আধুনিক সভ্যতার অগ্রসর ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নে সারা বিশ্ব এখন হাতের মুঠোয়। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে মিশে গেছে। এখন নারী-পুরুষ, শিশু-কিশোর, ধনী-গরিব সবার হাতে মোবাইল ফোন পৌঁছে গেছে যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে জনসাধারণের কাছে আরো সহজলভ্য করে তুলেছে। বর্তমানে যোগাযোগমাধ্যমগুলোর মধ্যে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, ইমো, ইনস্টাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ, লিংকডইন ইত্যাদি বেশি জনপ্রিয়। শুধু যোগাযোগের ক্ষেত্রেই নয়, বর্তমানে বিভিন্ন প্রয়োজনীয় বার্তা আদান-প্রদান, ছবি, ভিডিও শেয়ার করার জন্যও এ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এগুলো মানুষকে ভাবের আদান-প্রদানেই কেবল সাহায্য করছে না, বরং পৃথিবীটাকেও নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। একদিকে এগুলো যেমন বিনোদনের উৎস তেমনি অর্থ উপার্জনেরও চমৎকার মাধ্যম। 

ইউটিউব ও ফেসবুক তাদের প্লাটফর্মে কনটেন্ট নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে ‘মনিটাইজেশন’ চালু করেছে। ইউটিউব মনিটাইজেশন হলো ইউটিউব ভিডিও থেকে অর্থ উপার্জন করার একটি প্রক্রিয়া। এর মাধ্যমে নির্মাতারা তাদের শর্টস ও ভিডিও থেকে অর্থ আয় করতে পারেন। আয়ের সুযোগ থাকায় ফেসবুক ও ইউটিউবে নিয়মিতভাবে প্রচুর কনটেন্ট ক্রিয়েটর আসছে এবং প্রচুর ভিডিও তৈরি করছে এসব প্লাটফর্মের জন্য। সেখান থেকে ঘরে বসে অনায়াসে যে কেউ টাকা ইনকাম করতে পারবে যেকোনো সময়ে, হোক সে গ্রামে অথবা শহরে। ইউটিউব বা ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করলেই সেখান থেকে টাকা আসবে, বিষয়টি এমন নয়। সেজন্য আপনার অ্যাকাউন্টটি মনিটাইজেশন হতে হবে। মূলত এটি হচ্ছে ফেসবুক ও ইউটিউব থেকে অর্থ আয়ের জন্য তালিকাভুক্ত হওয়া। এ তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য যেটা দরকার সেটা হলো এসব মাধ্যমের ফলোয়ার ও ভিউয়ারের সংখ্যা বেশি হতে হবে। সেই সঙ্গে এসব মাধ্যম থেকে শেয়ার করা ভিডিওগুলোয় লাইক ও কমেন্টের সংখ্যাও বেশি হতে হবে। তার মানে হলো, যত বেশি ফলোয়ার তত বেশি লাইক, কমেন্ট আর সেই কনটেন্ট থেকে তত বেশি ইনকাম। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কনটেন্ট তৈরি করে এগুলো শেয়ার করার জন্য কোনো ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক বা শিক্ষাগত যোগ্যতা কিংবা কোনো ধরনের অভিজ্ঞতার দরকার হয় না। তাছাড়া নেই কোনো নির্দিষ্ট বয়সসীমা অথবা কোনো বাধাধরা নিয়ম। তার মানে হলো যে কেউ এসব সামাজিক মাধ্যমে যেকোনো বিষয়ে কনটেন্ট তৈরি করে শেয়ার করতে পারবে। আমাদের দেশে সাইবার নিরাপত্তা আইন থাকলেও কনটেন্ট নির্মাতাদের আচরণবিধি খুব একটা আমলে নেয়া হয় না। আর সব বিপত্তির শুরু এখানেই; এসব মাধ্যম ব্যবহার করতে ন্যূনতম বয়স ১৮ বলা হলেও বিশ্বাসযোগ্য কোনো কাগজপত্র দরকার হয় না। তাই অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু-কিশোররাও খুব সহজেই এ মাধ্যম ব্যবহার করতে পারে। বেশি ফলোয়ার ও ভিউয়ের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য কনটেন্ট নির্মাতারা তাদের কনটেন্টগুলো মানুষের কাছে পৌঁছানোটাকেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। কী বিষয়ে কনটেন্ট তৈরি করছে, এগুলোর দর্শক কারা, মানুষের কাছে এগুলো কতটা গ্রহণযোগ্য, তরুণ প্রজন্মের ওপর এর প্রভাবই-বা কী ইত্যাদি বিষয়ে তাদের কাছে তেমন গুরুত্ব বহন করে না! আর বিপদটা এখানেই ঘটে! কারণ মানুষের সহজাত স্বভাব হলো, ভালো ও ইতিবাচক বিষয়ের প্রশংসা করার চেয়ে খারাপ, নেতিবাচক অথবা মন্দ কাজের সমালোচনা করতে তারা বেশি পছন্দ করে। আর তাই অশ্লীল ও নেতিবাচক কনটেন্টের রিচ ও ভিউ অনেক বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া এসব কনটেন্টের কমেন্টের সংখ্যাও হয় অনেক বেশি। আর এ বিষয়টিকেই কাজে লাগিয়ে লাখ লাখ টাকা আয় করে নেয় ব্যাঙের ছাতার মতো যত্রতত্র মাথা গজিয়ে ওঠা তথাকথিত কনটেন্ট নির্মাতারা।

সব বয়স ও সংস্কৃতির মানুষের মাঝেই রসবোধ আছে। বেশির ভাগ মানুষই হাস্যরস অনুভব করতে পারে, আনন্দিত হয় আর তাই মজাদার যেকোনো কিছুতেই মানুষের আগ্রহও থাকে কিছুটা বেশি, সেটা হোক নাটক, সিনেমা অথবা শর্ট ভিডিও। মানুষের এ সহজিয়া স্বভাবটাকে কাজে লাগাতে ভুল করে না এসব কনটেন্ট নির্মাতা। হাসির অথবা ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টের নামে অ্যাডাল্ট কনটেন্ট তৈরি করে যেখানে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করে, অশ্লীল ও অবাঞ্ছিত শব্দ ব্যবহার করে ভিডিও তৈরি করে, যা কিনা সব বয়সী মানুষের জন্য বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের জন্য একদমই অনুপযোগী। এছাড়া ছেলেরা অদ্ভুত পোশাক পরে মেয়েদের মতো সেজে কুরুচিপূর্ণ অঙ্গভঙ্গি করে মেয়েদের নিয়ে আপত্তিজনক কথা বলে কনটেন্ট ক্রিয়েট করে থাকে বেশি ভিউয়ের আশায়। আর এসব নীতিজ্ঞানহীন, অশালীন, বস্তা পচা কনটেন্ট ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব ফেলে কোমলমতি শিশু-কিশোরদের ওপর। অনেকে আবার রোস্টিং ভিডিও বানায়, যেখানে মূলত তারা অন্য কনটেন্ট নির্মাতা অথবা নাটক সিনেমা বা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের ব্যঙ্গাত্মকভাবে সমালোচনা করে থাকে। তবে কোনো গঠনমূলক সমালোচনা নয়, বরং কুরুচিপূর্ণ, অবাঞ্ছিত শব্দ ব্যবহার করে, অশালীন অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে নোংরাভাবে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা হয় এসব ভিডিওতে। এমনকি বাদ যান না দেশের জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিত্ব, স্বনামধন্য শিল্পী, দেশবরেণ্য কবি-সাহিত্যিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, বিখ্যাত অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। এসব সমালোচনামূলক ভিডিওতে সমালোচনার নামে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করে চরমভাবে অপমান করা হয়। তাদের ছবি বিকৃত করে বা ফেস অ্যাপ ব্যবহার করে আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা হয়। প্রয়াত কবি-সাহিত্যিক বা দার্শনিকদের নাম ব্যবহার করে তাদের বিখ্যাত উক্তিগুলোকে বিকৃত করে মিম তৈরি করে শেয়ার করা হয়। ইন্টারনেটে এক ব্যক্তি থেকে আরেক ব্যক্তিতে ঠাট্টা, গুজব, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও, ছবি ও লেখা ছড়িয়ে দেয়ার ব্যাপারটাকেই ‘‌মিম’ বলা হয়। মজার ছলেই নিজের অজান্তে এ প্রজন্মের তরুণরা দেশের বিশিষ্ট ও সম্মানিত ব্যক্তিদের জীবন নিয়ে, তাদের কাজ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে বেড়াচ্ছে, ব্যঙ্গাত্মক ভিডিও ও ছবি শেয়ার করে এবং তাদের বিখ্যাত উক্তি বিকৃত করে যেন তারা নিজেদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয় দিচ্ছে। আর এভাবেই বিকৃত ও মানসিকভাবে অসুস্থ একটা প্রজন্ম গড়ে উঠছে আমাদের চোখের সামনে! যাদের হাতে তুলে দিতে যাচ্ছি দেশের ভবিষ্যৎ; এসব ভাবতে ভাবতে নিজের অজান্তেই ভয়ে আঁতকে উঠি।

যোগ্য ও সম্মানিতদের লাঞ্ছিত করে, কুরুচিপূর্ণ বাক্য বিনিময় করে রাতারাতি পরিচিতি পাচ্ছে এসব তথাকথিত দেশী কনটেন্ট নির্মাতারা। আর এভাবেই নোংরা ও অবাঞ্ছিত কনটেন্ট ভিডিওর ছড়াছড়ি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয়। অল্প পরিশ্রমে পয়সা উপার্জন ও রাতারাতি পরিচিতি ও সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার লোভে এসব কনটেন্ট নির্মাতার দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে দিনে দিনে, আর এদের মধ্যে অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণদের সংখ্যাই তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। তবে এসব তদারকি করার জন্য নেই কোনো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা। কিন্তু তরুণ প্রজন্মের এভাবে ভুল পথে যাত্রা করে বিকৃত ও নীচ মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠাটা মোটেই কোনো জাতির জন্য শুভ লক্ষণ হতে পারে না। তাই যথাযথ সরকারি পদক্ষেপ নেয়ার এখনই সঠিক সময় নতুবা বড্ড দেরি হয়ে যাবে। কিছু সাধারণ নিয়মনীতি বেঁধে দিতে হবে কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য। তাদের বয়স, কনটেন্টের বিষয়বস্তু, সঠিক শব্দ ও ভাষার ব্যবহার, কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করা হচ্ছে কিনা, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব ও গুণীজনদের অসম্মান করা হচ্ছে কিনা বা তাদের নিয়ে আপত্তিকর কিছু বলা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি বিষয়ে তদারক জোরদার করতে হবে। আপত্তিকর ও কুরুচিপূর্ণ কনটেন্ট নির্মাতাদের আইনের আওতায় এনে আর্থিক জরিমানা বা শাস্তির বিধান রাখতে হবে যাতে বাকিরা এর পুনরাবৃত্তি না ঘটায়। তাছাড়া সন্তানদের কার্যকলাপ, আচার-আচরণ খেয়াল রাখতে হবে। তারা কাদের সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে ইত্যাদি বিষয়ে অভিভাবকদের আরো সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। সর্বোপরি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয়ভাবে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে আমাদের তরুণ প্রজন্মের ওপর। তাহলেই কেবল একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমরা আশা করতে পারি।

তানজিলা আমির: প্রভাষক, অর্থনীতি বিভাগ

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি