মঙ্গলবার ভোরে সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে গুলিস্তানে অবস্থিত অন্যতম বৃহৎ কাপড়ের মার্কেট বঙ্গবাজার পুড়ে ছাই হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের ৫০টি ইউনিট, সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী এবং সাধারণ জনতার চেষ্টায় ৬ ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে পুড়ে গেছে বঙ্গবাজার, মহানগর, আদর্শ ও গুলিস্তান মার্কেট। ঈদ সামনে রেখে বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। কয়েক ঘণ্টার অগ্নিকাণ্ডে ব্যবসায়ীদের স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেল। এ ঘটনায় আমরা গভীরভাবে মর্মাহত। অগ্নিকাণ্ডে যেসব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নেয়া দরকার। একই সঙ্গে ঢাকার অন্য মার্কেটগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি। অগ্নিকাণ্ড যেভাবেই ঘটুক, তা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে থাকে। কাজেই এ ব্যাপারে প্রত্যেকেরই সতর্ক থাকা দরকার। অগ্নিকাণ্ড এড়াতে প্রথমেই যে বিষয়টির ওপর নজর দেয়া প্রয়োজন তা হলো মাকের্ট ও ভবনে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ। এসব বিষয়ে তদারকি জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সেটি দ্রুত নেভানোর মতো সক্ষমতাও তৈরি করা প্রয়োজন।
বঙ্গবাজারে এবারই প্রথম অগ্নিকাণ্ড ঘটল, বিষয়টি তা নয়। ১৯৯৫ সালে অগ্নিকাণ্ডে পুড়েছিল বঙ্গবাজার। অগ্নিকাণ্ডের পর নতুন করে আবার গড়ে তোলা হয় বাজারটি। কিন্তু সেই স্থাপনা নির্মাণেও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি সামাল দেয়ার বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে বিবেচনা করা হয়নি। ২০১৮ সালে আবারো আগুন লেগে গুলিস্তান ইউনিটের বহু দোকান পুড়ে যায়। অন্তত দুবার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ডের পরও বঙ্গবাজারের ব্যবসায়ী কর্তৃপক্ষ তৎপর হয়নি। দেশের ব্যস্ততম জনবহুল ঘিঞ্জি এই মার্কেটে মূলত বেচাকেনা হয় কাপড়ের মতো দাহ্য উপকরণ। অথচ বারবার আগুনে এর দোকানপাট পুড়ে যায়, পথে বসতে হয় বহু মানুষকে। তার পরও এ রকম মার্কেটগুলোয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা জোরদার করা হয় না। দমকল বাহিনী জীবন দিয়ে আগুন নেভাতে তৎপর হয়। কিন্তু এসব মার্কেট এত ঘিঞ্জি যে সেখানে অগ্নিনির্বাপণের সব সরঞ্জাম নিয়ে প্রবেশ করা কঠিন হয়ে পড়ে। এমনকি এসব মার্কেটে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থাও থাকে না, না থাকে চারধারে কোনো উন্মুক্ত অঞ্চল ও জলাধার। বারবার এমনই ঘটছে। মার্কেট থেকে কারখানা, বাসাবাড়ি থেকে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের অগ্নিকাণ্ড বিষয়ে কর্তৃপক্ষের অবহেলায় বারবার বহু জীবন ও সম্পদহানি ঘটছে। অপ্রতুল উপকরণ, সংকীর্ণ পথ, বিপজ্জনক পরিবেশ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং দাহ্য পদার্থের ভেতর দমকল বাহিনী বহু কষ্টে ক্ষয়ক্ষতি কমানোর চেষ্টা করে। কীভাবে এটি করে সেটি এক বিস্ময় বটে। ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, বঙ্গবাজার অগ্নিকাণ্ডের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলে তারা কয়েক দফায় নোটিস টানিয়েছিল, কিন্তু মার্কেট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দেয়নি।
বাংলাদেশের মার্কেট, ভবন মালিক, কারখানা কিংবা কর্তৃপক্ষকে আরো সতর্ক হতে হবে। বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সামগ্রিকভাবে আগুন নেভানো ও জানমালের উদ্ধার তৎপরতার পাশাপাশি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে বলে প্রত্যাশা। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের পাশাপাশি আহতের চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণে কর্তৃপক্ষ ও রাষ্ট্র মানবিক ভূমিকা রাখবে। তাজরীন গার্মেন্টস থেকে সীতাকুণ্ড কিংবা সাম্প্রতিক বঙ্গবাজার প্রতিটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত গাফিলতি ও অবহেলা প্রমাণিত হলেও রাষ্ট্র মালিকপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট বিষয় তদারকির দায়িত্বে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানকে কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার ও দণ্ডের আওতায় আনতে পারছে না। যে কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিশেষজ্ঞ কমিটি সুপারিশ প্রদান করে, মামলা হয়, ক্ষতিপূরণ কিছু দেয়া হয়। কিছু ধরপাকড় চলে। দৃষ্টান্তমূলক কিছুই হয় না। প্রতিবারই দেখা যায় প্রতিটি ঘটনায় অগ্নিকাণ্ডের বিষয়ে সর্বস্তরের গাফিলতি থাকে এবং অগ্নিকাণ্ড ঘটতে পারে এমন ঝুঁকি মোকাবেলার কোনো প্রস্তুতিও সেসব জায়গায় থাকে না। বঙ্গবাজার থেকে শুরু করে কারখানা কিংবা বসতবাড়ি বা মজুদাগারের নির্মাণশৈলী এবং অগ্নিনির্বাপণসহ সামগ্রিক নিরাপত্তা দায়সারা গোছেরই থাকে। কোনো কিছুরই পরিবর্তন হয় না। এমন প্রবণতা অগ্নিদুর্ঘটনার জন্য কোনো অংশে কম দায়ী নয়। প্রতিবার অগ্নিকাণ্ড ঘটার পর নানা ত্রুটির বিষয় উঠে আসে কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেগুলো আর আলোচনায় থাকে না। ফলে অন্যান্য বাজার, মার্কেট, ভবন আগের মতোই ঝুঁকিপূর্ণ থেকে যায়। এক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষকে আরো সতর্ক, দায়বদ্ধ ও সক্রিয় হতে হবে। অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার সঙ্গে আগুন নেভানোর যথাযথ ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
মার্কেটে অগ্নিকাণ্ড এড়াতে ভারতের কলকাতায় কয়েকটি মার্কেটের মাটির তলা দিয়ে তার নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শুধু মাটির তলা দিয়ে বিদ্যুতের লাইন নয়, প্রতিটি প্রেমিসেসের মিটারও পৃথক হবে। ব্লক মিটার অর্থাৎ একটি মিটার থেকে একসঙ্গে অনেক লাইন দেয়া হবে না। দ্রুত আগুন নেভাতে প্রতিটি বাজারে গভীর নলকূপ বসাতেও নির্দেশ দেয়া হয়েছে। পৌরসভা এরই মধ্যে শহরে ৯০টি গভীর নলকূপ বসিয়েছে। বাকি পাঁচটি বসানোর কাজ চলছে। প্রতিটি নলকূপের সঙ্গে ১০০ মিটার লম্বা হোস পাইপ দিয়ে প্রায় পাঁচতলা পর্যন্ত উঁচুতে জল তোলা যাবে। অগ্নিকাণ্ডে ওই গভীর নলকূপ থেকে জলের সংস্থান হবে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় দ্রুত আগুন নেভাতে এমন কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। কলকাতায়ও রাস্তার পাশে আগুন নেভাতে পানির লাইন বসানো হয়েছে। উন্নত প্রতিটি দেশে এমন ব্যবস্থা দেখতে পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলাদেশের নগর পরিকল্পনাতেই এটি নেই। এটি নগর পরিকল্পনার দৈন্যের বহিঃপ্রকাশ। নতুন গড়ে ওঠা অঞ্চলেও অগ্নিনিরাপত্তার জন্য উন্নত কেন্দ্রীয় কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি।
প্রতিটি সংকট আমাদের নতুন বার্তা দেয়। সে বার্তা থেকে শিক্ষা নিয়ে জীবন ও জীবিকা বিকাশের নতুন প্রস্তুতি নিতে হয়। কিন্তু অগ্নিকাণ্ড থেকে আদতেই সরকার কি কোনো শিক্ষা নিচ্ছে? অগ্নিকাণ্ড ঝুঁকি তৈরি করে এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে না পারলে দুর্যোগ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অগ্নিকাণ্ডের মতো আপদ-বিপদ সামলে আমাদের দক্ষতা ও প্রস্তুতিকে সামগ্রিকভাবে সক্রিয় করা জরুরি। ভবন, মার্কেট বা গুদামে অগ্নিকাণ্ড বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দরকার। রাসায়নিক বা কাপড়ের মতো দাহ্য পদার্থ দরকার, কারখানা বা মার্কেট ও গুদামও প্রয়োজন। কিন্তু এসব স্থাপনায় কেন অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা থাকবে না? কেন মার্কেট বঙ্গবাজারের মতো ঘিঞ্জি হবে? প্রতিটি অগ্নিনির্বাপণের ঘটনায় বড় অভাব হয় পানির। আগুন লাগা ভবন, কারখানা বা গুদামে পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকে না। এমনকি এসব জনবহুল স্থাপনার আশপাশে কোনো উন্মুক্ত অঞ্চল বা জলাধারও থাকে না। কেবল পানির ব্যবস্থা করতে করতেই অনেক কিছু পুড়ে যায়। বঙ্গবাজারে অগ্নিকাণ্ডে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনীসহ দমকল বাহিনীর ৫০টি ইউনিটকে সেখানে কাজ করতে হয়েছে। রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে এক সঙ্গে এমন অগ্নিকাণ্ড ঘটলে সেটি সামাল দেয়ার সক্ষমতা কি বাংলাদেশের গড়ে ওঠেনি।
পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে বহু মানুষ হতাহত হয়েছিল। ওই ঘটনার পর পুরান ঢাকার সব রাসায়নিক গুদাম এবং বিভিন্ন কারখানা সরিয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত হলেও তা এখনো সরানো হয়নি। সম্প্রতি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে কনটেইনার ডিপোতে অগ্নিকাণ্ড এবং ভয়াবহ বিস্ফোরণে বহু মানুষ হতাহত হয়েছে। ওই ঘটনায় স্পষ্ট হয়, অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ সম্পর্কে গতানুগতিক ভাবনা পরিহার করে আমাদের আরো সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ডের পর তা নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে গিয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সবচেয়ে বেশি যে সমস্যায় পড়েন তা হলো পানি সংকট। কাজেই সারা দেশের জলাধারগুলো যথাযথভাবে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। যেহেতু শুষ্ক মৌসুমে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেশি ঘটে, সেহেতু সারা দেশের জলাধারগুলোয় শুষ্ক মৌসুমেও পর্যাপ্ত পানি থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
বঙ্গবাজারের অবস্থান রাজধানীর খুব গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে। জনবহুল গুলিস্তান, লাগোয়া পুরনো ঢাকার ঘিঞ্জি এলাকা, বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চল, মেডিকেল কলেজ কত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখানে। বঙ্গবাজারের অগ্নিকাণ্ডের শিক্ষা হলো, এ অঞ্চলে প্রচুর পানি থাকা জরুরি। উন্মুক্ত লেক ও পুকুরে সারা বছর পানি মজুদ রাখা যেতে পারে। অগ্নিনির্বাপণে এ পানি কাজে লাগবে, অন্য সময় নাগরিক জীবনে একটুখানি স্বস্তি দেবে। তাছাড়া প্রতিদিন উত্তপ্ত হয়ে ওঠা নগরে উন্মুক্ত জলাভূমি ও সবুজবলয় জরুরি। মার্কেট, কারখানা, গুদাম কিংবা স্থাপনাগুলোয় নিয়মিত তদারক করতে হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় গাফিলতি কিংবা অবহেলা প্রমাণিত হলে তা বিচারের আওতায় আনতে রাষ্ট্র তৎপর হবে আশা করি। সীতাকুণ্ড থেকে বঙ্গবাজার প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড আমাদের সামনে বহু সতর্কবার্তা হাজির করেছে। এসব বার্তাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না।










