কভিড-১৯ কমবেশি সবাইকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এ ক্ষতির বিস্তার থেকে কেউ নিস্তার পায়নি। ধনী-দরিদ্র, পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণের কোনো দেশ-জাতি কারো রেহাই ছিল না। এখনো সে ক্ষতির প্রক্রিয়া ও প্রভাব পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে বেশির ভাগ দেশ ও জাতি সে ক্ষতি কাটিয়ে উঠছে এবং ক্ষতি পোষানোর নিত্যনতুন পদ্ধতি গ্রহণ করছে। যে ক্ষতি কখনো পূরণযোগ্য নয়, তা হচ্ছে ‘জীবন দিয়ে’ যারা পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেলেন, সে ব্যক্তিমানুষ, তার পরিবার-পরিজন যে অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন, তা কোনো দিন পূরণ হওয়ার নয়। যে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে তা মূলত ‘জীবিকা’র ক্ষতি। জীবন মানে সংগ্রাম, তাই জীবিতদের জীবিকার সংগ্রাম থেমে নেই। আমাদের আজকের ভাবনা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও করোনাকালে শিক্ষার ক্ষয়ক্ষতি ও তার পুনরুদ্ধার ভাবনা নিয়ে। শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক কাঠামোগত বিষয়াবলি আজকের এ আলোচনায় খুব বেশি আসবে না।

শিক্ষা ক্ষতি বা শিক্ষা ব্যবস্থার লাভ-ক্ষতি সাধারণত অর্থমূল্যে হিসাব করা হয় না। তাই বলে এটি মূল্যহীন তা কেউ বলবে না। নীতি কথায় বলে, ‘বিদ্যা অমূল্য ধন’। একজন বিদ্যার্থীর অর্জিত বিদ্যার অর্থমূল্য কত তা নিরূপণে সমস্যা থাকলেও বিদ্যাশিক্ষা ব্যবস্থার পেছনে সরকার, বিদ্যার্থীর পরিবার ও বিদ্যার্থী নিজে, সমাজ-রাষ্ট্র সবারই বিপুল আর্থিক ব্যয়ের প্রশ্ন জড়িত। ভিন্নভাবে বললে বলতে হয়, শিক্ষা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের উন্নয়নের প্রাথমিক সিঁড়ি। এ সিঁড়ির একেকটি ধাপ উন্নয়নের একেকটি সোপান। অর্থ বা আর্থিক লাভ-ক্ষতির বাইরেও শিক্ষার উন্নতি ও উত্কর্ষ মানে জাতির সামগ্রিক উন্নতি। আবার শিক্ষা ব্যবস্থা একটি বিরাট ‘কর্মসংস্থান কারখানা’, এটি বহু নারী-পুরুষের পেশা বা বৃত্তি। এখান থেকে তারা জীবিকা আহরণ করেন। অনেকের জন্য এটি আবার একটি ব্যবসা, তারা নানা শিক্ষাসামগ্রীর জোগান দেন। তারা ব্যবসা করেন এবং মুনাফা করেন। আবার আজকাল অনেকের জন্য এটি রাজনীতির সস্তা মাঠও বটে। কম খরচে কর্মী সংগ্রহ করে এবং নানা পদ-পদবির সোপান বা সিঁড়ি হিসেবে শিক্ষাঙ্গনকে ব্যবহার করেন। শিক্ষা ব্যবস্থাপনার জন্য সরকারের দুটি মন্ত্রণালয়, অনেক দপ্তর-অধিদপ্তর-বোর্ড, অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিদ্যার্থী, বিদ্যার্থীর পরিবার, শিক্ষক-কর্মচারী, ব্যবসায়ী, লেখক-প্রকাশক নিয়ে কোটি কেটি মানুষ এ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত। প্রতি বছর জাতীয় বাজেটে শিক্ষা খাতে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। এটিকেই সাধারণভাবে ‘শিক্ষা ব্যয়’ বলে ধরে নেয়া হয়। যদিও এটি আসলে শিক্ষা ব্যয়ের সামগ্রিক চিত্র নয়। এটি মূলত সরকারের ব্যয় এবং শিক্ষাকর্মে নিয়োজিত অন্যদের আয়। শিক্ষায় কার সংশ্লিষ্টতা কীভাবে হয় তা নিরূপণ না হলে ক্ষতি নির্ণয় সম্ভব হবে না। তাই প্রথমে কার কার কী ক্ষতি হলো, সেটি বোঝা দরকার। সব ক্ষতি পূরণীয় ও পূরণযোগ্যও নয়। সব ক্ষতিপূরণ প্রচেষ্টা সম্ভব ও সংগত কোনোটাই নয়। এখানেও আবার প্রত্যক্ষ ক্ষতি ও পরোক্ষ ক্ষতির বিষয়টিও রয়েছে।

‘শিক্ষা’ একটি সাধারণ প্রত্যয় বা ধারণা হলেও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা এক ও অভিন্ন কোনো বিষয়বস্তু বা কর্মকাণ্ড নয়। এখানে নানা বিভাজন, নানা অংশীজন। সরকারি-বেসরকারি, বাংলা-ইংরেজি, ধর্মভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ (মাদ্রাসা ও স্কুল), শহর-গ্রাম, স্তরভিত্তিক যথা প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক, উচ্চশিক্ষা তথা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি ও পেশাভিত্তিক শিক্ষা, অতি উচ্চশিক্ষা এবং সব শেষে দেশের শিক্ষা ও বিদেশের শিক্ষা ইত্যাদি বিষয় বিবেচনায় আসবে। দেশে কোনো দুর্যোগ হলে সাহায্য-সহায়তার জন্য ‘ক্ষতিগ্রস্ত’ তালিকা করা হয়। দীর্ঘ তালিকায় নিহত-আহত মানুষ, বাড়িঘর, গাছপালা, গবাদি পশু, পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ফসল ইত্যাদি স্থান পায়। এখানে শিক্ষা ক্ষতির সেরূপ কোনো তালিকা প্রাসঙ্গিক নয়। তবে ক্ষতিগ্রস্ততার প্রকার-প্রকৃতি, গভীরতা ও ব্যাপ্তি বোঝা প্রয়োজন।


কারণ এখানে বস্তুগত ও অবস্তুগত নানা প্রকার ও প্রকরণের ক্ষতি যুক্ত আছে। এখানে জড়িতদের মধ্যে যেমন আছে প্রতিষ্ঠান, তেমনি আছে ব্যক্তি, পেশাজীবী, বিদ্যার্থী, বিদ্যার্থীর অভিভাবক, বিদ্যাদান ও গ্রহণ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত শিক্ষকরা, সরকার, সমাজ, দেশ সবার ব্যক্তি ও সামষ্টিক স্বার্থ। সব ক্ষতি একসঙ্গে করে পুনরুদ্ধারের বিষয় চিন্তা করলে ‘শিক্ষা ক্ষতি’ মানে এককথায় প্রথমে আসবে বিদ্যার্থী বা ছাত্রছাত্রীর পড়াশোনার ক্ষতি ও শ্রেণীকক্ষের বাইরে শিক্ষার্থীর জীবনের দুটি বছর সময়কাল অতিক্রান্তের বিষয়। তারপর দ্বিতীয় স্থানে আসতে পারে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যারা সরকারি ভর্তুকি নিয়ে নয়, শিক্ষার্থীর বেতননির্ভর, তাদের ভিত ধসে পড়া এবং শিক্ষকদের কর্মচ্যুতি। ক্ষেত্রবিশেষে প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়া ও পেশাদার শিক্ষকদের পেশা পরিবর্তন। তৃতীয় স্থানে সুদূরপ্রসারী প্রভাব-প্রতিক্রিয়া হিসেবে বিবেচ্য ব্যাপক হারে শিক্ষার্থী ‘ঝরে পড়া’, শিক্ষার্থীদের পাঠে অমনোযোগী হয়ে পড়া, না পড়িয়ে উচ্চশ্রেণীতে প্রমোশন, শিশুশ্রম, মেয়েদের বাল্যবিবাহসহ আনুষঙ্গিক আরো অনেক বিষয়।

প্রথমে সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে শিক্ষার্থীর শিক্ষাকাল বা সময় নষ্ট হওয়া বা পাঠ পিছিয়ে পড়া সর্বজনীন। এক্ষেত্রে মাধ্যমিক ও মাধ্যমিকের নিম্নের দুটি স্তর তথা প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক এবং তার উপরের (উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর উচ্চশিক্ষা) স্তরগুলোর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। মাধ্যমিকের ওপরের স্তরের যে শিক্ষা সময়ের ক্ষতি এবং পাঠ পিছিয়ে পড়া তা বিশেষ ব্যবস্থায় কিছুটা পূরণযোগ্য হলেও প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে তা খুব একটা সহজ কাজ নয়। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং দরিদ্র মা-বাবার সন্তানদের ক্ষেত্রে তা আরো অনেক জটিল। প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষকদের মধ্যে একটি বড় অংশ পেশা থেকে ছিটকে পড়েছেন। অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ভিত ধসে গেছে কিংবা উদ্যোক্তা তার বিনিয়োগ নিয়ে সরে পড়েছেন।

সরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা করোনাকালীন নিয়মিত বেতন-ভাতা সবই পেয়েছেন, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে যারা শিক্ষার্থীর টিউশন ফি নির্ভর, তাদের বেতন, বিদ্যালয়ের বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ বিলসহ আন্যান্য ব্যয় নির্বাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায় বা বন্ধের উপক্রম হয়। সরকারি বেতন পেয়েও দীর্ঘদিন কর্মহীন অবস্থায় থেকে অনেকের শিক্ষাদান অভ্যাস নষ্ট হয়েছে। অনেকে অতিরিক্ত কোচিং-টিউশন করিয়ে অন্য রকম একটি নতুন পথের সন্ধান পেয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চস্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনলাইন ব্যবস্থার সুযোগে বা সুবাদে সেলফোনকেন্দ্রিক নানা বদভ্যাস জন্ম নিয়েছে বলে অনেকে মনে করছেন। তাতে তারা পড়াশোনায় অমনোযোগী হয়ে পড়েছে। গ্রামশহর সর্বত্র গরিব ছাত্রদের একটি অংশ কাজে ঢুকে পড়েছে। মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেছে। কভিড-পরবর্তী শিক্ষা ব্যবস্থায় সব স্তরে তাই অনেক কিছুই ভেবেচিন্তে করতে হবে। অনলাইন বা দূরশিক্ষণ প্রায়ই সুফল দেয়নি। দধির স্বাদ ঘোলে যতটুকু মেটানো সম্ভব, তাও মেটেনি। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দূরশিক্ষণে তূলনামূলকভাবে ভালো করেছে। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রথমে কোনো উদ্যোগই নেয়নি। পরে যে উদ্যোগ নেয়া হয় তাও ছিল দায়সারা গোছের। তবে সার্বিক বিবেচনায় দূরশিক্ষণ কার্যক্রম, যা করোনার কারণে হাতে নেয়া হয়, তাতে সবাই একটি নতুন পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। ভবিষ্যতে স্বাভাবিক ও সংকট উভয়কালে এ পদ্ধতি ব্যবহারের পথটি উন্মুক্ত হলো। 

বর্তমান আলোচনায় ক্ষতি পোষানোর ক্ষেত্রে প্রথমে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক ও পরে মাধ্যমিক স্তরের প্রতি অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা করা হবে। আমার ধারণা এ দুই স্তরের ক্ষতি অনেক বিস্তৃত ও ব্যাপক। প্রথমে প্রাথমিক স্তরের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের তথ্যগত বিষয়টি টেবিল-১-এ দেখানো হলো।

প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রায় তিন কোটি শিক্ষার্থী, সাড়ে সাত লাখের ওপর শিক্ষক-শিক্ষিকা ও ১ লাখ সাড়ে ৭ হাজার প্রতিষ্ঠান। তিন কোটি শিক্ষার্থীর প্রায় দুই বছর (মার্চ ২০২০ থেকে ফেরুয়ারি ২০২২) ধরে শিক্ষা সময়ে সরাসরি শ্রেণীকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মিথস্ক্রিয়া পুরোপুরি বন্ধ। সেপ্টেম্বর ২০২১ থেকে সীমিত ক্লাস চালুর চেষ্টা করা হলেও হালে তা আবার বন্ধ হয়েছে। পাঁচ বছর বয়সকে বর্ণ পরিচয়ের সূচনা বছর ধরলে ২০১৯-এ যে শিশুর বয়স ছিল পাঁচ, সে শিশুটির বয়স এখন সাত (২০২২) বছর। ছয় বছর থেকে আনুষ্ঠানিক প্রাথমিক শিক্ষা শুরুর সময়কাল নির্ধারণ করলে সে শিশুর বয়স এখন আট বছর। আবার যারা স্কুলে নানা শ্রেণীতে ছিল, তারাও  শিক্ষকের সরাসরি কোনো পাঠ কার্যক্রমে অংশ নিতে পারেনি এবং তারা পাঠ এখন মনে করতে পারে না। মা-বাবা বা অভিভাবক এ সময়ে এ শিশুদের শিক্ষার অগ্রগতির ক্ষেত্রে কতটুকু পারিবারিক অবদান রাখতে সক্ষম হয়েছেন তা স্পষ্ট নয়। এ ক্ষতির জন্য কেউ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়ী নয়। তবে দায় এখন সমাজ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তি সবার এবং সবাইকে এ দায়িত্বের ভাগ নিতে হবে। এ দায় কীভাবে মেটানো হবে সে বিষয়ে আন্তরিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন। এখানে আরো একটি বিষয় ভুলে যাওয়া চলবে না যে শিক্ষা ক্ষতি সবার সমান নয়, অনুন্নত ও আদিবাসী এলাকা, চর, হাওর, পাহাড়, গ্রাম, শহরতলি ও শহর, ধনী-দরিদ্র সবাই একভাবে ক্ষতিগ্রস্ত নয়। তাই এক ও অভিন্ন পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা হবে অন্য রকম ভ্রান্তি। এ সবকিছু মাথায় নিয়ে একটি সুচিন্তিত কর্মপরিকল্পনা প্রয়োজন।

এ ক্ষতি পুরোপুরি পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে কিনা জানি না। তবে এ পুনরুদ্ধার প্রচেষ্টায় নিয়োজিত বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন প্রতিটি বিদ্যালয়ে কর্মঘণ্টা অর্থাৎ শিক্ষার্থী-শিক্ষকের কনট্যাক্ট আওয়ার বৃদ্ধি করতে হবে। বছরের নির্ধারিত কিছু ছুটি কমাতে হবে। বিশেষ পাঠের কিছু বিষয় যেমন গণিত, ভাষা (বাংলা ও ইংরেজি এবং ক্ষেত্রবিশেষে আরবি) এবং বিজ্ঞানে বিশেষ জোর দিতে হবে। এজন্য সরকারের দিক থেকে বর্ধিত বাজেট ও মনিটরিং প্রয়োজন হবে। শিক্ষকদের বর্ধিত সময়ে কাজ করার জন্য কিছু প্রণোদনা এবং বেসরকারি বিদ্যায়তনের পুনর্বাসনে সরকারের এককালীন অনুদান প্রয়োজন হবে। বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য আপত্কালীন বেতন সহায়তাদানের বিষয়টিও অগ্রাধিকার পেতে পারে। এটি বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসা উভয়ের জন্য প্রযুক্ত হতে পারে। শুধু সব মনোযোগ পঠন-পাঠন দিয়ে করোনা-পরবর্তীকালে মানসিকভাবে শিক্ষার্থীর ওপর যেন অতিরিক্ত নতুন চাপ সৃষ্টি করা না হয়। মানসিক, শারীরিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশ, বিনোদন ও সুস্থ সামাজিকীকরণে  সহশিক্ষা কার্যক্রমগুলোরও ভারসাম্যপূর্ণ সংযোগ করতে হবে।

প্রাথমিকের দ্বিতীয় পর্যায়ে শিক্ষা ক্ষতির প্রশ্নে সবচেয়ে বিপন্ন ব্যবস্থা হচ্ছে মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থার। ‘প্রাথমিক শিক্ষা যদি হয় শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি, মাধ্যমিক স্তর হচ্ছে তার মেরুদণ্ড।’ প্রাথমিক শিক্ষায় সংগত কারণে সরকারি বিনিয়োগ সর্বাধিক হলেও মাধ্যমিকে সরকারি বিনিয়োগ ও মনোযোগ সবচেয়ে কম। দেশের পুরো মাধ্যমিক শিক্ষা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, ব্যক্তি ত্যাগ ও বেসরকারি বিনিয়োগের ওপর নির্ভরশীল। এখন এ সংকটকালে এখানে সরকারের কার্যকর মনোযোগ প্রয়োজন। টেবিল-২-এ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কিছু তথ্য পর্যালোচনার জন্য উপস্থাপিত হলো—

মাধ্যমিক শিক্ষা বাংলাদেশে নানাভাবে অবহেলিত। এটির সিংহভাগ বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত। সরকার এমপিও ব্যবস্থায় বেতন সহায়তা এবং ক্ষেত্রবিশেষে নানা প্রকল্পের আওতায় ভবন নির্মাণ ও উপকরণ দিয়ে সহায়তা করে। এখানে প্রকট দক্ষ শিক্ষক সংকট। সরকার নানা উদ্যোগ নিয়ে সিলেবাস, পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা পদ্ধতি পরিবর্তন করে কিন্তু স্কুলগুলোয় পাঠদানের উপযুক্ত শিক্ষক আছেন কিনা, সেটি দেখা না হলে শিক্ষকের অভাব পূরণ হয় না। প্রতি বছর প্রায় ২২ থেকে ২৫ লাখ পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়। পরীক্ষার আগে ৩৬ দশমিক ৭৩ শতাংশ পরীক্ষায় ফেল বা খারাপ ফল করে। আরো ১০-৫ শতাংশ ঝরে পড়ে। কভিডের পর সে পরিস্থিতি আরো অনেক বেশি খারাপ। এখানে সরকারের বর্ধিত বিনিয়োগ প্রয়োজন। গণিত ও ইংরেজি এ দুটি বিষয়ে উপযুক্ত শিক্ষকের অভাব পূরণ না করলে শিক্ষার নিম্নগামী মান কোনোভাবে বাড়ানো সম্ভব হবে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৩০-এর মধ্যে আনতে হলে এ পর্যায়ে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধির বিশেষ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। গণিত, ভাষা (ইংরেজি ও বাংলা) ও বিজ্ঞান শিক্ষায় একটা উত্তরণ দরকার, তার জন্য মাধ্যমিক পর্যায়ে একটি বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রাম প্রয়োজন হবে। এ দেশে ভাষাশিক্ষাকে এমন একটা পর্যায়ে উত্তরণ ঘটাতে হবে, যাতে সাধারণ স্কুলে পড়ে উন্নত মানের বাংলা ও ইংরেজি ভাষা শিখতে পারে। এজন্য ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন যাতে না পড়ে। গণিত ছাড়া উচ্চশিক্ষায় উত্কর্ষ সম্ভব নয়; তাই গণিতের ভিত নিচ থেকে মজবুত করতে হবে। ভাষার সঙ্গে বিজ্ঞান, সাহিত্য, ইতিহাস ও সংস্কৃতি শিক্ষা ধীরে ধীরে গুরুত্বের সঙ্গে বাড়াতে হবে।

বেসরকারি মাধ্যমিক স্কুলগুলোয় ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনা কমিটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দক্ষ স্কুল পরিচালনার সহায়ক নয়। শিক্ষার মান বৃদ্ধির জন্য দক্ষ প্রধান শিক্ষকের কোনো বিকল্প নেই। প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নে স্বচ্ছ ও উপযুক্ত নীতিমালা প্রয়োজন। স্কুলের অন্য শিক্ষকদের ওপর প্রধান শিক্ষকের আইনানুগ নিয়ন্ত্রণ প্রয়োজন। স্কুলের অভ্যন্তরীণ পাঠদান, পাঠ গ্রহণ ও একডেমিক বিষয়ে কমিটির অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে শিক্ষকদের রক্ষা করতে হবে। দেশের সব প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয় কোনো উদ্যোক্তা লাভ, মুনাফা, ডিভিডেন্ড, সম্মানী হিসেবে নিতে পারবেন না। এ আয় শিক্ষার উন্নয়নে ব্যয় করতে হবে। এ বিষয়ে কঠোর আইন ও আইনের প্রয়োগ দরকার।

মাধ্যমিক স্তরে করোনা ক্ষতি পুনরুদ্ধারে পরিচালনা কমিটি ও শিক্ষদের করণীয় নির্ধারণের জন্য দরকার সরকারি উদ্যোগে দ্রুত একটি স্টাডি এবং আগামী জাতীয় বাজেটে সে অনুযায়ী নতুন বরাদ্দ নীতিমালা। সারা দেশের মাধ্যমিক পর্যায়ে পাঠদানরত সব স্কুল ও মাদ্রাসার গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞান শিক্ষকের অবস্থা, সংখ্যা ও মান নিরূপণ করা দরকার। আগামী অর্থবছরের (২০২২-২৩) মধ্যে এসব বিষয়ের শূন্য পদগুলো পূরণের এবং শিক্ষকদের যথাযথ প্রশিক্ষণদানের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবস্থা অবলোকন ও উত্কর্ষ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রদানের জন্য একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করে জরুরি ভিত্তিতে প্রতিবেদন  প্রয়োজন। প্রয়োজন অতিদ্রুত একটি কর্মপরিকল্পনা।

দুই.

দেশে উচ্চশিক্ষা নানামুখী সংকটে নিপতিত। এখানে যোগ্য শিক্ষকের অভাব দেখি না। দেখি নীতি-নৈতিকতার অবনমন। রাজনৈতিক দলের সংযোগ, প্রত্যক্ষ দলবাজি ও স্বার্থদলের কারসাজি। সরকারি কলেজ পর্যায়ে শিক্ষার মান প্রত্যাশা অনুযায়ী না থাকার সংগত কারণ দেখা যায় না। ওখানে পাঁচটি বিয়য়ে নজর দিতে হবে—১. আসন সংখ্যা নির্ধারণে ছাত্র-শিক্ষক অনুপাত ১:৩৫-৪০-এর বেশি কোনোক্রমে সমীচীন নয়; ২. ঢালাও সরকারীকরণ ও ঢালাওভাবে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিচার না করে নতুন বিভাগ খুলে দেয়া প্রতিহত করতে হবে; ৩. প্রিন্সিপাল ও ভাইস প্রিন্সিপাল নিয়োগ, পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে স্বচ্ছ নীতিমালা অনুসরণ; ৪. শিক্ষক ও ছাত্রদের দলীয় রাজনীতির প্রভাব হ্রাসের ব্যাপারে রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং ৫. শিক্ষকদের পদায়ন, পদোন্নতি ও প্রশাসনিক পদে নিয়োগে দক্ষতা, যোগ্যতা ও ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ। বেসরকারি কলেজগুলোর ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ঠেকাতে হবে। শিক্ষক নিয়োগে বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে এবং শিক্ষকদের মধ্যে পূর্ণকালীন শিক্ষক নিয়োগ করতে হবে। খণ্ডকালীন শিক্ষকতা ও পূর্ণকালীন রাজনীতি ও ব্যবসা করা অনেক শিক্ষক বেসরকারি কলেজগুলোয় থাকেন, ওইসব পরিহার করতে হবে। রাজনৈতিক নানা তদবিরে প্রিন্সিপাল নিয়োগ করা যাবে না। পরিচালনা কমিটিতে সরকারি প্রতিনিধির ছদ্মাবরণে রাজনীতির লোকদের পদায়নও বন্ধ করতে হবে।

বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে শুধু দুটি কথাই বলব। এক. পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আইন কাঠামো পর্যালোচনা করে উপাচার্যসহ সব নিয়োগে পেশাদারিত্বকে প্রাধান্য দিলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। দুই. বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে এত নির্বাচন কতটুকু সংগত তা ভেবে দেখতে হবে। তিন. স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের সুরক্ষা চাইলে শিক্ষকদের নিজ নিজ কর্মের স্বমূল্যায়নের বিকল্প নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কথা বলতে গেলে এক. উদ্যোক্তাদের ব্যবসা, বিনিয়োগ ও মুনাফা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বন্ধ করা নিশ্চিত করতে হবে। পরিবার বা আত্মীয় দিয়ে উপচার্য, উপ-উপাচার্য ও কোষাধ্যক্ষ নিয়োগ বন্ধ করতে হবে। দুই. শিক্ষক-ছাত্র অনুপাতকে মানদণ্ড ধরে ছাত্র ভর্তির সীমা নির্ধারণ করতে হবে। তিন. সব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির মধ্যে সমতার নীতি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। চার. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘মালিক’ নন, ট্রাস্টি—এ দর্শন বুঝতে হবে। পাঁচ. সরকারি-বেসরকারি নির্বিশেষে দেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের মান উন্নয়ন ও সুশাসনের লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের ভূমিকাকে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করতে হবে।

তিন.

উপসংহারের বক্তব্যে করোনা-পরবর্তী পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সামনে রেখে আমরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ক্ষতি পোষানোর উপযোগী বাস্তব পদক্ষেপ এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে ভবিষ্যতে অনেক বেশি সরকারি মনোযোগ ও বিনিয়োগের আশা করব। এখানে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য যে পৃথিবীর সব জাতির সঙ্গে একমত হয়ে আমরা ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যগুলো’ অর্জনে অঙ্গীকারবদ্ধ। সে অঙ্গীকারের মূল প্রমিজ ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়, সকলে মিলে সকলের জন্য উন্নয়ন’ সুনিশ্চিত করতে হবে। পূর্ববর্তী দশকে সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাংলাদেশ প্রশংসাযোগ্য সফলতা দেখিয়েছিল। আমরা দৃঢভাবে বিশ্বাস করি, ২০৩০-এর মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এরই মধ্যে যেসব পদক্ষেপ বাংলাদেশ নিয়েছে তা আশাপ্রদ। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার চার নম্বর লক্ষ্যটিই হচ্ছে শিক্ষায় উত্কর্ষ অর্জন। কভিডের কারণে শিক্ষা ক্ষেত্রে অগ্রগতি যতটুকু ব্যাহত হয়েছে, তা পূরণ করে শিক্ষায় একটি নতুন গতি সঞ্চার করা সম্ভব হবে। আগামী একটি দশকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত উত্কর্ষকে একটি নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই হোক আমাদের সবার অঙ্গীকার।

 

ড. তোফায়েল আহমেদ: গবেষক ও শাসন বিশেষজ্ঞ