প্রকৃতি ও পরিবেশ আমাদের জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য। প্রকৃতিকে আশ্রয় করেই সভ্যতার সূচনা হয়েছে এবং বিকাশ লাভ করছে। কিন্তু প্রকৃতির ওপর যখন অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে, তখনই পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে। বস্তুত সভ্যতার উন্মেষে মানুষের বসবাসের যে চাহিদা তার আলোকে আবাসন নির্মাণ বেড়ে গেছে। আর এ আবাসন তৈরি করতে গিয়েই জলাভূমি ধ্বংস করা হচ্ছে। নদী দখলের পাশাপাশি দূষণের হারও বেড়ে গেছে।

বণিক বার্তায় প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, ঢাকা শহরের ৫৭ শতাংশ জলাভূমি আবাসন প্রকল্পে চলে গেছে। নদী থেকে অবাধে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। সিলেটে পরিবেশ বিনষ্ট করে পাথর উত্তোলন করা হয়। নদ-নদী, জলাভূমি দখল, দূষণ, বালি-পাথর উত্তোলন প্রতিরোধে প্রশাসন যেন অসহায়। এভাবে পরিবেশ ধ্বংস করে সুষম উন্নয়ন সম্ভব নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মত দিয়েছেন।

প্রকৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে উন্নয়ন করা হলে সেটি টেকসই হবে না। এর মাধ্যমে প্রাণ ও প্রকৃতির যেমন ক্ষতি হবে, তেমনি আমরা প্রয়োজনীয় অক্সিজেন থেকে বঞ্চিত হব। নদীতে দূষণ হলে মাছ মারা যাবে, মাছের প্রয়োজনীয় বংশ বিস্তার ঘটবে না। এছাড়া জলজ প্রাণীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষিভিত্তিক দেশের সেচ ব্যবস্থা নদ-নদীর ওপর অধিকাংশ নির্ভর করে। সেচকার্য পরিচালনা এবং দেশের জলবায়ু পরিবর্তন রোধে নদীর সর্বাধিক গুরুত্ব রয়েছে। ফলে আমাদের নিজেদের স্বার্থেই নদী রক্ষা করতে হবে। 

নদী দখলকারীরা অনেক প্রভাবশালী, এমনকি তারা এখন নদী রক্ষা কমিশনেও প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টরা ব্যবস্থা নিতে পারছেন না। এছাড়া বাংলাদেশের হাওরগুলো হচ্ছে ইউনিক ইকো সিস্টেম। কিন্তু দখলদাররা হাওর দখল করে নিয়ে যাচ্ছে, যা রক্ষায় প্রশাসন ব্যর্থ হয়েছে।

এক্ষেত্রে পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো আন্দোলন করলেও নদী রক্ষা কমিশনের যে বলিষ্ঠ ভূমিকা থাকা দরকার ছিল, সেটা পাওয়া যাচ্ছে না। কমিশনের এ অসহায়ত্বের ফলে দখলদারদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। অথচ জেলা প্রশাসনের কাছে নদীসংক্রান্ত শত বছরের পুরনো কাগজ থাকার পাশাপাশি স্পারসোর মাধ্যমেও সহজেই নদী দখলদারদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেয়া যায়। কিন্তু এক্ষেত্রে দুঃখজনকভাবে নদী রক্ষা কমিশনের শক্ত পদক্ষেপের দেখা মিলছে না।

সব মিলিয়ে দেশে জলাভূমি ও নদী দখলের দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে। এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স ২০২২ অনুযায়ী জলাভূমি হারানোর ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ ৪৪ দশমিক ৬ নম্বর নিয়ে বিশ্বে ১০২তম অবস্থানে রয়েছে। বিগত তিন দশকে জলাভূমি তথা প্লাবনভূমি ও হাওর এলাকায় রাস্তাঘাট, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ ব্যাপক ভৌত অবকাঠামোগত উন্নয়ন সাধিত হয়েছে। অধিকাংশ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বেলায়ই স্থানীয় ভূসংস্থানিক অবস্থা এবং প্রাকৃতিক পানিপ্রবাহের বিষয়টিকে অগ্রাহ্য করায় নিম্নমানের নিষ্কাশন ব্যবস্থা তথা জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে এবং স্থানীয় ভূপৃষ্ঠ জলরাশিতেও এর প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। এ ধরনের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড অতি দ্রুত ব্যাপক মাত্রায় জলাভূমির রূপান্তর সাধন করছে।

জলাভূমিগুলোতে মানুষের হস্তক্ষেপের ফলে দেশের প্রতিবেশ ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে এবং জলাভূমির দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। জলাভূমিগুলোর ক্রমাবনতি বহু সমস্যার জন্ম দিয়েছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জলাভূমির গতিশীল প্রতিবেশ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে থাকে। তাই জলাভূমির যেকোনো ধরনের পরিবর্তন অবশ্যই সতর্কতার সঙ্গে করতে হবে।

আমাদের জীবন, জীবিকা, সংস্কৃতি—সবকিছুর সঙ্গে নদীর সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু দখল-দূষণে নদী এখন বিপন্ন হয়ে যাচ্ছে। যারা নদী দখলের সঙ্গে যুক্ত, তাদের আইনের আওতায় আনা উচিত। এক্ষেত্রে বিলম্ব হলে তখন আর নদীগুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে না।

এদিকে রাজধানী ঢাকা শহরে এমনিতেই জলাভূমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে। নদী দখলের পাশাপাশি খালগুলো দখল হয়ে গেছে। ফলে শহরের উষ্ণতা যেমন বাড়ছে, তেমনি ডেঙ্গুর প্রকোপও বেড়েছে। জলাশয় দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে। সিলেটের জাফলংয়ে পাথর উত্তোলন বন্ধ করা যাচ্ছে না। নদী তীর থেকে বালু উত্তোলনকারীরা আইনের তোয়াক্কা করছে না। হাওরাঞ্চল রক্ষণাবেক্ষণে অবহেলা প্রদর্শন করা হচ্ছে। এর সবই প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ায় সম্ভব হচ্ছে। 

জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র, জীববৈচিত্র্য, স্থানীয় ও আঞ্চলিক তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, মিঠাপানির আধার, ভূগর্ভস্থ পানি পুনর্ভরাট, কার্বন আধার, জলবায়ুর অভিঘাত প্রশমন ও অভিযোজন, জীবিকার উৎস, অর্থনীতি ইত্যাদিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। তাই জলাভূমি দ্রুত হারিয়ে যাওয়া থেকে রক্ষা, সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে জাতীয় পর্যায়ে এখনই সচেষ্ট হওয়া জরুরি।

শুধু পানি ধরে রাখার কাজেই জলাভূমি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে না, বরং বন্যার অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার মাধ্যমে বন্যার ঝুঁকি কমায়। পানিপ্রবাহ এবং পানি সংরক্ষণ জলাভূমি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। তাই জলাভূমিকে পৃথিবীর কিডনি বলা হয়। জলাভূমি পৃথিবীতে জীবন টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তাই আমাদের নিজেদের স্বার্থেই জলাভূমি বাঁচিয়ে রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

নদী থেকে পানি উত্তোলন, নদী শাসন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে বাঁধ নির্মাণ, ভূমি ব্যবহারে পরিবর্তন, কৃষি সম্প্রসারণ, বন নিধন, অনিয়ন্ত্রিত পাথর ও বালি উত্তোলন, মাটি ও পানি দূষণ ইত্যাদি কারণে জলাভূমির পরিবর্তন হয়েছে। জলাভূমি এলাকায় বিগত কয়েক দশকে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে মানব বসতি গড়ে উঠেছে। এতে ধানের উৎপাদন, মাছ চাষ, সড়ক যোগাযোগের উন্নতিতে আর্থসামাজিক উন্নতির পাশাপাশি জলাভূমির পরিমাণ কমেছে, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি হয়েছে, জীববৈচিত্র্য বিলুপ্তি বা হুমকিতে পড়েছে, কোথাও কোথাও জীবন-জীবিকায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

পরিবেশ রক্ষার স্বার্থেই জলাভূমি সংরক্ষণ করে উন্নয়ন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। এক্ষেত্রে পরিবেশকে অবহেলা করলে নগর জীবনের ভোগান্তিই বাড়বে। নদীমাতৃক বাংলাদেশে নদীকে অবহেলা করলে এর কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। আমরা আশা করব নদী রক্ষায় সরকার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। এক্ষেত্রে নদী রক্ষা কমিশনকে কার্যকর করার কোনো বিকল্প নেই। নদী দখলকারীর তালিকা মুছে ফেলার যে অভিযোগ উঠেছে সেটির যথাযথ তদন্ত প্রয়োজন। নদী রক্ষা কমিশন যেন নদী দখলকারীদের স্বার্থ রক্ষা না করে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষেরও (রাজউক) ঢাকা শহরের পরিবেশের স্বার্থে জলাধার রক্ষায় ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে সরকার যেন নদী দখলদারদের কাছে দুর্বল না হয়ে পড়ে সেটি শক্তভাবে দেখভাল করা দরকার। আমরা প্রত্যাশা করি জলাশয়গুলো মুক্ত অবস্থায় থাকবে এবং শহর উন্নয়নে নদী ও মুক্ত জলাধারকে পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখা হবে।