পাহাড়-নদী-জলা-বন-মাঠের বৈশিষ্ট্য ধারণকারী হাওরাঞ্চল যেন পুরো বাংলাদেশেরই প্রতিনিধি। একসঙ্গে এত সব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের সম্মিলন এবং বিপুল প্রাণবৈচিত্র্যের সমাহার এ অঞ্চলকে দেশের আর দশটা এলাকা থেকে করেছে স্বতন্ত্র। হাওর ঘিরে যেকোনো পরিকল্পনায় এই অনন্যতা বিবেচনায় রাখা অত্যাবশ্যক। দুঃখজনকভাবে বিদ্যমান উন্নয়ন ডিসকোর্সে বিষয়টি যথাযথভাবে গুরুত্ব পায়নি। ফলে অঞ্চলটিতে প্রাণ-প্রাচুর্য যেমন সংকুচিত হয়ে আসছে, হাওরকেন্দ্রিক কৃষিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে হাওরাঞ্চল নিয়ে অনেক দিন ধরে সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও নানা আলোচনা হয়ে আসছে। কিছুদিন আগে বণিক বার্তা-এএলআরডির আয়োজনেও এক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং তা নিয়ে বৃহস্পতিবার একটি ক্রোড়পত্রও প্রকাশ হয়েছে। তাতে বক্তারা হাওরের বিদ্যমান সমস্যা-সংকট তুলে ধরার পাশাপাশি উত্তরণের বিভিন্ন উপায় নিয়ে আলোকপাত করেছেন। হাওরের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

প্রাণবৈচিত্র্যে ভরপুর হলেও হাওরাঞ্চল উন্নয়নের মূল প্রবাহ থেকে অনেকটা বিচ্ছিন্ন। কৃষি ও মাছ ধরা এ অঞ্চলের সাত জেলার মানুষের প্রধান পেশা। বিকল্প জীবিকার সুযোগ কম। এ অঞ্চলে দারিদ্র্য হার জাতীয় গড়ের বেশি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সুযোগও অপ্রতুল। সমস্যা আছে যোগাযোগের ক্ষেত্রেও। বিস্তীর্ণ এলাকা বছরের বেশির ভাগ সময় পানিবন্দি থাকায় নৌকা ছাড়া চলার জো নেই। যথাযথ স্যানিটেশনের ক্ষেত্রে ব্যাপকতর ঘাটতি রয়ে গেছে। রয়েছে নিরাপদ পানির সংকটও। তবে এসব সমস্যা ছাপিয়ে প্রতিবেশগত বিপর্যয়ই হাওরাঞ্চলে বড় সংকট হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অব্যাহতভাবে নদীর পাড় ভাঙছে। পলি জমে বড় নদীগুলো নাব্যতা হারাচ্ছে। বাড়ছে আগাম ও আকস্মিক বন্যার প্রকোপ (ফ্লাশ ফ্লাড)। দেশের পুরো আবাদের ২০ শতাংশের উৎস হাওরাঞ্চল। হাওরে বোরোর ফসলহানি ঘটলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকিতে পড়ে, অস্থির হয় চালের বাজার। বন্যা নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর নতুন বাঁধ নির্মাণ বা পুরনো বাঁধের সংস্কার অত্যাবশ্যকীয় হলেও এ নিয়ে চলে নানা অনিয়ম। আগে ঠিকাদারি ভিত্তিতে হলেও অনিয়ম দূরে বাঁধ নির্মাণ-সংস্কারে পিআইসি প্রথা চালু হয়েছে। এতে কাজে স্বচ্ছতা এলেও পিআইসি গঠন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতার অবসান হয়নি। পিআইসি গঠন দেরি হলে বাঁধ নির্মাণও বিলম্বিত হয়। বোরো ফসল ঘরে তোলার প্রায় সময় হয়ে এলেও এবারো অনেক জায়গায় এখনো পিআইসি গঠন ও বাঁধ নির্মাণের কাজ শেষ হয়নি বলে খবর মিলছে। ফলে আগাম বন্যায় ফসল ডোবার পাশাপাশি জনজীবন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে। সুতরাং বিপর্যয় এড়াতে কাজটি বেগবান করার বিকল্প নেই। 

অনেকদিন উপেক্ষিত থাকলেও হাওরাঞ্চলকে এগিয়ে নিতে সরকার ২০১২ সালে জাতীয় হাওর উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এটা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। ২০ বছর মেয়াদি  এ মহাপরিকল্পনায় আগাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, মানুষের জীবনমান উন্নয়ন, শস্য উৎপাদন, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মত্স্য ও গবাদি পশুর উন্নয়ন, বনায়ন, পর্যটন, শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সড়ক ও নৌ-চলাচল উন্নয়নসহ ১৫৩টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত। আশঙ্কাজনক বিষয়, এ মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের গতি অনেক শ্লথ। তদুপরি প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার জায়গা থেকেও কিছু ত্রুটি রয়ে গেছে এতে। ভূপ্রকৃতিগত কারণে হাওরে যে স্থায়ী কাঠামো নির্মাণ সম্ভব নয় এবং বাঁধের নির্মাণ প্রকৌশলেও সমস্যা আছে, তা যথাযথভাবে আমলে নেয়া হয়নি। হাওরের ফসল যাতে সহজেই তোলা যায়, পরিবহন করা যায় এবং জলজ সম্পদের বিচরণ যাতে ব্যাহত না হয়, তার জন্য নিমজ্জনযোগ্য সড়ক খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে জোর দিলেও সড়কভিত্তিক যোগাযোগ নেটওয়ার্ক নির্মাণের ক্ষেত্রে এটা খুব একটা গুরুত্ব পাচ্ছে না। দেখা যাচ্ছে, সেখানে অনেক অপ্রয়োজনীয় বাঁধ আছে। আবার তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাঁধের প্রয়োজনের তুলনায় উচ্চতা কম হওয়ায় পানি উপচে জমি তলিয়ে যাচ্ছে। হাওরাঞ্চলের অনেকগুলো স্লুইস গেটই পুরনো। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সেগুলো তেমন একটা কাজে আসছে না। কোথাও কোথাও বক্স কালভার্ট নির্মাণের কারণে বন্যার পানি আটকে থাকছে। হাওরের সংকট নিরসনে উল্লিখিত সমস্যাগুলোর সুষ্ঠু সমাধান জরুরি। 

জলবায়ুজনিত অভিঘাতে জলবায়ু পরিবর্তনে অসময়ে বৃষ্টি, অতিবৃষ্টির সমস্যা আরো তীব্রতর হবে। এতে হাওরাঞ্চলে আগাম বন্যা ও জলাবদ্ধতার সংকট আরো বাড়াটা স্বাভাবিক। এ অবস্থায় প্রথমত জরুরি আর্লিং ওয়ার্নিং সিন্টেমের (ইডব্লিউএস) উন্নয়ন। আজকাল উন্নত দেশগুলোয় ডাটা ও মডেলের সমন্বয়ে বন্যার পূর্বাভাস ও  আবহাওয়ার গতিপ্রকৃতি নিরূপণ করে আগাম প্রস্তুতি নেয়া হয়। এক্ষেত্রে আমাদের সক্ষমতাও আগের চেয়ে বেড়েছে বটে, কিন্তু আরো অগ্রগতি দরকার। বন্যা নিয়ন্ত্রণে সনাতনী চিন্তা থেকে বেরিয়ে যুগোপযোগী ও টেকসই ব্যবস্থা নিতে হবে। বন্যা ব্যবস্থাপনায় আরো নজর দিতে হবে। অনেকেই বাঁধ নির্মাণের চেয়ে বন্যা ব্যবস্থাপনায় নদী খনন ও উন্নত খাল ব্যবস্থাপনার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। এটা বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। বণিক বার্তা আয়োজিত ওয়েবিনারে হাওরাঞ্চলের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাঁধের বিকল্প চিন্তা করা, ফসলের বহুমুখীকরণ, জলমহাল ইজারা প্রদানে প্রকৃত জেলেদের অগ্রাধিকার দেয়া, হাওর পঞ্জিকা অনুসরণ করে যথাসময়ে পিআইসি গঠন এবং সরকারিভাবে উজান ও ভাটিতে ব্যাপকভাবে খনন কার্যক্রম জোরদারের সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সুপারিশগুলোর ভিত্তিতে হাওরের উন্নয়নে সরকার যথাযথ ব্যবস্থা নেবে বলে প্রত্যাশা।