করোনাভাইরাস, লকডাউন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা, শিল্প-কারখানা বন্ধ, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দা, আমদানি-রফতানি হ্রাস—সব মিলিয়ে ২০২০ সালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষেত্র বিপর্যস্ত হয়েছিল। এ সময়ে কভিড-১৯ অতিমারী মোকাবেলা ও অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে সরকারের মোট ১ লাখ ২১ হাজার ৩৫৩ কোটি (জিডিপির ৪.৪ শতাংশ) বিশাল প্রণোদনা প্যাকেজে বাংলাদেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে, প্রচেষ্টা চলছে এখন অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের। কিন্তু এর মধ্যে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শঙ্কা সৃষ্টি করছে। করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টে পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা আছে। এ অবস্থায় কভিড-১৯ মোকাবেলা প্রধান লক্ষ্য হলেও বর্তমানে বাংলাদেশে দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০২১-২০৪১) ও অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (জুলাই ২০২০-জুন ২০২৫) মেয়াদকাল চলছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এলডিসি স্ট্যাটাস থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের প্রেক্ষাপটে নানা সংস্কার কার্যক্রম ও অবকাঠামোগত পদক্ষেপ। তাই বলা যায়, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে বর্তমানে গৃহীত উন্নয়ন কার্যক্রম সচল রাখা ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটের লক্ষ্য হওয়া উচিত। এজন্য সরকারকে অনেক অর্থ ব্যয় করতে হবে। তাই ২০২১-২২ অর্থবছরে সরকারকে সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতি গ্রহণ করতে হবে। কভিড-১৯-এর কারণে রাজস্ব ও অন্যান্য আয় কম হওয়ার সম্ভাবনা থাকায় ঘাটতি অর্থসংস্থান করতে হবে। এজন্য কর না বাড়িয়ে সরকারকে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ গ্রহণের পরিকল্পনা করতে হবে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোয় বর্তমানে প্রচুর অলস অর্থ থাকায় এবং বেসরকারি ঋণের চাহিদা কম থাকায় মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে আশা করা যায়।

ঘাটতি অর্থসংস্থানের জন্য বৈদেশিক সাহায্য বৃদ্ধির জন্য চেষ্টা করা উচিত। বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে নতুন বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি, নতুন শিল্পনীতি ও বাণিজ্যনীতি করা যেতে পারে। বেসরকারি বিনিয়োগ যাতে বৃদ্ধি পায়, এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগবান্ধব নীতি গ্রহণ করা উচিত। আগের বছরগুলোয় জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রাগুলো উচ্চাভিলাষী হলেও বর্তমানে বাস্তবতার নিরিখে আসন্ন ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার উচ্চাভিলাষী হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। ৭ শতাংশের ঘরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা রাখার চিন্তাভাবনা চলছে। কভিড-১৯ অতিমারীর কারণে স্বাস্থ্য খাতে কঠিন আঘাত হেনেছে, বেড়েছে দেশে নতুন দারিদ্র্য, কৃষি ও ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শিক্ষা খাত হয়েছে বিপর্যস্ত, কর্মহীন হয়েছে লাখ লাখ মানুষ। ফলে দেশে মোট ক্ষতির পরিমাণ কত তার কোনো পরিসংখ্যান নেই।

সরকারি ব্যয় ও সুপারিশ

২০২০-২১ অর্থবছরে মোট ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির ১৭ দশমিক ৯ শতাংশ। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ২ লাখ ৫ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা (জিডিপির ৬.৫%) এবং পরিচালনসহ অন্যান্য খাতে বরাদ্দ ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি করা হয় ১ লাখ ৯৭ হাজার ৬৪৩ কোটি টাকার। বলা যায়, কভিড-১৯ অতিমারীর কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশের অর্থনীতি, বিপর্যস্ত মানুষের অর্থনৈতিক জীবন, বিপর্যস্ত হয়েছে উৎপাদন, ব্যবসা-বাণিজ্য। এ অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি বর্তমান চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। এজন্য সরকারি ব্যয় বাড়াতে হবে। আগামী ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেটে এডিপিতে বেশি বরাদ্দ দিয়ে তা বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ বাজেটে নিম্নোক্ত খাতগুলোকে অর্থ বরাদ্দের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার দেয়া উচিত।

স্বাস্থ্য খাত: কভিড-১৯ অতিমারীর কারণে স্বাস্থ্য খাতে বিদ্যমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আরো প্রকট হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে মোট বরাদ্দ ৪১ হাজার ২৭ কোটি টাকা, যা জিডিপির ১ দশমিক ৩ শতাংশ এবং মোট বাজেট বরাদ্দের ৭ দশমিক ২ শতাংশ। কিন্তু  স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ বরাদ্দকৃত বাজেটের মধ্যে মাত্র ২১ শতাংশ ব্যয় করতে পেরেছে। এমনকি ২০২০-২১ অর্থবছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে ১০০ কোটি টাকা স্বাস্থ্য গবেষণায় বরাদ্দ ছিল। এ খাতে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন হলেও খরচ হয়নি বরাদ্দের এক টাকাও। স্বাস্থ্য খাতে ক্রয় প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন থেকে অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়টি প্রমাণিত। কাজেই এ খাতে অর্থ বরাদ্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে যথাযথ মনিটরিং প্রয়োজন।

সুপারিশ: ক. সব নাগরিককে দ্রুত বিনা মূল্যে কভিড-১৯-এর টিকা সরবরাহের ব্যবস্থা করতে হবে। খ. সরকারের বিভিন্ন উৎস থেকে দ্রুত কভিডের টিকা ক্রয়ের জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের বরাদ্দ রাখতে হবে। বিভিন্ন উৎস (গ্যাভি, রাশিয়া, চীন, ভারত, ইংল্যান্ড, আমেরিকা) থেকে টিকা ক্রয়ের কূটনীতি চালু রাখতে হবে। গ. জরুরি ভিত্তিতে কভিড রোগীদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা, যেমন আইসিইউ স্থাপন, অক্সিজেন সরবরাহ, প্রয়োজনীয় সুবিধাসহ কভিড শয্যা বাড়ানো, কভিড রোগীদের অন্যান্য চাহিদা পূরণ করার জন্য ব্যয় করতে হবে। ঘ. দীর্ঘমেয়াদের কথা চিন্তা করেও এবং কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণের কথা বিবেচনা করে দেশে টিকা তৈরির প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ঙ. কভিড-১৯ ও অন্যান্য রোগ বিষয়ে গবেষণার জন্য বাজেট বরাদ্দ ও তার যথাযথ ব্যবহার করতে হবে। চ. বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ও মোট বাজেটের ১৫ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে, সেক্ষেত্রে এ বিভাগের বরাদ্দকৃত অর্থ ব্যয়ের সক্ষমতা সৃষ্টি করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে প্রাথমিকসহ দ্বিতীয় স্তরের উচ্চতর স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা বিধান। ছ. সব জেলায় আইসিইউ ও সব উপজেলায় স্বাস্থ্য ল্যাবরেটরি করা এবং তা পরিচালনার জন্য জনবল নিয়োগ করতে হবে। জ. চিকিৎসা পেতে জনগণের নিজের খরচের পরিমাণ কমিয়ে মানসম্মত সেবা দেয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিতে হবে। ঝ. বেসরকারি চিকিৎসা খাতকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে তাদের ওপর মুনাফা ও আমদানির ওপর কর রেয়াত দিতে হবে। ঞ. চিকিৎসাসেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে ধনী-গরিবের সমান সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। ক্যান্সার ও অন্যান্য ব্যয়বহুল অসুখের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় খরচে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল অসংক্রামক রোগের বিস্তৃতি ও চিকিৎসায় ব্যক্তিগত ব্যয়ের উচ্চহারের কারণে আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। ট. স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে ‘ইনক্লুসিভ হেলথ পলিসি’ গ্রহণ করা যেতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ব্যবস্থা করতে হবে। বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ যাতে স্বচ্ছভাবে ব্যয় হয়, সেজন্য ‘প্রাইভেট ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট’ প্রয়োজন। ঠ. স্বাস্থ্য সুবিধা জেলা, উপজেলায় বিকেন্দ্রীকরণ করা উচিত। বাজেট প্রণয়নের সময়ে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী, স্টেকহোল্ডারদের নিয়ে প্রাক-বাজেট আলোচনা করা দরকার। স্বাস্থ্য খাতে থোক বরাদ্দ বৃদ্ধি ও প্রণোদনার যথাযথ ব্যবহার প্রয়োজন।’ ড. কভিড-১৯ টিকা দেশে উৎপাদনের জন্য বাংলাদেশের ‘গ্লোব বায়োটেকের’ ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকার হিউম্যান ট্রায়ালের অনুমতি দেয়ার সুপারিশ করা হলো। এতে বাংলাদেশে টিকা প্রাপ্তি ও ব্যবহার সহজ হবে।

শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: কভিড-১৯-এর কারণে প্রায় ১৪ মাস ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ। বড় ধরনের ক্ষতির মুখে শিক্ষা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার ক্ষতি বহুমাত্রিক। কিন্তু এ ক্ষয়ক্ষতি পরিমাপ করা যায়নি। দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চার কোটি। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন শ্রেণীকক্ষের বাইরে থাকায় বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী পড়াশোনা ভুলে যাচ্ছে। বড় ঘাটতি নিয়ে উপরের ক্লাসে উঠছে। পরীক্ষা নিতে না পাড়ায় শিখন দক্ষতা যাচাই করা যাচ্ছে না। শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ঝরে পড়া বাড়ছে। কিশোরীদের অনেকে বাল্যবিবাহের শিকার হচ্ছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা সেশনজটে পড়ে কর্মজীবনে প্রবেশে পিছিয়ে যাচ্ছে। করোনাকালে শহরের স্কুলগুলোয় অনলাইন ক্লাস হচ্ছে, পিছিয়ে পড়ছে গ্রামের স্কুলগুলো। আবার শিক্ষার্থীদের মধ্যে যাদের ইন্টারনেট ব্যবহারযোগ্য মোবাইল বা অন্য ডিভাইস এবং ইন্টারনেট নেয়ার সামর্থ্য নেই, তারা ক্লাস করতে পারছে না। ফলে গ্রাম-শহরের শিক্ষার্থীদের বৈষম্য বেড়েছে। আবার দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেটে শিক্ষা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল ৬৬ হাজার ৪০১ কোটি টাকা জিডিপির ২ দশমিক ১ শতাংশ এবং মোট বাজেটের ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

সুপারিশ: ক. স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল হয়েছি আমরা। উন্নত দেশের তালিকায় প্রবেশ করতে হলে মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ প্রয়োজন। এজন্য ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং মোট জাতীয় বাজেটের ২০ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করতে হবে। খ. শিক্ষার্থীদের সুলভ মূল্যে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সেবা দেয়া প্রয়োজন। গ. লার্নিং গ্যাপ কমিয়ে আনতে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া দরকার। ঘ. শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ব্যপারে শিক্ষক ও অভিভাবকদের প্রশিক্ষণ ও প্রচারণা দরকার। ঙ. করোনা-পরবর্তী সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা হলে শিক্ষার্থীদের সংক্রামক রোগ থেকে নিরাপদ রাখতে প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। চ. চতুর্থ শিল্প বিপ্লবকে বিবেচনায় নিয়ে অতিজরুরি ভিত্তিতে শিক্ষানীতিসংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। ছ. শিক্ষা সংকট নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। জ. দক্ষ মানবসম্পদ সৃষ্টির কারিকুলাম চালু করা প্রয়োজন। ঝ. শিক্ষা হতে হবে গুণগত মানসম্পন্ন, মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন করে আধুনিক ও সময়োপযোগী এবং কারিগরি শিক্ষার প্রসার হওয়া প্রয়োজন। বর্তমানে সব স্তরের মানুষের, পেশাজীবীদের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার শেখার জন্য প্রশিক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা প্রয়োজন।

দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব মতে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরের শেষে দেশে উচ্চ দারিদ্র্যের হার ছিল ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু কভিড-১৯-এর কারণে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে এ দারিদ্র্যের সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন দারিদ্র্য। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, কভিডের আঘাতে ২ কোটি ৪৫ লাখ মানুষ নতুন করে দরিদ্র হয়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ব্যয় বরাদ্দ ছিল ৯৫ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৩ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ এবং মোট বাজেট বরাদ্দের ১৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ।

সুপারিশ: ক. সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরো বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়াতে হবে। খ. প্রান্তিক মানুষের জন্য সরকারি সহায়তা সংখ্যায় ও পরিমাণে আরো বহুগুণ বাড়ানো উচিত। গ. বাংলাদেশে ‘দারিদ্র্যের তথ্যভাণ্ডার’ বা ডাটাবেজ গড়ে তোলা জরুরি। ঘ. উপকারভোগী নির্বাচনে ত্রুটি, এলাকাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণে ত্রুটি ও দুর্নীতি দূর করতে হবে। ঙ. আগামী বাজেটে ‘সংহতি তহবিল’ গঠন করে তা থেকে প্রান্তিক মানুষদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া যেতে পারে। চ. সরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, যাতে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ছ. সামাজিক সংগঠন, এনজিও, রেজিস্ট্রেশনকৃত ক্লাব ও পাঠাগার, পেশাজীবী সমিতি ইত্যাদি কমিউনিটিকে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যয়ের কাজে সম্পৃক্ত করতে হবে। জ. দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রকল্প অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন। ঝ. বেকার ভাতা চালু করতে হবে। ঞ. স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্য রেশনের ব্যবস্থা চালু করতে হবে। নগর দরিদ্রদের প্রণোদনা সহায়তা দিতে হবে। শ্রমবাজারের ৮৫-৮৭ শতাংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত থাকায় এ খাতের শ্রমিকদের প্রণোদনা সহায়তা দেয়া জরুরি। ট. বয়স্ক সবার জন্য পেনশনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব হ্রাস: অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সৃষ্টি হচ্ছে না কর্মসংস্থান। বিবিএসের এক জরিপ জানিয়েছিল বাংলাদেশে কর্মক্ষম বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। কিন্তু আইএলওর প্রতিবেদন বলছে, বেকারের সংখ্যা তিন কোটি। ব্রিটেনের ইকোনমিক ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে শিক্ষিত বেকারের হার সবচেয়ে বেশি। প্রতি বছরে শ্রমবাজারে প্রবেশ করে ২০ লাখ তরুণ। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে কভিড-১৯-এর কারণে বেকারের সংখ্যা।

সুপারিশ: ক. কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বেকারত্ব হ্রাস করার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। খ. যেসব খাত এখনো কভিড-১৯-এর ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে পারেনি, সেগুলোকে চিহ্নিত করে ন্যূনতম শর্তে প্রণোদনা দিতে হবে। গ. শ্রমবাজার পুনরুদ্ধারের জন্য জন্য নীতি গ্রহণ করতে হবে। ঘ. অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয় না বাড়লে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গতি আসবে না। এজন্য বেসরকারি বিনিয়োগের দিকে না তাকিয়ে কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প সরকারকে নিতে হবে। সরকারি খাতে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় কর্মসৃজনমূলক প্রকল্প প্রস্তাব রাখে, সে ব্যবস্থা করতে হবে। ঙ. কভিড-১৯ অতিমারীর ধাক্কা সামলে উঠতে বাংলাদেশের নিম্ন আয়ের তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বিদেশফেরত প্রবাসী কর্মীদের সহায়তার জন্য বিশ্বব্যাংকের ২০ কোটি ডলারের ঋণ কাজে লাগাতে হবে। এতে ১ লাখ ৭৫ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে। চ. ২০২০ সালের জানুয়ারির পর অতিমারীর কারণে দেশে ফিরতে বাধ্য হওয়া দুই লাখ প্রবাসী কর্মীকে দেশে বা বিদেশে আবার কাজের সুযোগ দিতে হবে। ছ. চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে কাজ করতে সক্ষম এ রকম কর্মিবাহিনী তৈরির প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে। জ. চাকরিজীবিদের কর্মসংস্থান বীমা চালু করতে হবে। ঝ. বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সারা দেশে ১০০টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে, যেখানে আনুমানিক এক কোটি লোকের কর্মসংস্থান হবে। দ্রুত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল চালু, উদ্যোক্তা সৃষ্টির প্রশিক্ষণ ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করা প্রয়োজন।

(চলবে) 

ড. মো. মোরশেদ হোসেন: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর