দেশে উন্নয়ন ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন অনেক দিন থেকে। বিশ্বের অন্যান্য দেশে তো বটেই এমনকি পাশের দেশ ভারতের চেয়েও বাংলাদেশে এসব ব্যয় অনেক বেশি হয়। এখন জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মূলধন ব্যয় ভারতের চেয়েও বেশি। সোমবার এক গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবরে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের তুলনামূলক মূলধন ব্যয়ের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়, কয়লাভিত্তিক বা গ্যাসভিত্তিক কিংবা পরমাণু সব বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণেই ভারতের চেয়ে বাংলাদেশে ব্যয় বেশি। এ কারণে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ও বেশি। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে মূলধন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পেছনে চড়া দামে জমি অধিগ্রহণ, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো, উচ্চমূল্যে প্রকল্পের কেনাকাটা ও দুর্নীতিই বড় কারণ। এসব খরচ সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে যুক্ত করে তা উঠিয়ে নেয়। এতে অর্থনীতির বোঝা বাড়ছে। বাড়তি ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে সরকার ও জনগণ ভোগান্তিতে পড়ছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নির্মাণ ব্যয়ের রাশ টেনে ধরা না হলে প্রকল্পগুলো দেশের জন্য শ্বেতহস্তীতে পরিণত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।

দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে নানা ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এসব করার লক্ষ্যই মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ কমানো। তবে এসব কেন্দ্র নির্মাণে খরচ কম নয়, বরং বেড়েই চলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যে অর্থ ব্যয় হচ্ছে, তার চেয়ে দুই-তিন গুণ অর্থ ব্যয় হচ্ছে বাংলাদেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের এ খরচ সামগ্রিকভাবে উৎপাদন ব্যয়ে যুক্ত হওয়ায় তার প্রভাব পড়ছে বিদ্যুতের দামে। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অতিরিক্ত ব্যয় করতে গিয়ে অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে অর্থ বরাদ্দ দিতে পারছে না। ফলে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অধিক ব্যয় সাশ্রয়ী বিদ্যুৎ জোগানে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধির কথা বলা হলে সরকারের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণ থেকে নানা অজুহাত উপস্থাপন করা হয়। যুক্তির অধিকাংশই সত্য নয়। কারণ সরকার যখন জমি অধিগ্রহণ করে তখন দাম সরকারই নির্দিষ্ট করে দেয় এবং এর বেশির ভাগ সময় বাজারদরের চেয়ে কমই হয়। তাছাড়া জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বাংলাদেশ বেশি, তার কোনো যুক্তি গবেষণা দ্বারা প্রমাণিত নয়। কিন্তু প্রকল্পে অতিরিক্ত দামে উপকরণ ক্রয়ের ভূরি ভূরি উদাহরণ রয়েছে। ১০ হাজার টাকায় বালিশ কেনার প্রস্তাব এর মধ্যে একটি। প্রকল্পে গাড়িবিলাস, ভ্রমণ ইত্যাদি অভিযোগ তো রয়েছে। শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, সড়ক-মহাসড়ক ও সেতু নির্মাণ ব্যয় বিশ্বের যেকোনো দেশের তুলনায় বাংলাদেশে বেশি বলে খোদ বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় উঠে এসেছে। প্রতিটি গবেষণাতেই অধিক ব্যয়ের পেছনে দুর্নীতিকে মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, কিন্তু হতাশার বিষয়, সরকার সেটি বন্ধে কোনো উদ্যোগই নিচ্ছে না, বরং অধিক ব্যয়ের বিষয়টিকে জায়েজ করতে বিভিন্ন তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলোর পেছনে আবার যুক্তির সীমাবদ্ধতা রয়েছে।

আল জাজিরার এক খবরে ‘পাকিস্তানের অর্থনীতি কেন ডুবে যাচ্ছে’ শীর্ষক নিবন্ধে বলা হয়েছিল, দুর্নীতির কারণেই দেশটির বড়লোকরা কর ফাঁকি দিতে পারছে। পাকিস্তানে মাত্র ১ শতাংশ মানুষ কর দেয় এবং পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে নিম্ন ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাতের দেশগুলোর অন্যতম। তিনি ব্যাখ্যা করছেন, একদিকে মাত্রাতিরিক্ত অনুন্নয়নমূলক সরকারি ব্যয়, যার ৩০ শতাংশ চলে যায় প্রতিরক্ষা খাতে এবং বাজেটের একটা বড় অংশ ব্যয় হয় সুদ পরিশোধ করতে, যার কারণে আরো বেশি ঋণ নিতে হয়, এ রকম একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে গেছে পাকিস্তান। অন্যদিকে কর থেকে আয়ের পরিমাণ খুবই সামান্য। পাকিস্তানে এ রকম অবস্থা অনেক দিন বিরাজ করছিল, যা দেশটিকে বর্তমানের এ সংকটের দিকে ধাবিত করেছে। যেখানে এখন এক-তৃতীয়াংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে, মুদ্রার মান ক্রমাগত নেমে চলেছে, প্রবৃদ্ধির হার অতিমারীর আগেই ৬ দশমিক ২ থেকে ৫০ শতাংশ কমে ৩ দশমিক ৩-এ নেমে এসেছে, মুদ্রাস্ফীতি ১৩ শতাংশের ঘরে ওঠানামা করছে।

ভবিষ্যতে উন্নয়নশীল অর্থনীতির চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশের আরো বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের প্রয়োজন হবে। সেক্ষেত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় নিয়ে আরো বিস্তারিত গবেষণা হওয়া প্রয়োজন। উদ্দেশ্য, ব্যয় বৃদ্ধির কারণগুলো চিহ্নিতপূর্বক সেগুলো কমিয়ে আনার পথ অনুসন্ধান। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ব্যয় সম্পর্কিত তথ্য-উপাত্তের স্বল্পতা ও স্বচ্ছতা-জবাবদিহিতার ঘাটতির কারণে বিভিন্ন ফাঁকফোকর তৈরি হয়, যা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। আশ্চার্য জনক বিষয় হলো, ব্যক্তি খাতে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের চেয়ে সরকারি খাতে নির্মিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণ ব্যয় বেশি। এর পেছনে দুর্নীতি রয়েছে বলে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তার তদন্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশে প্রকল্প বাস্তবায়ন হওয়ার পর তার অডিট হয় না, এটি হওয়া বাঞ্ছনীয়। তাহলে অধিক ব্যয়ের কারণগুলো উঠে আসবে, যা পরবর্তী সময়ে ব্যয় সাশ্রয়ীভাবে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করা সম্ভব হবে।

উচ্চমূলধন ব্যয়ের সঙ্গে উচ্চদুর্নীতির সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থনৈতিক ব্যয় অনেক বেশি। বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে অধিক ব্যয় হলে সেটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। মূলধন ব্যয় বেশি হওয়া এটি হয়। স্বাভাবিকভাবে উচ্চমূলধন ব্যয়ের বোঝা জনগণ ও সরকারকে বহন করতে হয়। এটি দুষ্টচক্রের মতো অর্থনীতির বোঝায় পরিণত হয়। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রী নানা সময়ে প্রকল্পে দুর্নীতির কথা স্বীকার করলেও সেটি বন্ধে তারা অপারগতা প্রকাশ করেছেন। অথচ সরকারের অন্যতম নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ছিল দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ, কিন্তু গত চার বছরে দেশ পরিচালনায় তার খুব বেশি প্রতিফলন দেখা যায়নি।

উন্নয়ন প্রকল্পে বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়িয়ে ধরার পেছনে পরবর্তী সময়ে দুর্নীতির মাধ্যমে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর অসৎ অভিপ্রায় বা উদ্দেশ্য থাকে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। কাজেই উন্নয়ন প্রকল্পে মাত্রাতিরিক্ত বা অপ্রয়োজনীয় ব্যয় প্রস্তাবকারীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক পদক্ষেপসহ জবাবদিহিতার ব্যবস্থা থাকা জরুরি। আশঙ্কার বিষয়, প্রকল্পকেন্দ্রিক অনিয়মের পাশাপাশি বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ দেশের প্রায় সর্বত্রই দুর্নীতি ও দুর্বৃত্তায়নের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এর মূলোৎপাটন করতে হলে আইনের যথাযথ প্রয়োগের পাশাপাশি নাগরিকদের মধ্যে ন্যায়-নীতিবোধ, সততা ও দেশপ্রেম জাগ্রত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে এ ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির তালিকা দীর্ঘতর হতে থাকবে। আমরা মনে করি, সরকারের সদিচ্ছা ছাড়া দেশ থেকে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক অঙ্গীকার। একই সঙ্গে জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন। দেশের মানুষ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণে আগ্রহী, এতে কোনো সন্দেহ নেই। মানুষের এ আগ্রহ কাজে লাগিয়ে উন্নয়ন প্রকল্পসহ সব ক্ষেত্রে বিরাজমান দুর্নীতি নির্মূলে সরকারকে কঠোর হতে হবে।