ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এক ধরনের আর্থিক বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, যারা ভবিষ্যতে লাভজনক হতে পারে এমন স্টার্টআপ বা ছোট কোম্পানিগুলোকে বিনিয়োগ করে । ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সাধারণত বড় বড় বিনিয়োগকারী, ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে গঠিত হয়। এটি যে সবসময় আর্থিক বিনিয়োগ হবে তাও না, তা হতে পারে ব্যবস্থাপনা কিংবা কারিগরী/প্রযুক্তিগত অভিজ্ঞতা। এককথায়, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল হলো বিনিয়োগের বিকল্প উৎস।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবসা শুরু বা সম্প্রসারণের জন্য পুঁজির জোগান দিলেও তা সব ব্যবসার জন্য নয়।   কেবল উদ্ভাবনমূলক বা যথেষ্ট বড় হওয়ার সম্ভাবনা আছে শুধু এমন ব্যবসায় বা ধারণাতেই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ করতে আগ্রহী থাকে। এক্ষেত্রে উদ্ভাবন  মানে  বৈজ্ঞানিক হবে তা নয়, নতুন ধরনের পণ্য বা সেবা অথবা নতুন কোনো চাহিদা মেটানোও হতে পারে। কারণ এসব ব্যবসায় লাভের সম্ভবনা বেশি। আবার লাভের সাথে ঝুঁকির পরিমাণও থাকে বেশি। তাই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল একটা ‘অধিক লাভ অধিক ঝুকি’ মডেলের অর্থায়ন।

যুক্তরাষ্ট্র ভেঞ্চার ক্যাপিটালের সুতিকাগার।  দেশটি ১৯৫৮ সালে ‘ক্ষুদ্র  ব্যবসা বিনিয়োগ আইন’ প্রনয়ন করে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ব্যবসা শুরু করেছে। সিলিকন ভ্যালির বিপ্লবের পেছনে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের অবদান অনস্বীকার্য। আমেরিকা উদ্যোক্তার জাতি। ভেঞ্চার ক্যাপিটালের তাই সেখানে রমরমা অবস্থা। অথবা ভেঞ্চার কেপিটালের কারণেই আমেরিকা এত উদ্যোক্তার মুখ দেখতে পেয়েছে। মাইক্রোসফট, স্টারবাক্স, অ্যাপল, ইন্টেল, ফেসবুক, গুগল, ই-বে, আমাজন এরকম অনেক জগৎ বিখ্যাত কোম্পানির বেড়ে ওঠার পেছনে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সহায়তা করেছে। আমাদের পাশের দেশ  ভারতে ১৯৯৬ সালে, পাকিস্তানে ২০০১ সালে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল আইন প্রণীত হয়।

বাংলাদেশে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সেচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ২০১৫ সালে  ‘অলটারনেটিভ ইনভেস্টমেন্ট বিধি’ পাস করে। এই বিধির আওতায় বিভিন্ন ভেঞ্চার ক্যাপিটাল এবং প্রাইভেট ইকুইটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

স্থানীয় স্মার্টআপ ইকোসিস্টেম তৈরিতে কাজ করার জন্য ২০১৬ সালে এসব ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও প্রাইভেট ইকুইটি কোম্পানি মিলে এই খাতের অগ্রগতির লক্ষ্যে ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যান্ড প্রাইভেট ইকুইটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ গঠন করে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম বা কোম্পানি নির্দিষ্ট উদ্দেশে (যেমন আইটি, আইটিইএস, বায়ো মেডিক্যাল ইত্যাদি) গঠিত ‘ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ড বা তহবিল’ উত্তোলন করে। বড় বড় প্রতিষ্ঠান বা বিত্তশালী ব্যক্তিবর্গ এই ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফান্ডে বিনিয়োগ করেন। সাধারণ বা খুচরা বিনিয়োগকারীকে এই ধরনের তহবিলে বিনিয়োগ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়। কারণ এতে ঝুঁকি বেশি এবং ফল আসে দেরিতে। ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ফার্ম বা কোম্পানি এই তহবিল ব্যবস্থাপনা করে। বিনিময়ে তারা ব্যবস্থাপনা ফি পায়। 

ভেঞ্চার ফান্ডের মেয়াদ দীর্ঘ, যা ৫ থেকে ১৫ বছরের হয়ে থাকে। ভেঞ্চার ফান্ডে যারা বিনিয়োগ করে তাদের লিমিটেড পার্টনার বা এলপি বলে। আর যারা এই ফান্ড ব্যবস্থাপনা ও বিনিয়োগ করে তাদের জেনারেল পার্টনার বা জিপি বলে। জেনারেল পার্টনাররা অর্থের সাথে সাথে নিজেরা তহবিল  ব্যবস্থাপনায় জড়িত থাকেন এবং স্টার্ট আপ বাছাই করেন, নিরীক্ষা বা ডিউ ডেলিজেন্স নিশ্চিত করেন। বিনিয়োগের পর বিনিয়োজিত প্রতিষ্ঠান দেখভাল করেন, তাদের পর্ষদে পরিচালক হিসাবে বসেন। ভেঞ্চার ফান্ড থেকে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়। ভেঞ্চার ফার্ম বা কোম্পানি এই বিনিয়োগের ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। বিনিয়োগ দীর্ঘ মেয়াদের। তিন থেকে আট বছর পর্যন্ত। বিনিয়োগ প্রধানত সাধারণ শেয়ার ও আংশিক পুঁজির (কোয়াজি ইক্যুটি) মাধ্যমে করা হয়। মেয়াদ শেষে অথবা সুবিধাজনক সময়ে ভেঞ্চার ফার্ম সেই শেয়ার বিক্রি করে দেয়। কখনও লাভে, আবার কখনও লোকসান দিয়ে। বিনিয়োজিত কোম্পানি দেউলিয়া হলে পুরো বিনিয়োগ জলে যেতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অ্যাসোসিয়েশনের হিসাব অনুযায়ী সেদেশে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের বিনিয়োগের ৫ বছরের গড়ে দেখা যায়, ২৫ শতাংশের ক্ষেত্রে ক্রয় মুল্যের কমে অর্থাৎ লোকসান দিয়ে শেয়ার বিক্রয় করতে হয়েছে। পক্ষান্তরে ২০ শতাংশের ক্ষেত্রে প্রায় পৌনে ৬ বছরে বিক্রয় মূল্যের ১০ গুণ বা ততোধিক মূল্য মিলেছে।

ভেঞ্চার ক্যাপিটাল একটি উদ্যোগের বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থায়ন করে। প্রথম পর্যায় হল ‘সিড বা বীজ’ অর্থাৎ ব্যবসা যখন উদ্যোক্তার মনে আইডিয়া আকারে থাকে। দ্বিতীয় পর্যায়কে বলা হয় ‘প্রাথমিক পর্যায়’ -যেখানে উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরুর জন্য কাজ শুরু করেছে কিন্তু বিক্রয় শুরু হয়নি। পরবর্তী পর্যায়ে ‘সম্প্রসারণ’,  যেখানে বিক্রি শুরু হয়েছে কিন্তু কোম্পানি লাভ করছে না । সবশেষে, ‘বর্ধিষ্ণু’ অর্থাৎ যেখানে আইডিয়া পরিক্ষিত, ভালো আয় আসছে, ব্রেক ইভেন হয়েছে বা কাছাকাছি এমন অবস্থায় রয়েছে। বলা যায় একজন উদ্যোক্তার সুচনা থেকে শেষ পর্যন্ত ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রয়োজন মত সকল পর্যায়ে তার সহযোগিতা অব্যাহত রাখে। 

অন্যদিকে আমরা জানি, ব্যাংক ঋণ পেতে আমাদের দেশে সবচেয়ে বড় শর্তাবলী হলঃ- 

(১) ব্যবসাটি লাভজনক হতে হবে (২) ব্যবসা বা উদ্যোক্তার পূর্ব সাফল্যর উদাহরণ থাকতে হবে  এবং (৩) জামানত হিসাবে বন্ধক দেয়ার মত স্থাবর সম্পত্তি থাকতে হবে। 

কিন্তু নতুন উদ্যোক্তার এইসব কোনো যোগ্যতাই থাকে না। তাই ব্যাংক ঋণও পাওয়া যায়না। অন্যদিকে ভেঞ্চার ক্যাপিটালে এই ধরনের কোন কোন জটিলতা থাকেনা। সেক্ষেত্রে  ভেঞ্চার ক্যাপিটালই তার একটি ভরসা। আবার, ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়ার পর থেকেই সুদ আরোপ শুরু হয়। অথচ ব্যবসার প্রাথমিক পর্যায়ে লোকসান হওয়া স্বাভাবিক। সেক্ষেত্রে ভেঞ্চার ক্যাপিটালে এ ধরনের কোন চাপ নেই, বরং ভেঞ্চার ক্যাপিটাল লোকসান হলে তারও অংশীদারিত্ব নেবে। তাই ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে বলা হয় স্মার্ট মানি। এখানে শুধু অর্থ নয়, তারও অধিক কিছু মিলে। যেমন- বুদ্ধি পরামর্শ, নেটওয়ার্ক ইত্যাদি।

একজন সৃজনশীল তরুণ উদ্যোক্তার জন্য ভেঞ্চার ক্যাপিটাল অভিভাবক স্বরূপ। তথাপি আমাদের দেশে এই ধারণাটি এখনো প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। এমতাবস্থায় ভেঞ্চার ক্যাপিটালকে আরও জনপ্রিয় এবং এর সেবা জনবান্ধব করতে কিছু উদ্যোগ গুলো নেয়া যেতে পারে।

প্রথমত, ভেঞ্চার ক্যাপিটালে’ উদ্যোক্তাদের ওপর ‘স্ট্যাম্প ডিউটি’ আরোপ করা যাবেনা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ দেশে বিকল্প বিনিয়োগ তহবিলকে উৎসাহিত করার জন্য ইতোমধ্যে ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ট্রাস্ট ডিডের নিবন্ধনের স্ট্যাম্প ডিউটি আগের ২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.২ শতাংশ করেছে। যেখানে একটি দলিলের মোট মূল্যের উপর সর্বোচ্চ স্ট্যাম্প ডিউটি ১০ লাখ টাকা এবং সর্বনিম্ন ৫০০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্ট্যাম্প ডিউটি ৫ লাখ টাকা করা যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নতুন উদ্যোক্তাদের আয়কর ছাড়সুবিধা দিতে হবে অথবা স্বল্প করের বিধান করতে হবে।  সেক্ষেত্রে এই খাতকে জনগ্রিয় করতে খাত সংশ্লিষ্টদের জন্য বিকল্প কর পন্ধতি চালু করা যেতে পারে। তবে এক্ষেত্রে নিয়ম থাকতে হবে ব্যবসা প্রতিষ্ঠিত বা লাভজনক হয়ে গেলে নিয়মিত করের আওতায় পড়বে।

তৃতীয়ত, যেসকল বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বর্তমানে দেশে বিনিয়োগে আগ্রহী তাদের অর্থ  লেনদেন সহজ করতে হবে। অর্থাৎ বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশী কোন ব্যবসায়ী বা ব্যক্তি যদি দেশে  ভেঞ্চার ফান্ডে বিনিয়োগ করতে চায়।  তবে তা দ্রুত এবং ঝামেলাহীন করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের উদ্ভুদ্ধ করার জন্য সন্মাননা বা বিশেষ ছাড়ের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। 

চতুর্থত, ব্যাংক ও বীমা প্রতিষ্ঠান ভেঞ্চার ক্যাপিটালে বিনিয়োগে বাধ্যতামূলক করতে হবে। ইতোমধ্যে কিছু ব্যাংক তাদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল গঠন করেছে। অন্যদিকে বীমা কোম্পানিগুলোরও এক্ষেত্রে কোনো কার্যক্রম লক্ষ্য করা যাচ্ছেনা। তাদের অংশগ্রহণের ফলে অন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী হবে।

এছাড়া ভেঞ্চার ক্যাপিটালের মাধ্যমে আসা নতুন প্রতিষ্ঠানকে পুঁজিবাজারে আসার জন্য উদ্ভুদ্ধ করতে হবে এবং এর প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে। পাশাপাশি ভেঞ্চার ক্যাপিটালের ফান্ডে সহযোগী হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে ভূমিকা পালন করতে হবে।

পরিশেষে, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ঝুঁকিতে পরিপূর্ণ একটি নতুন ব্যবসায়িক ভাবনা বাস্তবায়নে সহযোগিতা করতে আগ্রহী থাকে। ফলে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল সরাসরি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি এবং প্রায় ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র ও নতুন কোম্পানির একমাত্র অর্থনৈতিক উৎস হিসেবে কাজ করে।

প্রথাগতভাবে ব্যবসায় ঋণের জন্য নতুন উদ্যোক্তাদের মূল ভরসার জায়গা হল ব্যাংক। কিন্তু ব্যাংক অনেক ক্ষেত্রে নতুন উদ্যোগের ক্ষেত্রে ঋণ দিতে রাজি হয় না। তাই এক্ষেত্রে একটি কার্যকরী বিকল্প হতে পারে ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্ট প্রতিষ্ঠান।

রকিবুল হুদা মজুমদার: শিক্ষার্থী
ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকস, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়