২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল নির্ধারিত ‘স্বল্পোন্নত দেশের’ ক্যাটাগরি থেকে ‘উন্নয়নশীল দেশের’ ক্যাটাগরিতে উত্তরণের প্রক্রিয়া শুরু করেছে এবং ওই প্রক্রিয়ার সফল পরিসমাপ্তির পর ২০২৬ সালে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে পরিগণিত হবে। এর আগে ২০১৫ সালে বিশ্বব্যাংকের ‘নিম্ন আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরি থেকে বাংলাদেশ ‘নিম্নমধ্যম আয়ের দেশ’ ক্যাটাগরিতে উত্তীর্ণ হয়েছিল। বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ক্রমান্বয়ে বেড়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৮ দশমিক ১৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছিল। ২০২০-২২ পর্বে নভেল করোনাভাইরাস মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের অভিঘাতে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার কমে গেলেও তা ৫ শতাংশের কাছাকাছি ছিল এবং ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আবার সাড়ে ৬ শতাংশ অতিক্রম করবে বলে প্রাক্কলন করা হচ্ছে। অথচ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধের বিজয়লগ্নে এ নব্য স্বাধীন দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আদৌ টিকে থাকতে পারবে কিনা তা নিয়ে বিশ্বের অনেক উন্নয়ন-অর্থনীতিবিদ ও ওয়াকিবহাল মহলের গভীর হতাশা ছিল। ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে জনসন নামের যুক্তরাষ্ট্রের একজন কূটনীতিক যখন স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ ‘ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস’ হবে বলে মন্তব্য করেছিলেন তখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিক্সনের তদানীন্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ও ১৯৭৩ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বখ্যাত সেক্রেটারি অব স্টেট ড. হেনরি কিসিঞ্জার তাতে সায় দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের ওপর ১৯৭৫ সালে প্রকাশিত ইউস্ট ফালান্ড ও জন পারকিনসনের বিশ্বখ্যাত গবেষণা-পুস্তকটির নামই ছিল বাংলাদেশ—এ টেস্ট কেস অব ডেভেলপমেন্ট। বইটির পঞ্চম পৃষ্ঠায় পরিষ্কারভাবে এ দুজন উন্নয়ন-গবেষক বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন ওই পর্যায়ে তাদের বিবেচনায় খুবই কঠিন মনে হয়েছে।

স্বাধীনতার চার দশক পর একুশ শতকের দ্বিতীয় দশক থেকে বাংলাদেশ সম্পর্কে এমন হতাশাজনক অভিমত দ্রুত বদলাতে শুরু করেছিল। ২০১১ সালে বিশ্বখ্যাত মার্কিন দৈনিক পত্রিকা দি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় অগ্রযাত্রার বিষয়ে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে এ-বিষয়ে বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল। ২০১২ সালে ব্রিটেন থেকে প্রকাশিত অর্থনীতি বিষয়ে বিশ্বের শীর্ষস্থানে অবস্থানকারী সাপ্তাহিক পত্রিকা দি ইকোনমিস্ট নিশ্চিত করল যে সত্যি সত্যিই বাংলাদেশের অর্থনীতি উন্নয়নের এমন এক স্তরে উপনীত হয়েছে যেখান থেকে অর্থনীতিবিদরা প্রকৃতপক্ষেই আশাবাদী হয়ে উঠছেন যে বাংলাদেশ ক্রমেই অনুন্নয়ন ও দারিদ্র্য কাটিয়ে উঠছে। ২০১২ সালের ১৮ ডিসেম্বর ব্রিটেনের আরেকটি খ্যাতনামা দৈনিক পত্রিকা দ্য গার্ডিয়ান ভবিষ্যদ্বাণী করল যে বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারলে ২০৫০ সালে বাংলাদেশের অর্থনীতি ইউরোপের প্রধান কয়েকটি অর্থনীতিকেও ছাড়িয়ে যাবে। অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে ঘোষণা দিলেন, ভারতের চেয়ে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও মানব উন্নয়নের অনেকগুলো ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের অর্জন ভারতের চেয়ে ভালো। এর কিছুদিন পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সংস্থাগুলোর অন্যতম গোল্ডম্যান স্যাকস ‘ব্রিকস’ (ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন ও দক্ষিণ আফ্রিকা) নামে অভিহিত বিশ্বের দ্রুত উত্থানশীল অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর ঠিক পেছনে অবস্থানকারী ‘পরবর্তী ১১ বর্ধনশীল অর্থনীতির’ তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল। ২০২০ সালে আইএমএফ ঘোষণা করেছে যে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি পাকিস্তানের চেয়ে ৮০ শতাংশ বেশি হয়ে গেছে। অতএব, স্বীকার করতেই হবে যে জিডিপি ও জিএনআই প্রবৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচক দুই দশক ধরে সন্দেহাতীতভাবে জানান দিয়ে চলেছে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনুন্নয়ন ও পরনির্ভরতার ফাঁদ থেকে মুক্ত হয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে যাত্রা করেছে।

কিন্তু মাথাপিছু জিডিপি যেহেতু একটি গড় সূচক তাই মাথাপিছু জিডিপি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যদি দেশে আয়বণ্টনে বৈষম্যও বাড়তে থাকে তাহলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর কাছে পুঞ্জীভূত হওয়ার প্রবণতা ক্রমে শক্তিশালী হতে থাকে, ফলে নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ প্রবৃদ্ধির ন্যায্য হিস্যা থেকে বঞ্চিত থেকে যায়। অতএব আয়বৈষম্য ক্রমে বাড়তে থাকার প্রবণতাকে দেশের আসন্ন মহাবিপদ সংকেত বললে অত্যুক্তি হবে না। প্রবৃদ্ধির সুখবরের পাশাপাশি এই একটি মহাবিপদ এ দেশের ১৯৭৫-পরবর্তী শাসক মহল তাদের ভ্রান্ত অর্থনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন কৌশলের মাধ্যমে ডেকে এনেছে। দুঃখজনকভাবে আশির দশক থেকেই এ দেশে আয় ও সম্পদবৈষম্য ক্রমে বাড়তে বাড়তে এখন বাংলাদেশ একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

অর্থনীতিতে আয়বৈষম্য বৃদ্ধি বা হ্রাস পরিমাপ করার জন্য নানা পরিমাপক ব্যবহার করা হয়, যার মধ্যে লরেঞ্জ কার্ভ এবং জিনি সহগ অন্যতম। কোনো অর্থনীতির জিনি সহগ যখন দ্রুত বাড়তে থাকে এবং শূন্য দশমিক ৫-এর কাছাকাছি পৌঁছে যায় বা শূন্য দশমিক ৫ অতিক্রম করে তখন নীতিনির্ধারকদের বোঝার কথা যে আয়বৈষম্য মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত হাউজহোল্ড ইনকাম অ্যান্ড এক্সপেনডিচার সার্ভে মোতাবেক বাংলাদেশের জিনি সহগ নির্ধারিত হয়েছে শূন্য দশমিক ৪৮৩, যা ১৯৭৩ সালে ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৩৬। আরেকটি পরিমাপকের গতি-প্রকৃতির মাধ্যমে ২০১০ ও ২০১৬ সালের মধ্যে আয়বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিপক্ষে এবং ৫-১০ শতাংশ ধনাঢ্য গোষ্ঠীগুলোর পক্ষে চলে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি ফুটে উঠেছে: ২০১০ সালে দরিদ্রতম ৫ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপির শূন্য দশমিক ৭৮ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে মাত্র শূন্য দশমিক ২৩ শতাংশে নেমে গেছে। ২০১০ সালে দরিদ্রতম ১০ শতাংশ জনসংখ্যার মোট আয় ছিল মোট জিডিপির ২ শতাংশ, ২০১৬ সালে তা মাত্র ১ দশমিক শূন্য ১ শতাংশে নেমে গেছে। সমস্যার আরেক পিঠে দেখা যাচ্ছে, দেশের ধনাঢ্য ১০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ২০১০ সালে ছিল মোট জিডিপির ৩৫ দশমিক ৮৫ শতাংশ, যা ২০১৬ সালে বেড়ে ৩৮ দশমিক ১৬ শতাংশে পৌঁছে গেছে। আরো দুঃখজনক হলো, জনগণের সবচেয়ে ধনাঢ্য ৫ শতাংশ জনগোষ্ঠীর দখলে ২০১৬ সালে চলে গেছে মোট জিডিপির ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ, যা ২০১০ সালে ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা সংস্থা ‘ওয়েলথ এক্স’-এর প্রতিবেদন ওয়ার্ল্ড আল্ট্রা ওয়েলথ রিপোর্ট-২০১৮ মোতাবেক ২০১২ সাল থেকে ২০১৭ এ পাঁচ বছরে অতি ধনী বা ধনকুবেরের সংখ্যা বৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশ্বের বড় অর্থনীতির দেশগুলোকে পেছনে ফেলে সারা বিশ্বে এক নম্বর স্থানটি দখল করেছে বাংলাদেশ। ওই পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ধনকুবেরের সংখ্যা বেড়েছে বার্ষিক ১৭ দশমিক ৩ শতাংশ হারে, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ধনকুবেরের সংখ্যা ছিল ২৫৫। ওই গবেষণা প্রতিবেদনে ৩০ মিলিয়ন বা ৩ কোটি ডলারের (প্রায় ৩০০ কোটি টাকা) বেশি নিট সম্পদের অধিকারীদের ‘আল্ট্রা-হাই নিট-ওয়ার্থ’ (ইউএইচএন ডব্লিউ’) ইনডিভিজুয়াল হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশের ১৯৭২ সালের সংবিধানে সমাজতন্ত্রকে অন্যতম রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলেও ১৯৭৫-এর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন মার্কিনপন্থী খোন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের সরকার পাকিস্তানি স্টাইলে ক্রোনি ক্যাপিটালিজম (স্বজনতোষী পুঁজিবাদ) প্রতিষ্ঠাকে এ রাষ্ট্রের মূলনীতি হিসেবে ফিরিয়ে এনেছিল। আশির দশকে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ‘কাঠামোগত বিন্যাস কর্মসূচি’ ‘নিউ লিবারেল’ নীতিমালা সংস্কারের ধারাবাহিকতাকে জোরদার করার জন্যই পরিচালিত হয়েছিল। আমদানি উদারীকরণ, বিরাষ্ট্রীয়করণ, ব্যক্তিখাতে সরকারি নিয়ন্ত্রণ হ্রাস ও অর্থনীতিতে সরকারি ভূমিকার সংকোচন এবং বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ তাদের প্রেসক্রিপশনগুলোর মূল ফোকাস ছিল। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সরকার পালাক্রমে এ দেশে গত ৩২ বছরের মধ্যে ৩০ বছর সরকারে আসীন থাকলেও দেশে আয়বৈষম্য নিরসনে তাদের কোনো ভূমিকা ছিল না। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের ২০১০ সালের ঐতিহাসিক রায়ের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১১ সালে গৃহীত সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় নীতি হিসেবে সংবিধানে সমাজতন্ত্র ফেরত এসেছে। কিন্তু নামকাওয়াস্তে সমাজতন্ত্রকে সংবিধানে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা হলেও সরকার এ ব্যাপারে নীরবতা পালনকেই নিরাপদ মনে করছে। এর দুটো কারণ আন্দাজ করা যায়: প্রথমত, আওয়ামী লীগ নব্বই দশকের শুরুতেই ‘মুক্ত বাজার অর্থনীতি’ প্রতিষ্ঠাকে তাদের রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ঘোষণা করেছে। দ্বিতীয়ত, সমাজতন্ত্র এখন আর রাজনৈতিকভাবে জনপ্রিয় নয়।

সাধারণ জনগণের কাছে বোধগম্য যেসব বিষয় আয়বৈষম্য বিপজ্জনক স্তরে পৌঁছানোর জানান দিচ্ছে সেগুলো হলো: ১. দেশে প্রাথমিক শিক্ষার স্তরে ১১ ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যেখানে মাতা-পিতার বিত্তের নিক্তিতে সন্তানের স্কুলের এবং শিক্ষার মানে বৈষম্য সৃষ্টি হচ্ছে; ২. দেশে চার ধরনের মাধ্যমিক এবং উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে; ৩. দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার পুরোপুরি বাজারীকরণ হয়ে গেছে; ৪) ব্যাংকের ঋণ সমাজের একটা ক্ষুদ্র অংশের কুক্ষিগত হয়ে যাচ্ছে এবং ঋণখেলাপি বিপজ্জনকভাবে বাড়ছে; ৫) দেশের জায়গা-জমি, অ্যাপার্টমেন্ট, প্লট, ফ্ল্যাট, মানে রিয়াল এস্টেটের দাম প্রচণ্ডভাবে বেড়েছে; ৬) বিদেশে পুঁজি পাচার মারাত্মকভাবে বাড়ছে; ৭) ঢাকা নগরীতে জনসংখ্যা দুই কোটিতে পৌঁছে গেছে, যেখানে আবার ৪০ শতাংশ বা ৮০ লাখ মানুষ বস্তিবাসী; ৮) দেশে গাড়ি, বিশেষত বিলাসবহুল গাড়ি আমদানি দ্রুত বেড়েছে; ৯) বিদেশে বাড়িঘর, ব্যবসাপাতি কেনার হিড়িক পড়েছে; ১০) ধনাঢ্য পরিবারগুলোর বিদেশ ভ্রমণ বাড়ছে; ১১) উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের বিদেশে পড়তে যাওয়ার প্রবাহ বাড়ছে; ১২) উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যদের চিকিৎসার জন্য ঘন ঘন বিদেশে যাওয়ার খাসলত বাড়ছে; ১৩) প্রাইভেট হাসপাতাল ও বিলাসবহুল ক্লিনিক দ্রুত বাড়ছে; ১৪) প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার হিড়িক পড়েছে; ১৫) দেশে ইংলিশ মিডিয়াম কিন্ডারগার্টেন, ক্যাডেট স্কুল, পাবলিক স্কুল এবং ও লেভেল/এ লেভেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার মোচ্ছব চলছে। আবার অন্যদিকে দরিদ্র জনগণের সন্তানদের জন্য মাদ্রাসা গড়ে তোলার হিড়িক চলছে; ১৬) প্রধানত প্রাইভেট কারের কারণে সৃষ্ট ঢাকা ও চট্টগ্রামের ট্রাফিক জ্যাম নাগরিক জীবনকে বিপর্যস্ত করছে; এবং ১৭) দেশে রাজনৈতিক ও আমলাতান্ত্রিক দুর্নীতি বেড়ে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করে দিচ্ছে পদে পদে। দুর্নীতিলব্ধ অর্থের সিংহভাগ বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

২০২০-২২ পর্বের করোনাভাইরাস মহামারী এবং ২০২২-২৩ পর্বের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে সারা বিশ্বে মারাত্মক মূল্যস্ফীতি সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে, যা বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের জীবনকেও বিপর্যস্ত করে চলেছে। ২০২০ সালে যেখানে বাংলাদেশের দারিদ্র্যসীমার নিচের জনসংখ্যার হার ২০ শতাংশে নেমে এসেছিল, তা আবার গত তিন বছরে ৩০ শতাংশের বেশি হয়ে গেছে বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। কিন্তু, বর্তমান সরকার শুধু মাথাপিছু জিডিপি নিয়েই মাতামাতি করছে। আয়বৈষম্য বিপজ্জনকভাবে বেড়ে গেলে জিডিপি প্রবৃদ্ধির ফসল যে সমাজের উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তদের দখলে চলে যায় সেটা জনগণের কাছ থেকে লুকোতে চাইছে তারা। প্রান্তিক অবস্থানের শ্রমজীবী জনগণ এমন প্রবৃদ্ধি থেকে তেমন সুফল পায় না। সরকার যেহেতু ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’-এর পথ অনুসরণ করে ‘ক্রোনি ক্যাপিটালিজম’কে সোৎসাহে চালু রেখেছে তাতে আয়বৈষম্য নিরসনের কোনো তাগিদ সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের মধ্যে পরিদৃষ্ট না হওয়াই স্বাভাবিক। আয়বৈষম্যের ব্যাপারে বাংলাদেশ সরকারের এ দুঃখজনক অমনোযোগ অগ্রহণযোগ্য। বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে আয়বৈষম্য বেড়ে দেশটি অচিরেই একটি ‘উচ্চ আয়বৈষম্যের দেশে’ পরিণত হবে তা কারোই কাম্য হওয়ার কথা নয়। 

ড. মইনুল ইসলাম: সাবেক সভাপতি, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতি; একুশে পদকপ্রাপ্ত অর্থনীতিবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়