(গতকালের পর)
আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার প্রস্তাব গৃহীত না হলেও একই দিন অর্থাৎ ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ফজলুল হক হলের পুকুর পারে ছাত্রনেতাদের বৈঠকে পরদিন ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন ১. যুবলীগ নেতা গাজীউল হক ২. হাবিবুর রহমান শেলী (সাবেক প্রধান বিচারপতি) ৩. মোহাম্মদ সুলতান (পরে ছাত্র ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি) ৪. এম আর আখতার মুকুল (ছাত্রলীগ নেতা ও পরে প্রখ্যাত সাংবাদিক) ৫. জিল্লুর রহমান (ছাত্রলীগ নেতা ও পরে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি) ৬. আবদুল মমিন (ছাত্রলীগ নেতা, মন্ত্রী ও পরে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য) ৭. এসএ বারী এটি (ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও জিয়াউর রহমান সরকারের মন্ত্রী) ৮. সৈয়দ কামরুদ্দিন শহুদ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শনের অধ্যাপক) ৯. আনোয়ারুল হক খান (মুজিবনগর সরকারের তথ্য সচিব) ১০. মঞ্জুর হোসেন (চিকিৎসক) ১১. আনোয়ার হোসেন প্রমুখ। এ বৈঠকে ঠিক হয় একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্র সমাবেশে গাজীউল হক সভাপতিত্ব করবেন।
একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ছাত্রছাত্রীরা আমতলায় জমায়েত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় গাজীউল হকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভাঙার পক্ষে তাদের অভিমত ব্যক্ত করে। এ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাঁচজন-পাঁচজন করে মিছিল নিয়ে প্রাদেশিক পরিষদের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়। ১৪৪ ধারা ভঙ্গের জন্য পুলিশ মিছিলের ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে একুশে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ঢাকার রাজপথে হাজার হাজার ছাত্র-জনতা নেমে আসে। পুলিশ মিছিল লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করে। ওইদিন সন্ধ্যায় ঢাকা শহরে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী নামানো হয়। পুলিশের গুলিতে আহত ১০ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। রাতে পুলিশ হাসপাতাল থেকে ওইদিনের শহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবুল বরকত ও আবদুল জব্বার এবং বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিকউদ্দিনের লাশ নিয়ে যায়। পরদিন বংশাল রোডে সরকার সমর্থক ‘দৈনিক সংবাদ’-এ জনতা হামলা চালায়। সেখানে পুলিশের গুলিতে আবদুস সালাম নামে একজন রিকশাচালক ঘটনাস্থলে নিহত হন। নওয়াবপুর রোডে ‘খোশ মহল’ রেস্তোরাঁর কাছে পুলিশের গুলিতে আহত হন হাইকোর্টের কর্মচারী শফিউর রহমান। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শফিউর রহমান মৃত্যুবরণ করেন। ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি ঠিক কতজন পুলিশের গুলিতে নিহত ও আহত হয়েছেন তার কোনো সঠিক সংখ্যা আজও অপরিজ্ঞাত। এ বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ডের পর মুসলিম লীগ সরকার গণরোষের শিকারে পরিণত হয়। ঢাকাসহ দেশের দৃশ্যপট বদলে যায়। ঢাকায় হাজার হাজার মানুষ রাজপথে নেমে আসে। পূর্ব পাকিস্তান ব্যবস্থাপক সভার অধিবেশনে গুলিবর্ষণ ও ছাত্রহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, দৈনিক আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দিন, আনোয়ারা খাতুন এবং কংগ্রেসদলীয় সদস্যরা অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে বেরিয়ে আসেন। এমনকি মওলানা তর্কবাগীশ মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করে বিরোধী দলের ভূমিকা নেন। সাপ্তাহিক ইত্তেফাক পত্রিকার সংবাদ থেকে জানা যায়:
‘ছাত্রদের উপর গুলী চালনার খবর পৌঁছার সাথে সাথে মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ এম. এল. এ. সহ কতিপয় লীগ দলীয় সদস্য প্রধান মন্ত্রী নূরুল আমীনকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করিতে ও জুলুমের প্রতিকার দাবি করেন। কিন্তু জনাব নূরুল আমীন ঘটনাস্থলে যাইতে অস্বীকার করেন। ফলে মাওলানা তর্কবাগীশ, বগুড়ার মোবারক আলী, রাজশাহীর জনাব মনিরউদ্দিন আখন্দ এম. এল. এ. সভাকক্ষ ত্যাগ করেন এবং মেডিক্যাল কলেজে হতাহত ছাত্রদের দর্শন করেন। মাওলানা তর্কবাগীশ বলেন যে, জালেমের জুলুমের ফলে যেখানে আমাদের ছেলেরা রক্তে গড়াগড়ি যাইতেছে তখন পরিষদ গৃহে বসিয়া পাখার বাতাস খাইতে পারি না।’
শেষ খবরে প্রকাশ, ‘গাইবান্ধার জনাব আহমদ হোসেন এম. এল. এ. লীগ দল হইতে পদত্যাগ করিতেছেন। আইন সভায় জনাব খয়রাত হোসেন, বেগম আনোয়ারা খাতুন মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। কিন্তু মন্ত্রী সমর্থক এম. এল. এ-রা এর বিরোধিতা করেন এবং সিলেটের জনাব মইনুদ্দীন এম. এল. এ. মাওলানা তর্কবাগীশের প্রতি নানা প্রকার বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য করেন। সরকারি জুলুমের প্রতিবাদে ও শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য আইনসভার অন্যান্য ১২ জন মুসলিম সদস্য ও কংগ্রেসদলীয় সদস্যরা পরিষদ গৃহ ত্যাগ করেন।’
আবুল কালাম শামসুদ্দিন পরদিন বিবৃতি দিয়ে সদস্যপদ ত্যাগ করেন। আইনসভার উল্লিখিত সদস্যরা অধিবেশন থেকে বেরিয়ে এসে আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানান। ২২ ফেব্রুয়ারির শোকাচ্ছন্ন, বিক্ষুব্ধ, প্রতিবাদমুখর ও হতাহতের আর্তি-দীর্ণ ঢাকায় অপরাহ্নে পূর্ববাংলা বিধান পরিষদের বাজেট অধিবেশনের তৃতীয় দিনের সভা বসে। বিকাল ৪-৫টায় পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার পরই কিছুক্ষণ বিরতি দিয়ে ৪টা ৪৫ মিনিটে অধিবেশন আবার শুরু হয়। ওইদিন ১২ জন সদস্য নিয়ে গঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি দল, যার নেতা ও সহকারী নেতা নির্বাচিত হন যথাক্রমে কুষ্টিয়ার শামসুদ্দীন আহমেদ ও আলী আহমদ চৌধুরী। সমকালীন পত্রপত্রিকা ও অন্যান্য সূত্র থেকে এই ১২ জন সদস্যের মধ্যে আরো যাদের নাম পাওয়া যায় তারা হলেন মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ, খয়রাত হোসেন, আনোয়ারা খাতুন, আলী আহম্মদ খান, মোবারক আলী (বগুড়া), মনিরউদ্দিন আখন্দ (রাজশাহী), আহমদ হোসেন (গাইবান্ধা) প্রমুখ। আওয়ামী মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি পার্টি গঠন সম্পর্কে আনন্দবাজার পত্রিকায় বলা হয়:
‘ঢাকা-২২ ফেব্রুয়ারি—অদ্য পূর্ববঙ্গ ব্যবস্থা পরিষদে আওয়ামী মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি দল গঠিত হয়। জনাব সামসুদ্দীন আহমেদ দলের নেতা নির্বাচিত হন। এই রূপ দাবি করা হইতেছে যে, এই দলের সদস্য সংখ্যা ১২ জন। তাহাদের মধ্যে মুসলিম দলের মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ আছেন। গতকল্য ছাত্রদের উপর গুলি চালনার প্রতিবাদে তিনি পরিষদ ভবন হইতে বাহির হইয়া আসেন...।’
দৈনিক আজাদ পত্রিকায় উল্লেখ আছে:
‘পূর্ববঙ্গ পরিষদের আওয়ামী মোছলেম লীগ নামে একটি নতুন দল হইয়াছে। জনাব শামসুদ্দীন আহমদ ও জনাব আলী আহমদ চৌধুরী যথাক্রমে এই দলের নেতা ও সহকারী নেতা নির্বাচিত হইয়াছেন।’
আওয়ামী মুসলিম লীগের পার্লামেন্টারি পার্টির সদস্যরা ১৪৪ ধারা জারি ও একুশে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের তীব্র প্রতিবাদ জানায়। মাওলানা আব্দুর রশীদ তর্কবাগীশ ও খয়রাত হোসেন শোক ও মুলতবি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। স্পিকার আবদুল করিম বলেন, শোক প্রস্তাবের কোনো প্রশ্নই উঠতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী নূরুল আমীন মুলতবি প্রস্তাবের বিরোধিতা করেন এবং পরিষদে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। ২২, ২৩ ফেব্রুয়ারিতে আন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। সরকার বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দিতে বাধ্য হয়। একই সঙ্গে ১৯৫৩ সালে প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দেয়া এবং ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের অঙ্গীকার ঘোষণা করা হয়। এভাবে এ দেশের সব অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন এবং বীর শহীদানের আত্মদানের ভেতর দিয়ে ভাষা আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত বিজয় অর্জন করে। ১৯৫২ সালের এপ্রিলে মওলানা ভাসানী, শামসুল হক, অলি আহাদ প্রমুখ যখন কারাগারে বন্দি, সে সময় ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ পুনর্গঠিত হয়। ২৭ এপ্রিল ঢাকা বার লাইব্রেরি হলে ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী সারা দেশের পাঁচ শতাধিক প্রতিনিধি আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে এক সভায় মিলিত হন। সভায় প্রতি বছর একুশে ফেব্রুয়ারি ‘শহিদ দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত হয়। বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধিদের মধ্যে যারা সভায় বক্তৃতা দেন তারা হলেন শামসুল হক (রাজশাহী), আবদুল গফুর (খুলনা), আবুল হোসেন (ফরিদপুর), আবুল হাশেম (বরিশাল), আজিজুর রহমান ((চট্টগ্রাম), হাতেম আলী তালুকদার (ময়মনসিংহ), হাবিবুর রহমান (সিলেট), শফিকুল হক (কুমিল্লা), এম. হোসেন (রংপুর), আবদুস সাত্তার বিএল (বগুড়া), আবদুল বারী বিএল (ব্রাহ্মণবাড়িয়া), মোহাম্মদ আলী (দিনাজপুর), আবদুল মোনেম (পাবনা), সাইদুর রহমান (কুষ্টিয়া), আলমগীর সিদ্দিকী (যশোর), আনিসুর রহমান (নোয়াখালী), তমদ্দুন মজলিশের পক্ষ থেকে ফখরুজ্জামান খান, ইসলামিক ভ্রাতৃসংঘের পক্ষ থেকে ইব্রাহিম তাহা, উর্দু লেখক সংঘের পক্ষে হাসান পারভেজ, পূর্ব পাকিস্তান যুবলীগের সভাপতি মাহমুদ আলী, পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান, ইউনিভার্সিটি ছাত্রদের পক্ষে ওবায়দুল্লাহ, মেয়েদের পক্ষ থেকে হালিমা খাতুন (মেডিকেল স্কুল দ্বিতীয় বর্ষ), হালিমা খাতুন (মেডিকেল স্কুল চতুর্থ বর্ষ), জগন্নাথ কলেজের আজাহারুল ইসলাম, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক জনাব শেখ মুজিবুর রহমানও বক্তৃতা করেন। উল্লেখ্য, শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ ফেব্রুয়ারি কারামুক্তি পান। সভায় ১৫ দফা প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়। ভাষা আন্দোলনের পটভূমিতে ১৯৫২ সালের ২৬ এপ্রিল বামপন্থী প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন আত্মপ্রকাশ করে। ছাত্র ইউনিয়নের যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন কাজী আনোয়ারুল আজিম ও সৈয়দ আবদুস সাত্তার। বায়ান্নর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে সভাপতি নির্বাচিত হন মোহাম্মদ সুলতান ও সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইলিয়াস। (শেষ)
নূহ-উল-আলম লেনিন: আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য










