২৫ মার্চ ১৯৭১ মধ্যরাতের ভয়াল হত্যাযজ্ঞের পরদিন যারা রেডিওর নব ঘুরিয়ে বিবিসি লন্ডন ধরেছেন প্রথম খবরেই তারা শুনেছেন:

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান পূর্ব পাকিস্তানে তার সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করায় সেখানে ব্যাপক লড়াই শুরু হয়েছে বলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে খবর পাওয়া গেছে। অন্যদিকে ভারত থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, শেখ মুজিবুর রহমান প্রদেশটির স্বাধীনতা ঘোষণা করেছেন। পূর্বাঞ্চলের রাজধানী ঢাকায় অবস্থানরত মার্কিন কনসাল জেনারেল জানিয়েছেন, বিরোধীদের দমন করতে সেখানে কামানও ব্যবহার করা হচ্ছে। ভারত থেকে পাওয়া আগের আরেকটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সর্বত্র তীব্র লড়াই চলার খবর পূর্ব পাকিস্তানের একটি গোপন বেতার কেন্দ্র থেকে সম্প্রচার করা হয়েছে। পূর্ব বাংলার সেনা ইউনিটগুলো এরই মধ্যে পুলিশ ও সশস্ত্র বেসামরিক নাগরিকদের সঙ্গে যোগ দিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি সেনা ইউনিটগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তান থেকে সরাসরি কোনো সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে না। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান কঠোর ভাষায় শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে অভিযুক্ত ও সংখ্যাগরিষ্ঠের দল আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন। তিনি তার নিজস্ব কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন। কার্যত আওয়ামী লীগই পূর্ব পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েছিল। প্রেসিডেন্ট সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ ঘোষণা ও প্রেসের ওপর সেন্সরশিপ আরোপ করেছেন।

সেদিন থেকেই শুরু ভারতমুখী শরণার্থী যাত্রা

১৭ এপ্রিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। ১৮ এপ্রিল, ১৯৭১ কলকাতায় অবস্থিত পাকিস্তান ডেপুটি হাইকমিশন বাঙালিদের দখলে চলে এলো। বাঙালিদের হাতে দূতাবাস দখলে পাকিস্তান-ভারত কূটনৈতিক সম্পর্কের আরো অবনতি ঘটল।

স্বীকৃতির জন্য নথি খুলল বাংলাদেশ মিশন

১৯ এপ্রিল, সোমবার কলকাতায় বাংলাদেশ মিশন অফিসে আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়, নতুন নথি খোলা হয়, সে নথির শিরোনাম ‘রিকগনিশন’—স্বীকৃতি; স্বাধীন-সার্বভৌম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ ও নবগঠিত সরকারকে স্বীকৃতি।

স্বীকৃতির প্রথম চাপ ভারতের ওপর। মুজিবনগর সরকার গঠনের পরপর বাংলাদেশ স্বীকৃতির দাবি জানায় ও ভারতের প্রায় সব রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার শোর তোলে। এমনকি ২৮ মার্চ, ১৯৭১ ইউনাইটেড লেফট ফ্রন্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করতে রাষ্ট্রপতি ভি ভি গিরি ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে টেলিগ্রাম পাঠায়। ইন্দিরা গান্ধী ৭ মে এ স্বীকৃতির প্রশ্নে ভারতের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বৈঠকে বসেন। সেখানেও প্রায় সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি অবিলম্বে স্বীকৃতির পক্ষে মত দেন। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার নিজস্ব হিসেব থেকে সরে আসেননি, তিনি বলেছেন ভারতের স্বীকৃতি তখনই বাংলাদেশের অনুকূলে কাজ করবে না, তবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন নেয়া ভারত অব্যাহত রাখবে।

মুসলিম লীগ প্রতিনিধি মোহাম্মদ ইসমাইল বলেন, ভারত সরকারের যেকোনো সিদ্ধান্ত মুসলিম লীগ সমর্থন করবে, তবে এখনই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া সমীচীন হবে না, তাতে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধি পাবে, তার পরিণতি ভালো হবে না। মহারাজা করনি সিং বলেন, বাঙালিদের বিদ্রোহকে ভারতের আশকারা দেয়া ঠিক হবে না। ভারতকে কাশ্মীরের কথাও ভাবতে হবে। কাশ্মীর স্বাধীন হতে চাইলে ভারত কী করবে?

ইন্দিরা গান্ধী বলেন, বাঙালিদের আন্দোলনের পেছনে সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু কিছুসংখ্যক গণবিচ্ছিন্ন মানুষ কাশ্মীরে হাঙ্গামা বাধায়, সেখানকার পরিস্থিতি ভিন্ন। (ভারতীয় সংবাদপত্র থেকে)

ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রতিনিধি সিডনি এইচ শনবার্গকে একটি সাক্ষাত্কার দিয়েছেন (১৯ অক্টোবর ১৯৭১ প্রকাশিত) তাতে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান প্রশ্নে ভারতের ভূমিকা অনেকটা স্পষ্ট করে তোলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আক্রমণের প্ররোচনা কিংবা বৈরিতার সূচনা আমরা অবশ্যই করব না। কিন্তু আমাদের স্বার্থরক্ষার জন্য তো আমাদের জাগ্রত থাকতে হবে এবং আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত পাকিস্তানের খতিয়ান কেবল ঘৃণার ও বেপরোয়া আচরণের। সেখানকার সামরিক শাসন নিজ দেশের ওপরও একটি যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে। এরপর তারা কী করবে আমাদের জানা নেই।’

সরকারি সচিবালয়ে যখন প্রধানমন্ত্রীর সাক্ষাত্কার নেয়া হচ্ছিল, পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালি বিদ্রোহীদের ভারত সামরিক সহায়তা দিচ্ছে কিনা জিজ্ঞেস করা হলে তাকে বিরক্ত মনে হয়। আবার ভারত তাদের সাহায্য করছে না, সুনির্দিষ্টভাবে এমন কিছুও তিনি বলেননি। বরং তিনি বলেছেন, ‘সম্ভবত তাদের সাহায্য করার মতো অনেকেই আছে, অধিকাংশই তাদের নিজেদের লোক, পৃথিবীজুড়ে। তাদের সামনে অনেক পথ খোলা।’ তিনি তার কথার ব্যাখ্যা দেননি।

সাক্ষাত্কারের শেষ দিকে তিনি বলেন, ‘তাদের অস্ত্র থাকুক বা না-ই থাকুক, কেউই তাদের সংগ্রামকে দমিয়ে রাখতে পারবে না।’

ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘পাকিস্তান যে হুমকি দিচ্ছে, আমরা মনে করি, তা পুরোপুরি উপেক্ষা করা যায় না।’ বিশেষ করে তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের গত সপ্তাহের ভাষণের উল্লেখ করে বলেন, ‘ভারতের উগ্র সামরিক প্রস্তুতিকে’ তিনি দোষারোপ করেন এবং এ হুমকি মোকাবেলার জন্য তার দেশের ১২ কোটি মুসলমান মুজাহিদের প্রতি আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে কোনো শান্তি আলোচনার সম্ভাবনা দৃঢ়ভাবে নাকচ করে দেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানকে সবার আগে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমঝোতা করে পূর্ব পাকিস্তান সংকটের সমাধান করতে হবে।

প্রায় সাত মাস ধরে প্রায় পুরোটাই পশ্চিম পাকিস্তানি সৈন্য নিয়ে গঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানিদের আন্দোলন নস্যাৎ করে দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৫ মার্চ সেনাবাহিনী যখন আক্রমণ চালায়, গত ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনকারী এ দলটিকে সেনাশাসকরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে।

সামরিক নির্যাতন লাখ লাখ পূর্ব পাকিস্তানিকে শরণার্থী বানিয়ে ভারতে পাঠিয়েছে। শরণার্থীরা ভারতের ওপর যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করেছে, তাতে ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা তিনি অনুভব করছেন কিনা জিজ্ঞেস করা হয়; এর চেয়ে বেশি হলেই শরণার্থীর এ গণআগমন ঠেকাতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে কিনা জানতে চাওয়া হয়।

ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘আমরা এ রকম একটি অবস্থায় আগেই পৌঁছেছি। কিন্তু তার মানে ভেঙে পড়া নয়। আমরা অবশ্যই দ্রুত সমাধান চাই, আমরা এমন কিছু করতে চাই না, যা আরো বেশি সমস্যার সৃষ্টি করবে। আপনারা জানেন, আমরা চূড়ান্ত সংযমের পরিচয় দিচ্ছি, এ রকম ভয়ংকর প্ররোচনার মুখে আমি গভীরভাবে ভেবে দেখেছি, আর কোনো দেশ এ ধৈর্য ও সংযমের পরিচয় দিতে পারবে বলে আমি মনে করি না।’

‘বাংলাদেশের সামরিক শাসনকে ঠেকা দিয়ে রেখে কোনোভাবেই পাকিস্তানকে শক্তিশালী করা হচ্ছে না।’ ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানে নিক্সন প্রশাসন কর্তৃক অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রাখার ও প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারকে সমালোচনার অনীহার কথা উল্লেখ করেন। পাকিস্তানের জন্য আমেরিকার অস্ত্র প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এখন অস্ত্রের পরিমাণ কত আমার জানা নেই, কিন্তু আমেরিকা আগে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করেছে। আর এসব কেবল আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে, কমিউনিজম বা অন্য যা কিছু তারা বলেছে, কোনোটার বিরুদ্ধেই নয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের আমাদের সঙ্গে বোঝাপড়া বরং অনেক বেশি।’

৭ নভেম্বর নিউইয়র্ক টাইমস-এ জোনাথন ক্যান্ডেলের প্রতিবেদন : যুক্তরাষ্ট্র সফরে আসা প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বলেছেন, যেভাবে পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী ভারতে আসছে তা তার দেশের জন্য ‘ভয়ংকর এক বোঝা’ এবং তা ভারতের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, এমনকি স্বাধীনতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স স্কুুলে স্বতঃস্ফূর্ত বক্তৃতায় তিনি সতর্ক করে দেন, ভারত সহ্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে গেছে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের সর্বব্যাপী আন্দোলন চাপা দেয়ার জন্য যে নির্যাতন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের নির্দেশে তার সেনাবাহিনী চালাচ্ছে তাতে ২৫ মার্চের পর থেকে এ পর্যন্ত ৯০ লাখ শরণার্থী ভারতে প্রবেশ করেছে। পরবর্তী মাসগুলোতে ভারত ও পাকিস্তান দুদেশই সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সেনা মোতায়েন করছে এবং সীমান্তে বিশেষ করে পূর্বাঞ্চলে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।  ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ভারত দেশের স্বার্থ রক্ষায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ—এত ঐক্যবদ্ধ ভারত আগে কখনো হয়নি। আমরা আপনাদের সাহায্য চাই, আমরা আপনাদের সমর্থন চাই, সহানুভূতি চাই। তবে যেখানে লড়াই প্রয়োজন ভারত একাই সেখানে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত। পূর্ব পাকিস্তানের এ সংকটপূর্ণ অবস্থা আকস্মিক কোনো বিদ্রোহ থেকে সৃষ্টি হয়নি বরং তা সামরিক শাসনের অধীনে অনুষ্ঠিত ‘অবাধ নির্বাচনের’ ফল। সীমান্তে কী ঘটছে তা যুদ্ধের হুমকি নয় বরং পূর্ব পাকিস্তানের অভ্যন্তরে যা ঘটে চলেছে তাই যুদ্ধের হুমকির উৎস।

চারদিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে সকাল ৮টা ৩০ মিনিটের ফ্লাইটে প্যারিস যাওয়ার পথে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, শেখ মুজিবুর রহমানকে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যে ম্যান্ডেট দিয়েছিল—বিস্ময়কর সেই ম্যান্ডেট থেকে স্বাধীনতার আন্দোলন। গত নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য জনগণ আমাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন, কিন্তু শেখ মুজিবুর রহমানের ম্যান্ডেটের তুলনায় তা কিছুই নয়।

শরণার্থী পরিসংখ্যান 

২৫ মার্চ, ১৯৭২ ভারতে অবস্থানরত বাংলাদেশের শরণার্থীদের ৩ হাজার ৮৬৯ জনের একটি ব্যাচ বাংলাদেশের পথে ভারত ত্যাগ করে। ঠিক এক বছর আগে ২৫ মার্চ, ১৯৭১ থেকে পূর্ব পাকিস্তানের শরণার্থী আসা শুরু হয়। ৩ হাজার ৮৬৯ জনের এ ব্যাচটিই শেষ ব্যাচ। এর পরপরই কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সব শরণার্থী শিবির বন্ধ করে দেয়া হয়।

ভারত থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ ডকুমেন্ট, দ্বিতীয় খণ্ডে’ বলা হয়েছে, আরো ৬০ হাজার শরণার্থী আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে রয়ে গেছে।

২৫ মার্চ থেকে মোট ৯৮ লাখ ৯৯ হাজার ৩০৫ শরণার্থী ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেছে:



দেশছাড়া শরণার্থীদের সবাই শরণার্থী শিবিরে ঠাঁই পায়নি কিংবা থাকতে চায়নি। যাদের আর্থিক সংগতি ছিল বাড়ি ভাড়া নিয়ে তুলনামূলক উন্নততর জীবনযাপন করেছে। আত্মীয় ও সুহূদরা আশ্রয় দিয়েছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শরণার্থী। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর যারা শরণার্থী হয়ে পূর্ব বাংলায় এসেছিলেন তাদেরও কাউকে কাউকে পুনরায় শরণার্থী হয়ে পশ্চিমবঙ্গে ফিরে যেতে হয়েছে।

স্বীকৃতি প্রশ্ন

ভারত ৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ বাংলাদেশকে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তিসম্মত আলোচনায় এটা প্রতিষ্ঠিত হবে যে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সঠিক সময়েই স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যখন পাকিস্তানের পরাজয় ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পূর্ব বাংলার শরণার্থী একটি বিশ্বসমস্যা

বিশ্বগণমাধ্যম একাত্তরের শরণার্থী সংকটকে গুরুত্ব দিয়েই বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছে। অপেক্ষাকৃত অপরিচিত দেশ মরিশাসের দ্য অ্যাডভান্স-এর ২৭ সেপ্টেম্বর ১৯৭১-এর একটি পর্যালোচনা :

ভিয়েতনামে ঘৃণার আগুন নিভতে শুরু করার আগেই তার চেয়ে ভয়াবহ এক ধ্বংসযজ্ঞ শুরু হয়েছে পূর্ব বাংলায়। ৮৫ লাখেরও বেশি মানুষ তাদের সহায়-সম্পদ পেছনে ফেলে জলকাদা পেরিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়েছে¾তাতে জীবনটা তো বাঁচবে!

মার্চে যখন এই হত্যাযজ্ঞ শুরু হয়, তখন থেকে ভারতে উপচে পড়া শরণার্থী আসছেই। ভারত এমনিতেই জনসংখ্যার ভারে জর্জরিত। প্রায় ৫০ হাজারের মতো শরণার্থী প্রতিদিন সীমানা পেরিয়ে ভারতে পৌঁছছে। শরণার্থী সংখ্যা বেড়ে এখন লন্ডন বা প্যারিসের জনসংখ্যার সমান।

প্রথমে জনসংখ্যার এ ব্যাপক পরিবর্তনে একটি দেশের অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব পড়বে, সে হিসাব করে মতামত জানাতে বিশ্বসম্প্রদায় দেরি করে ফেলেছিল। আর ব্যাপারটা ঘটছে এমন একটি রাষ্ট্রে, যা স্বাধীনতার কাল থেকেই বার্ষিক বন্যা, খরা, উচ্চ জন্মহার এবং যুদ্ধের শিকার। পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের বিশিষ্টজন, যাঁরা নিজ চোখে দেখে এসেছেন, ধন্যবাদ তাঁদের, মানুষের স্মৃতিতে যত অভিবাসনের চিত্র রয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ভয়াবহ এ অভিবাসন।

‘শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার’: ভারতের প্রতিক্রিয়া

৯ আগস্ট, ১৯৭১ ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিং শিরোনামে উদ্ধৃত বিষয়টি নিয়ে ভারতীয় লোকসভায় একটি বিবৃতি প্রদান করেন:

সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের বিবৃতি যে ‘শেখ মুজিবুর রহমানকে কোর্ট মার্শাল করা হবে’ এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের কথিত ‘অধিবেশন পর্যন্ত তিনি বেঁচে থাকবেন কিনা’—এই সন্দিগ্ধতা ভারত সরকার গভীর উদ্বেগের সঙ্গে গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান নিজেই কিছুকাল আগে তার এক বিবৃতিতে শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘পাকিস্তানের ভাবী প্রধানমন্ত্রী’ বলেছেন। যেহেতু আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে ১৬৯টি জাতীয় পরিষদ আসনের মধ্যে ১৬৭টিতেই বিজয়ী হয়েছে এবং পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে, শেখ মুজিবুর রহমান কেবল পূর্ব পাকিস্তানের অবিসংবাদিত নেতা নন, পুরো পাকিস্তানের তিনি নেতা। (চলবে)

 

ড. এমএ মোমেন: সাবেক সরকারি কর্মকর্তা