চীনের উহান প্রদেশ
থেকে নতুন নভেল করোনাভাইরাস চলতি বছরের মার্চের দিকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এর
বিস্তার প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশ তখন থেকে লকডাউনের মতো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে এবং
এ ধরনের পদক্ষেপের প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি অভূতপূর্ব অভিঘাতের মুখোমুখি হয়। অনেক
পর্যবেক্ষক আশঙ্কা করেছিলেন যে মহামারীজনিত এই অভিঘাতে আর্থিকসহ অন্য দিক থেকে
উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগবে। অর্থনৈতিকভাবে তারা মূলত
পণ্য রফতানি, প্রবাসী আয় এবং পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল, যার প্রতিটিই মহামারীর প্রথম ঢেউয়ে হঠাত্ করে
অভাবিত মাত্রায় হ্রাস পেয়েছিল। কাজেই স্বাভাবিকভাবে দেশগুলোয় আর্থিক সংকট ও
ঋণখেলাপির সুনামি বয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করার যথেষ্ট ভিত্তি ছিল।
আশার দিক হলো, এ ধরনের আর্থিক সুনামি এখনো আসেনি। আর্জেন্টিনা, একুয়েডর,
বেলিজ, লেবানন,
সুরিনাম ও জাম্বিয়া—কেবল এই ছয়টি দেশ তাদের সার্বভৌম ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি
হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র প্রথম দুটি দেশই তাদের ঋণ পুনর্গঠন করেছে। বলা চলে, উন্নয়নশীল বিশ্বের ওপর অতিমারীতে বড় ধরনের কোনো
আর্থিক বিপর্যয় ঘটেনি। আরো বিস্ময়ের হলো,
সুনির্দিষ্টভাবে আফ্রিকা
মহাদেশের উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর কভিড-১৯-এর প্রভাব বেশ কম ভীতিকর ও দুশ্চিন্তামূলক
প্রমাণ হয়েছে। দেশগুলোর তরুণ জনগোষ্ঠী নভেল করোনাভাইরাসে আপেক্ষিকভাবে প্রতিরোধী
বলে মনে হচ্ছে। আগের মহামারীগুলো মোকাবেলার অভিজ্ঞতার সুবাদে ওইসব দেশের স্বাস্থ্য
ব্যবস্থা জনগণের যথেষ্ট আস্থা অর্জন করেছে। তদুপরি চীনা অর্থনীতির দ্রুত
পুনরুদ্ধার তাদের পণ্য রফতানির চাহিদা স্বল্প সময়ে চাঙ্গা করেছে।
অনুরূপভাবে, আর্থিক দিক থেকেও উন্নয়নশীল দেশ ও উদীয়মান
অর্থনীতিগুলোর বর্তমান অবস্থা বিস্ময়করভাবে স্থিতিশীল। গত মার্চে যখন সংকটের
নাটকীয় অবনমন ঘটেছিল, তখন ওইসব দেশ বিপুল পরিমাণ মূলধন-পুঁজি হারিয়েছিল। অবশ্য উদীয়মান অর্থনীতিগুলোয় নিট
অর্থপ্রবাহ ধনাত্মক থাকার পাশাপাশি পরবর্তী সময়ে তা বাড়তে থাকলেও গত এপ্রিলে
বহির্মুখী অর্থপ্রবাহ ব্যাপকভাবে কমে গিয়েছিল।
কেন বহির্মুখী
অর্থপ্রবাহ কমেছিল, তার কারণ জানা কঠিন নয়। এর মধ্যে কয়েকটি কারণ
উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের দশ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের
ইল্ড বা রিটার্ন ১ শতাংশের নিচে এবং অনেক দিন ধরে ডলারের মূল্যও ব্যাপকভাবে
অবমূল্যায়িত। দ্বিতীয়ত, ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর সরকারি বন্ডে
রিটার্ন হার ঋণাত্মক। এ ধরনের একটি পরিবেশে থাই সরকারের একটি বন্ডে ১ দশমিক ৩৫
শতাংশ রিটার্ন প্রদানের বিষয়টি অপ্রতিরোধ্য,
এমনকি যদিও চলতি বছর দেশটির
পর্যটননির্ভর অর্থনীতির ৭ শতাংশ সংকোচন এবং সরকারের জনসমর্থন অব্যাহতভাবে কমার
প্রেক্ষাপটে থাইল্যাল্ডে আর্থিক বিপর্যয়ের ধ্রুপদী সংকেত ঘনায়মান।
এদিকে কভিড-১৯-এর কার্যকর টিকার জোগান নিশ্চিত এবং ফেডের অতি নিম্ন
সুদহারের ধারাবাহিক অঙ্গীকারের মাধ্যমে যদি ২০২১ সালে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি আগের
ধারায় ফেরে, তাহলে কিছু উন্নয়নশীল দেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে
যেতে পারে। আবার রিটার্ন প্রত্যাশী বিনিয়োগকারীদেরও সেসব দেশের বন্ড কেনার প্রতি
আগ্রহ বজায় থাকবে।
তবে রফতানি আয় ও
রেমিট্যান্সে পতনের কারণে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অন্য দেশগুলোর ঋণের দায় পরিশোধের
বাধ্যবাধকতা থাকবে। ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে উদীয়মান বাজারগুলোর প্রায় ৭ ট্রিলিয়ন
মার্কিন ডলার সমপরিমাণ দেনার দায় পরিশোধ বাকি পড়বে এবং তখন সেটি চলতি বছর মাত্রার
তিন গুণ হবে। এটি এমন সংকট নয়,
যা ভবিষ্যতের অনির্দিষ্ট
সময়ে বাস্তব রূপ লাভ করবে। আগামী বছর থেকেই দাতা সংস্থা ও উন্নত দেশগুলো ওই ঋণ
পরিশোধের জন্য চাপ দেয়া শুরু করবে।
অবশ্য যেসব দেশের
সরকারগুলো অভ্যন্তরীণভাবে ঋণের সংস্থান করেছে, সেখানে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো
তা কিনে নিতে পারে। তবে সেটি করতে হবে নিজস্ব মুদ্রা অবমূল্যায়ন ও ব্যক্তি খাতের
অর্থায়নপ্রাপ্তি ব্যাহত করার বিনিময়ে। অধিকন্তু, এ বছরের তুলনায় ২০২১
সালে দ্বিগুণের বেশি বৈদেশিক ঋণ বাকি পড়তে যাচ্ছে। এর বড় অংশই মহামারী সৃষ্ট
অর্থনৈতিক অভিঘাতের কারণে আপাতত কার্যকরভাবে অপরিশোধযোগ্য বিবেচিত হয়েছে। মহামারীর
অভিঘাত মোকাবেলার অংশ হিসেবে জি২০ভুক্ত দেশগুলো ডেট সার্ভিস সাসপেনশন ইনিশিয়েটিভ (ডিএসএসআই)
নামে একটি কর্মসূচি নিয়েছে।
এটি ৭৩টি নিম্ন আয়ের দেশকে দেড় বছর সরকার থেকে সরকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ স্থগিত (ডেফার)
করার সুযোগ দিয়েছে। কিছু
প্রাথমিক দোলাচলের পর সর্ববৃহত্ একক ঋণদাতা চীনও এখন এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে।
পূর্বোক্ত ডিএসএসআই
অপূর্ণাঙ্গ। এতে সুদ মওকুফের চেয়ে পরিশোধ স্থগিত করা ও বিলম্ব করার সময়সীমা
নির্ধারণকেই কিছুটা প্রাধিকার দেয়া হয়েছে। ঋণমান সংস্থার অবমূল্যায়নের ভয়ে কিছু
দেশ ডিএসএসআইয়ের সুযোগ গ্রহণে অনিচ্ছুক,
যেমনটা ক্যামেরুনের
ক্ষেত্রে ঘটেছে। দুর্দশাগ্রস্ত মধ্যম আয়ের দেশগুলো আলোচ্য উদ্যোগ থেকে বাদ পড়েছে।
তবু কিছু না থাকার চেয়ে কিছু ব্যবস্থা জারি থাকাটা ভালো।
এখন সমস্যা হলো
ব্যক্তি ঋণদাতাদের নিয়ে। তারা তাদের দেনা-দায় পরিশোধে চাপ দিচ্ছে। গত এপ্রিলে জি২০
দেশগুলো ব্যক্তি ঋণদাতাদেরও একটি উল্লেখযোগ্য ঋণ ছাড়ে সম্মত হওয়ার আহ্বান
জানিয়েছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ আহ্বানে তারা সাড়া দেয়নি। সম্ভবত নিম্ন আয়ের
দেশগুলোর অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের চেয়ে বিনিয়োগকারীরা (অর্থাত্ ব্যক্তি ঋণদাতারা) নিজস্ব পোর্টফোলিওর ব্যাপারে বেশি উদ্বিগ্ন, সজাগ ছিলেন।
পরবর্তী সময়ে জি২০
সরকারগুলো পরিষ্কার করেছিল তাদের দায় পরিশোধ স্থগিত (ডেফার) করার কোনো ইচ্ছা ছিল না, যদি এই মুক্ত হওয়া অর্থ নিছকই ব্যক্তি ঋণদাতাদের
ঋণ পরিশোধে ব্যয় হয়ে যায়। কিন্তু ব্যক্তি খাতও সমরূপভাবে পরিষ্কার করেছে যে ঋণ
ছাড়ে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। ইতিহাস বলে যে ব্যক্তি ঋণদাতাদের ঋণ তখনই
পুনর্গঠন হয়, যখন তারা বুঝে যে কিছু না পাওয়ার চেয়ে অন্তত
অর্ধেক পাওয়া ভালো। বিনিয়োগকারীরা অবশ্য এখনো পুরো ঋণ পরিশোধ হবে বলে আশা করছেন, যেহেতু আনুষ্ঠানিক খাত (কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকার, সরকারি বিভাগ ও এজেন্সি, সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক
সংস্থা) তাদের সাহায্য করছে।
আর কী কী করা যেতে পারে? মামলাবাজ ঋণদাতাদের কাছ থেকে নিম্ন আয়ের দেশগুলোর সম্পদ সুরক্ষা করতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ তার সদস্যদের নির্দেশনা দেয়ার একটি প্রস্তাব পাস করতে পারে, সাদ্দাম হোসেনের উত্খাতের পর যেমনটি ওই পরিষদটি ইরাকি সম্পদ রক্ষায় করেছিল। আইনের ক্ষমতা বলে ইউএস কংগ্রেস এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে। কিংবা ২০২১ সালের ২০ জানুয়ারির পর প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণে আদালতগুলোকে যথাযথভাবে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশনা দিয়ে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করতে পারে, ২০০৩ সালে প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ যেমনটা ইরাকের ক্ষেত্রে করেছিলেন। এটি ঘটার কোনো সম্ভাবনা আছে কি? জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে এখন এ-সম্পর্কিত বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো কঠিন। তার চেয়েও কঠিন এ ধরনের ঐকমত্য বজায় রাখা। আসন্ন বাইডেন প্রশাসনের রাজনৈতিক পুঁজি কম থাকবে, অথচ সমস্যা থাকবে বিপুল। বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর মুখোমুখি হতে তার প্রশাসন ঠিক কতটা প্রস্তুত হবে, সেটি দেখাটা বাকি। ২০২১ সালে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের ব্যাপারে আমি আশাবাদী, কিন্তু উন্নয়নশীল দেশগুলোর ঋণজনিত দায় সমস্যা সমাধানের উপায় সম্পর্কে ততটা আশাবাদী নয়। আমার আশঙ্কা ভুল প্রমাণ হলে আমি যারপরনাই খুশি হব বৈকি।
ব্যারি আইকেনগ্রিন: যুক্তরাষ্ট্রের বার্কলেতে অবস্থিত ইউনিভার্সিটি
অব ক্যালিফোর্নিয়ার অর্থনীতির অধ্যাপক ও আইএমএফের জ্যেষ্ঠ নীতি উপদেষ্টা।
সর্বসাম্প্রতিক ‘দ্য পপুলিস্ট টেম্পটেশন: ইকোনমিক গ্রিভেন্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল রিঅ্যাকশন
ইন দ্য মডার্ন এরা’ বইয়ের প্রণেতা
ভাষান্তর: হুমায়ুন কবির










