বিশ্বব্যাপী ডানপন্থার উত্থানের প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল গত শতকের মাঝামাঝি থেকেই। বর্তমান সময়ে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে ডানপন্থার শক্ত অবস্থান পরিলক্ষিত হয়। আমেরিকা থেকে দক্ষিণ এশিয়া, যেখানেই ডানপন্থী সরকার ক্ষমতায় এসেছে—আশ্চর্যজনকভাবে তারা খুব মনোযোগের সঙ্গে একটি কাজ করেছে। সেটি হলো, যেসব বিশ্ববিদ্যালয় সরকারের দৃষ্টিকোণের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেনি তাদের কোণঠাসা করা। কোথাও এ ঘটনা ঘটেছে দ্রুত পদক্ষেপে সরাসরি, আবার কোথাও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ঘৃণা উৎপাদনের মাধ্যমে। ট্রাম্প আমেরিকার ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ফান্ডিং বন্ধ করে দিয়েছেন বিভিন্ন পর্যায়ে। অন্যদিকে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও জামিয়া ইসলামিয়া ছিল তাদের অন্যতম টার্গেট। নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এ প্রতিষ্ঠানগুলোর গায়ে জড়িয়ে দেয়া হয়েছে ‘সন্ত্রাসবাদী’, ‘রাষ্ট্রবিরোধী’সহ আরো অনেক তকমা। ইসরায়েল, তুরস্ক, চীন, ইরানসহ বিশ্বের যেকোনো দেশেই একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যাবে, বিভিন্ন নামে কিংবা উপায়ে বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি এক ধরনের ‘ঘৃণা উৎপাদন’ প্রক্রিয়া চলমান। এখন প্রশ্নটি দাঁড়ায়, এ বিশ্ববিদ্যালয় বিরুদ্ধতার কারণটি আসলে কী?
মোটামুটিভাবে ইতিহাস পর্যবেক্ষণে বোঝা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো জ্ঞান উৎপাদনে সংযুক্ত থাকার ফলে প্রতিরোধের (resistance) বৃহৎ একটি ক্ষেত্র হিসেবে কাজ করে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুব সহজেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে একটি ‘সামষ্টিক চেতনা’ (Collective Conscious) তৈরি করতে পারে। এর ফলে যে আন্দোলনের ভিত্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে তৈরি হয় তা যদি সফল নাও হয় তার চেতনাকে দমন করা কঠিন। এ আন্দোলনগুলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আপামর জনসাধারণের গ্রহণযোগ্যতাও লাভ করে৷ এ দাবির পক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি শক্তিশালী উদাহরণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের জাতীয় চেতনার অনেকখানিই উদ্ভূত হয়েছে এ জায়গা থেকে।
ইতিহাসে যে কয়টি বাঁক আমরা পেরিয়ে এসেছি, আমাদের সব আন্দোলন-সংগ্রামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল ধ্রুবক—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে যদি আমরা আলোকপাত করি, এটি খুব সহজেই অনুধাবন করা সম্ভব যে বুদ্ধিবৃত্তিক বা স্বাধীনতাকামী আন্দোলনগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ই অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বরাবরই সেই ভূমিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অগ্রগামী ছিল, এ বক্তব্যে অবশ্যই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের অবদান কম বা খাটো হয়ে যায় না। যেকোনো আন্দোলনেরই একটি কেন্দ্র বা হাবের প্রয়োজন হয়ে থাকে যেখান থেকে সাধারণত সমগ্র নির্দেশনা আসে।
এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামগুলোর ক্ষেত্রে ঘোষিত কিংবা অঘোষিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সেই ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। সেই ধারাবাহিকতায় অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো হয়ে উঠেছে একেকটি প্রতিরোধের ক্ষেত্র (site of resistance)। অর্থাৎ সামষ্টিক চেতনাগত জায়গায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবাইকে একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছে বরাবরই। এর একটি উদাহরণ আমরা জুলাই বিপ্লবে দেখেছি। ১৭ জুলাই যখন ক্যাম্পাসে পুলিশ ঢুকে ক্যাম্পাস খালি করার জন্য শিক্ষার্থীদের ওপর নিপীড়ন চালায়, তখনই ধারণা করেছিলাম— এটাই সম্ভবত শেষের শুরু। হয়েছেও আসলে তাই।
বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও বিশ্ববিদ্যালয় বিরুদ্ধতাকেন্দ্রিক ঘৃণা উৎপাদনের প্রবণতা লক্ষ করি। তবে এখানে প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। অন্যান্য জায়গায় রাষ্ট্র স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ ঘৃণা উৎপাদনে কাজ করছে তবে বাংলাদেশে অন্তত সেই বাস্তবতা নেই। এখানে এ ঘৃণা উৎপাদনের পেছনে বহুমাত্রিক সমীকরণ ও অনেক কর্তা (Actor) জড়িত। একটু গভীর পর্যবেক্ষণ করলেই তা অনুধাবন করতে পারার কথা। চব্বিশের আগস্ট-পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতি জনগণের আকাশচুম্বী প্রত্যাশা ছিল। বলা বাহুল্য, বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভূত নেতৃত্ব সেই প্রত্যাশার যথার্থ প্রতিদান দিতে পারেননি। অন্যদিকে আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে ছাত্রনেতাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড জনমনে তীব্র অসন্তোষ তৈরি করে। এ আগুনে ঘি ঢেলেছে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন মহল।
নিয়মতান্ত্রিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ঘৃণা উৎপাদনের প্রচেষ্টা করা হয়েছে কখনো লেখনী বা কখনো ভিডিওবার্তার মাধ্যমে। এর পেছনে সুপ্ত লক্ষ্যটি হলো, ছাত্রদের বিভাজিত করা গেলে নতুন করে কোনো আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলা তুলনামূলকভাবে কঠিন। খুব সুনিপুণভাবেই সেই কাজটি বর্তমান সময়ে করা হচ্ছে।
এর শুরুটা হয়েছে ‘পাবলিক বনাম প্রাইভেট’ বিভাজন দিয়ে। এরপর সেই বিভাজন বিভিন্ন নাম নিয়েছে। সাত কলেজ বনাম ঢাবির মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বকে উসকে দিয়েছেন বাইরের দেশের বিভিন্ন শিক্ষকও। এর ফলে মোটাদাগে বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে নিজস্ব আত্মশ্লাঘা-সংক্রান্ত বিভাজন তো এক রকম স্পষ্টই বলা চলে। গত তিন মাসের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ব্যক্তিগত উপলব্ধি হলো, দেশে বিভিন্ন পর্যায়ে ঢাবি বিদ্বেষ তৈরি হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে অনেকের চাপা ক্ষোভ আবার অনেক ক্ষেত্রেই দেশী-বিদেশী চক্রের প্রভাব। ঢাবির প্রতি এ ঘৃণার নির্মাণ চলতে থাকলে তা একটা পর্যায়ে সবাইকে ভোগাবে, কেননা সামষ্টিক আস্থার জায়গাটি তখন কাজ করবে না।
সবশেষে নিজেদের দায়ের জায়গায় দৃষ্টিপাত করতে চাই। বিশ্ববিদ্যালয়ের জায়গা থেকে আমাদের আরো বেশি সহনশীল মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠা প্রয়োজন। নিজেদের অতি গৌরবের মানসিকতা থেকে বের হয়ে না উঠতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয় ও ছাত্রসমাজ নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। তাছাড়া বক্তব্য প্রদানের ক্ষেত্রে, চলাফেরার ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকদের আরো দায়িত্বশীল হয়ে ওঠা প্রয়োজন, বিশেষ করে ছাত্রনেতাদের। সর্বোপরি, এ ঘৃণা নির্মাণ প্রক্রিয়াকে প্রতিহত করতে হবে নিজেদের ক্যারিশমা দিয়েই। অন্যথায় আমাদের বিভাজিত করার মাধ্যমেই একটি দীর্ঘমেয়াদি ষড়যন্ত্রের ছক পূর্ণতা পাবে।
মো. আসিফুর রহমান: নৃবিজ্ঞানী ও সমাজ গবেষক










