বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ,
বাংলাদেশ ব্যাংকের
সাবেক গভর্নর
এবং ইস্ট
ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির
প্রতিষ্ঠাতা উপাচার্য
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের
আজ ৮০তম
শুভ জন্মদিন।
এ মুহূর্তে
তাকে ফুলেল
শুভেচ্ছা জানাই।
তার সঙ্গে
আমার ব্যক্তিগত
পরিচয় কয়েক
যুগের এবং
তিনি আমার
অন্যতম পছন্দের
একজন উদ্যমী
মানুষ। অনেকটা
অফুরান তার
এ উদ্যম
ছাত্রজীবন থেকে
কর্মজীবন পর্যন্ত
বিস্তৃত বিভিন্ন
উৎসে—অর্থনীতি
অধ্যয়নে, শিক্ষকতায়,
প্রশাসনে এবং
বাঙালির স্বাধিকার
অর্জনের রাজনৈতিক
সংগ্রামে। এমনকি
সরকারি চাকরি
থেকে অবসর
নেয়ার পরও
উদ্যম থেমে
থাকেনি; অব্যাহতভাবে
প্রবাহিত সে
অনন্য এক
ধারায়। তবে
এখন তিনি
অতি ব্যস্ত
তার উদ্যোগে
প্রতিষ্ঠিত ইস্ট
ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির
সার্বিক উন্নতি
সাধনকল্পে এবং
তার সঙ্গে
যুক্ত সরকারি
আমন্ত্রণে কিংবা
সামাজিক দায়বদ্ধতায়
বিনা পারিশ্রমিকে
দায়িত্ব পালন।
কেউ বলেন,
বর্তমানে আন্তর্জাতিক
খ্যাতিসম্পন্ন এ
বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবক
ছিলেন তিনি।
মাত্র ২০
জন ছাত্র-ছাত্রী
নিয়ে ১৯৯৬
সালে যার
যাত্রা অনেকটা
ওই গানের
মতো—‘তীরহারা
এই ঢেউয়ের
সাগর পাড়ি
দেব রে
আমরা কজন
নবীন মাঝি
হাল ধরেছি
...’।
উদ্দীপ্ত মোহাম্মদ
ফরাসউদ্দিনের সঙ্গে
কথা বললে
মনে হবে
না যে
তিনি আশিতে
পা রেখেছেন।
কায়ক্লেশ নির্বিশেষে
কখনো ক্লাসে,
কখনো কনফারেন্সে।
১৯৪২ সালের
১৮ এপ্রিল
হবিগঞ্জের রতনপুর
গ্রামে এক
সম্ভ্রান্ত মুসলিম
পরিবারে তার
জন্ম এবং
শিশু ও
কৈশোর কাল
কেটেছিল মেঠো
পথ, ছনের
ঘর, কুপি
কিংবা হারিকেনের
আলোতে থাকা
গ্রামীণ পরিবেশে।
তার পথ
চলা সর্বত্র
সনাতনী কৃষি
কর্মকাণ্ড, হাওরের
হুতাশ, দারিদ্র্যের
দহনে নিপতিত
বিরাট জনগোষ্ঠী
মিলিয়ে চারপাশে
বিরাজিত এক
প্রতিকূল পরিবেশের
মধ্য দিয়ে।
সম্ভবত ষষ্ঠ
শ্রেণী থেকে
শহরের এক
স্কুলে ভর্তি
হন। একবার
ক্লাসের পেছনের
বেঞ্চে বসেছিলেন
কিন্তু ইংরেজি
গ্রামারের প্রশ্নের
উত্তরে বিমুগ্ধ
হেডমাস্টার তাকে
তাত্ক্ষণিক প্রথম
সারির বেঞ্চে
বসতে নির্দেশ
দেন। সেই
থেকে প্রথম
সারিতে তার
আসন একটার
পর একটা
অবস্থানে। সিলেট
এমসি কলেজ
হয়ে ঢাকায়
বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি
বিষয়ে পড়তে
আসার এ
দীর্ঘপথ পরিভ্রমণের
প্রতিটি পয়েন্টে
তিনি তার
মেধা বা
প্রতিভার জোরে
চিত্তাকর্ষক ফলাফল
ঘরে তুলতে
সক্ষম হয়েছিলেন।
দুই.
স্বভাবতই,
এমন একজন
মানুষের সংকীর্তন
সীমিত শব্দের
গাঁথুনিতে গেঁথে
ফেলার কাজটি
দুরূহ। যদিও
বহুমাত্রিক কর্মকাণ্ডে
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের
অসাধারণ সফলতার
কথা সুবিদিত
তবে দু-একটা
না বললেই
নয়।
ক’জনের
ভাগ্যে থাকে
কর্মজীবনের প্রায়
শুরুতেই এক
স্বপ্নদ্রষ্টার খুব
কাছে ঘেঁষার
সুযোগ পাওয়া?
তিনি সেই
অন্যতম একজন।
সমুদ্রের বিশালতা
বুঝতে গেলে
যেমনি সমুদ্রের
কাছাকাছি যেতে
হয়, তেমনি
জাতির পিতা
বঙ্গবন্ধু শেখ
মুজিবুর রহমানের
খুব কাছে
থেকে তিনি
বুঝেছেন মহান
ওই মানুষটির
মনের বিশালতা।
অতি কাছ
থেকে জানতে
পেরেছেন জাতির
জনকের স্বপ্নের
কথা। সম্ভবত,
বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত
সচিব হিসেবে
কাজ করা
ছিল ড.
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিনের
জীবনের এক
স্বর্ণসৌভাগ্য, জীবনপঞ্জিকায়
এক সোনালি
অধ্যায়। ঘনিষ্ঠভাবে
কাজ করেছেন
আর দেখেছেন
বলেই তিনি
জাতির জনকের
চিন্তা ও
চেতনার প্রতি
অতটা নৈষ্ঠিক
নিবেদিত হতে
পেরেছিলেন।
তিন.
মূলত
পিতৃ প্রভাবে
শিক্ষার প্রতি
তার আশৈশব
প্রবল অনুরাগ।
আর তাই
কর্মজীবনের শুরুটা
শিক্ষকতা হলেও
পরবর্তী সময়ে
পারিপার্শ্বিক পছন্দের
পরিপ্রেক্ষিতে প্রতিযোগিতামূলক
সিভিল সার্ভিস
পরীক্ষার মাধ্যমে
সিএসপি হয়ে
প্রশাসনে পদার্পণ
করতে হয়েছিল।
তবে যেখানেই
গিয়েছেন করোটিতে
বহন করেছেন
শিক্ষাসংক্রান্ত চিন্তাভাবনা।
কৃতিত্বপূর্ণ সেই
জীবনের পর
তিনি বাংলাদেশ
ব্যাংকের দক্ষ
গভর্নর হিসেবে
সুনামের অধিকারী
হলেন। এরই
মধ্যে সামর্থ্যের
মধ্যে এ
দেশে মানসম্পন্ন
উচ্চশিক্ষা বিস্তারের
লক্ষ্য নিয়ে
ইস্ট ওয়েস্ট
ইউনিভার্সিটির উন্মেষ
ঘটে তারই
হাত ধরে।
বর্তমানে ইস্ট
ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের
ছাত্রসংখ্যা আট
হাজারের অধিক,
শিক্ষক সংখ্যা
৫০০ প্রায়।
মহাখালীর অস্থায়ী
আবাস ছেড়ে
২০১২ সালেই
ইস্ট ওয়েস্ট
চলে আসে
আফতাবনগরের নিজস্ব
ক্যাম্পাসে। মোহাম্মদ
ফরাসউদ্দিন প্রথমে
ছিলেন এ
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা
উপাচার্য, পরে
দীর্ঘসময় ধরে
তিনি ছিলেন
বোর্ড অব
ট্রাস্টিজের প্রেসিডেন্ট,
বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের
প্রধান উপদেষ্টা।
নিজেকে জড়িয়ে
রেখেছেন প্রাণসম
ইস্ট ওয়েস্টের
সঙ্গে, যেমন
করে পিতা-মাতা
জড়িয়ে থাকেন
সন্তানের জীবনের
সঙ্গে।
আর প্রদেয়
পরিশ্রমের বিনিময়ে
তার যে
কোনো প্রাপ্তি
নেই সে
কথাটাও জানান
দেয়া দরকার।
বস্তুত ইস্ট
ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির
প্রতিষ্ঠাতাদের নিঃস্বার্থ
সমাজসেবা ও
নির্লোভ আচরণ
লক্ষ করার
মতো। তারা
কোনো ব্যাংকঋণ
ও ছাত্রদের
ওপর অতিরিক্ত
সারচার্জ ব্যতিরেকে
২০০ কোটি
টাকা বিনিয়োগে
গড়ে তুলেছেন
নিজস্ব সুপরিসর
ও শিক্ষাবান্ধব
ক্যাম্পাস। এর
ভেতর বিরাট
এক উঠোনে
দাঁড়িয়ে উন্মুক্ত
আকাশের নিচে
ছেলে-মেয়েরা
কখনো বৃষ্টিতে
ভিজে কিংবা
চাঁদের স্নিগ্ধ
আলোয় গান
ধরে, ‘আজ
জ্যোত্স্নারাতে সবাই
গেছে বনে,
বসন্তের এই
মাতাল সমীরণে।’
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন
তার রাজনৈতিক
দর্শনে এখনো
অটল, অবিচল
এবং আগেও
বলেছি, বঙ্গবন্ধুর
প্রতি তার
অগাধ আনুগত্য
ছিল অতুলনীয়।
১৯৭৫ সালের
১৫ আগস্ট
নির্মম হত্যাকাণ্ডের
পর অনেক
সমর্থক যখন
পালিয়ে ঘরে
ঢুকে যেতে
ব্যস্ত, তিনি
তখন ঘর
থেকে বেরিয়ে
অকুতোভয়ে ৩২
নম্বর অভিমুখী
হয়েছিলেন। এর
প্রমাণ একজন
বিশিষ্ট ব্যক্তির
চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ:
‘ফরাসউদ্দিন
সে সময়
বঙ্গবন্ধুর প্রাইভেট
সেক্রেটারি-২
ছিল। ওকে
ফোন করলাম।
ফরাস প্রথম
উৎসাহের সঙ্গে
জানাল, ‘একদল
লোক অভ্যুত্থান
করার চেষ্টা
করেছিল। জামিল
ভাই (কর্নেল
জামিল) ওদিকে
চলে গেছেন।
৩২ নম্বরের
দিকে। আমিও
ওখানে যাচ্ছি।
আমিও উৎসাহিত
হলাম। ভাবলাম,
অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা
ব্যর্থ হচ্ছে।
কিন্তু পরে
তো জানলাম,
জামিল সাহেবকে
ওখানেই সোবহানবাগ
মসজিদের কাছে
মেরে ফেলেছে।
ফরাসকে পিটিয়েছে,
তারপর বের
করে দিয়েছে।
আমি যখন
ফরাসের কাছে
পরে গেলাম,
বুঝলাম, খুব
ঝুঁকিপূর্ণভাবেই সে
বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে
গিয়েছিল। একজন
ব্যুরোক্র্যাট বা
আমলা হিসেবে
সে এতটা
সাহসের পরিচয়
দেবে, সেটা
ভাবিনি (তোয়াব
খান, আজকের
পত্রিকা ডট
কম, ১৯
আগস্ট ২০২১)।
আপনাকে আবারো
জন্মদিনের প্রাণঢালা
শুভেচ্ছা ড.
মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন;
আমরা আপনার
দীর্ঘ উৎপাদনশীল
জীবন কামনা
করি।
‘আগুনের
পরশমণি ছোঁয়াও
প্রাণে।
এ জীবন
পুণ্য করো
দহন-দানে।।
আব্দুল বায়েস: অর্থনীতির সাবেক অধ্যাপক উপাচার্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়










