনকি অনেককে মৃত্যুবরণও করতে হচ্ছে। দেশে বাল্যবিবাহের হার বাড়ছে। প্রবাসে কর্মরত নারীরা প্রায়ই সহিংসতার শিকার হচ্ছে। প্রবাসে নারীদের মৃত্যুর হারও বেড়ে উঠছে, যা দুশ্চিন্তার।
বর্তমানে সমাজের প্রায় সব খাতেই নারীর অংশগ্রহণ দৃশ্যমান হচ্ছে। শিক্ষার প্রাথমিক স্তরে মেয়েদের উপস্থিতি এখন শতভাগ। পোশাক শিল্পের কৃতিত্বের সিংহভাগই নারীর। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশই যেখানে নারী, সেখানে অগ্রগতি দৃশ্যমান হচ্ছে খুব অল্পসংখ্যক নারীর মধ্যেই। নারীর ক্ষমতায়ন ও উন্নয়ন ছাড়া দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। সরকার দেশের নারী সমাজের সার্বিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। সরকার নারী শিক্ষার বিস্তার ও নারী অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, কর্মক্ষেত্রে অবাধ প্রবেশ ও নীতিনির্ধারণে নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে।
২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য অর্জন করতে হলে অবশ্যই এর ৫ এবং ১০ অভীষ্ট অর্জনে সাফল্য দেখাতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল একটি বৈষম্যহীন সমাজ বিনির্মাণ। বাংলাদেশের সংবিধানেও এর প্রতিফলন আছে। কিন্তু ৫০ বছরে কি আমরা বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণ করতে পেরেছি? সিডও সনদের শর্ত বাস্তবায়ন করতে হলেও নারী-পুরুষ বৈষম্য দূর করার কোনো বিকল্প নেই। জেন্ডার রেসপন্সিভ বাজেটের মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্য হ্রাস ও সুযোগের সমতা সৃষ্টি। জেন্ডার বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতায়ন, প্রাথমিক ও মাধ্যমিকে লিঙ্গসমতা, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাস, স্বাস্থ্য ও টিকাদানের ক্ষেত্রে ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন হয়েছে। নারীর আর্থসামাজিক অগ্রগতির মাধ্যমে নারীর উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন দৃশ্যমান হয়। এজন্য দরকার নারীর কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলা ও সামাজিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা এবং আর্থিক বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহার বিশ্ববাসীকে পরস্পরের কাছাকাছি এনে দিয়েছে। ফলে পারস্পরিক যোগাযোগ বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনৈতিক অগ্রগতিও সাধিত হয়েছে। তবে সব শ্রেণীর মানুষের যেহেতু প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার সমান নয়, তাই এ অগ্রগতির সুফল সব মানুষের কাছে সমানভাবে পৌঁছেনি। বিদ্যমান প্রযুক্তি নারীবান্ধব কতটুকু সে প্রশ্ন সামনে আসছে। সেখানে প্রবেশাধিকার ও সুফল ভোগ করার ক্ষেত্রে নারীরা ব্যাপকভাবে পিছিয়ে রয়েছে—প্রায় ৫৫ ভাগ নারী এখনো প্রযুক্তির বাইরে রয়েছে। প্রযুক্তি মানবসমাজকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করেছে। এমনকি নারী সমাজের যে অংশের প্রযুক্তিতে অভিগম্যতা ছিল, তারাও এ সুবিধা পেয়েছে। প্রযুক্তি ব্যবহারে তারা সমান দক্ষতা দেখিয়েছে। বেকারত্ব, দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হতে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তাসহ বিভিন্ন কর্মসংস্থান বেছে নিয়েছে। প্রযুক্তির সহায়তায় শিক্ষা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে, প্রশিক্ষণ কর্মসূচিসহ সরকারের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পেরেছে। তাই প্রযুক্তিতে নারীর অভিগম্যতা বাড়াতে হবে।
ব্যক্তির মর্যাদা, সমান সুযোগ, অনেক বিকল্প থেকে বেছে নেয়ার সুবিধা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যূনতম নিরাপত্তা—এগুলো ব্যক্তি ও সমাজের বিকাশের জন্য, একটি উন্নত রাষ্ট্রের জন্য, জনগণের সার্বভৌমত্বের প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন এবং নারী এ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন ব্যক্তি হিসেবে তার পরিপূর্ণ বিকাশ। নারী ও পুরুষ উভয়ই হবে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু। হতাশার বেড়াজাল ছিঁড়ে অসহায়ত্ব ও অনিশ্চয়তা অতিক্রম করে সব মানুষের সক্ষমতা বিকাশই হচ্ছে উন্নয়ন ও নারী পুরুষের সমান মর্যাদা প্রতিষ্ঠা। নারী দিবস পালনের যথাযথ উদ্দেশ্য তখনই বাস্তবায়িত হবে।










