বাংলাদেশ চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে প্রবেশ করছে। দেশে ছোট-বড় অনেক শিল্প-কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো চামড়া, ইউরিয়া, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ ও টেক্সটাইল শিল্প। দেশের জিডিপিতে শিল্প খাতের অবদান ৩৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ (স্থিরমূল্যে ২০২২-২৩) এবং মোট শ্রমশক্তির ২০ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়োজিত। এর মধ্যে রেডিমেড গার্মেন্ট (আরএমজি) খাতে মোট শ্রমশক্তির ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ নিয়োজিত (অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২১) রয়েছে। বাংলাদেশ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পোশাক রফতানি করে থাকে। এর মধ্যে ইউরোপের আমদানীকৃত প্রতি তিনটি টি-শার্টের মধ্যে একটি, ডেনিম চারটির মধ্যে একটি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আমদানীকৃত প্রতি পাঁচটি ডেনিমের মধ্যে একটি বাংলাদেশের তৈরি। ইউরোপের পরিসংখ্যান দপ্তর, ইউরোস্টেটের তথ্যমতে অ্যাপারেল মার্কেটে চীনের পরই বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে এবং আধিপত্য প্রতিনিয়ত আরো বাড়ছে। বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, ২০২২ সালে মোট ৪ হাজার ২৬১ বিলিয়ন ডলার অর্থাৎ ৪ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা মূল্যের পোশাক রফতানি করেছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক ফ্রিডম হাউজের তথ্যমতে, বাংলাদেশ থেকে সস্তায় পোশাক পেয়ে ক্রেতারা যেমন খুশি, তেমনি বাংলাদেশও বর্ধিষ্ণু অর্থনীতিতে খুশি (টাইম ম্যাগাজিন)।

জার্মানভিত্তিক ডয়চে ভেলের সংবাদমাধ্যম ইউরোপের পরিসংখ্যান ইউরোস্টেট পরিসংখ্যানে জানায়, এক কিলোগ্রাম (কেজি) ওজনের কটন, ওভেন ফ্যাব্রিকস ডায়িং ও ওয়াশিং কাজে ১৫০-২০০ লিটার এবং এক কেজি ডেনিমে সর্বোচ্চ ২৫০ লিটার পানি ব্যবহৃত হয়। ফলে পোশাক প্রক্রিয়াজাত কারখানাগুলোয় সারা বছরে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিলিয়ন লিটার (বিএল) অর্থাৎ দেড় বিলিয়ন কিউবিক মিটার (বিসিএম) পানি ব্যবহৃত হচ্ছে। যা ঢাকা শহরে বসবাসরত প্রায় দুই কোটি মানুষের ৫-১০ মাস ব্যবহারের সমান। বিজিএমইএর মতে, কারখানার কার্যদক্ষতার ওপর পানি ব্যবহারের পরিমাণ নির্ভর করে। পোশাক প্রক্রিয়ায় ডায়িং ও ওয়াশিং কাজে কেমিক্যাল মিশ্রিত প্রচুর পানি ব্যবহার করা হয়। আর কাজ শেষে অপরিশোধিত পানি খাল-বিল ও নদীতে ফেলা হয়। ফলে একদিকে মাটি, বায়ু ও পরিবেশ দূষণ, অন্যদিকে জলজ ও ভূপৃষ্ঠের প্রাণী এবং ফসলের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এছাড়া পানির প্রবাহ ও ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যায়, যা দেশের পরিবেশ ও প্রতিবেশকে এ খুশির মূল্য হাড়ে হাড়ে দিতে হচ্ছে। কারখানায় ব্যবহৃত পানির জোগান ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ হতে মেটানো হয়ে থাকে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদ আরএমজি যাতে অপরিকল্পিত ব্যবহারে পরিবেশ ও প্রতিবেশের সর্বনাশ ডেকে আনছে।

দেশে পরিবেশ ও প্রতিবেশ দূষণের বড় কারণ শিল্প-কারখানা। প্রতিটি শিল্প-কারখানার বর্জ্যে পরিবেশ, মাটি, বায়ু ও পানি দূষণ থেকে রক্ষার নিমিত্তে কারখানায় ইটিপি (Effluent Treatment Plant-ETP) ও ডব্লিউটিপি (Water Effluent Treatment Plant-WTP) স্থাপন করা একান্ত প্রয়োজন। যাতে বর্জ্য পুনর্নবীকরণের মাধ্যমে কারখানা ও গৃহস্থালিতে ব্যবহার হবে। কিন্তু এখনো দেশের অধিকাংশ শিল্প-কারখানায় ইটিপি ও ডব্লিউটিপি স্থাপন করা হয়নি। ফলে দূষিত বর্জ্য সরাসরি খাল-নালা, নদীতে ফেলা হচ্ছে। এতে জলজ প্রাণী ও পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অন্যদিকে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণের এক ভয়াবহ তথ্য তুলে ধরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মঞ্জুর আহমেদ চৌধুরী জানান, কিছু শিল্প-কারখানার নিকটবর্তী খাল-নালা ও নদ-নদী না থাকায় ডায়িং ও ওয়াশিং কাজের বর্জ্য পানি লোকচক্ষুর অন্তরালে ভূগর্ভে ইঞ্জেক্ট করা হচ্ছে (২৫.১০.২০২৩ চ্যানেল আই, টকশো)। ফলে শিল্প এলাকাসহ সারা দেশের ভূগর্ভস্থ পানিসম্পদকে মারাত্মকভাবে দূষিত করছে, যা পুনরুদ্ধার ও উন্নয়ন করা সম্ভব নয়। এক গবেষণামতে, দেশে পরিবেশ ও প্রতিবেশ দূষণে মোট বায়ুদূষণের ৫০ শতাংশের অধিক, ভূ-উপরিস্থ ও ভূগর্ভস্থ পানির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং শব্দ দূষণের ৩০ শতাংশের অধিক শিল্প-কারখানার মাধ্যমে সংঘটিত হয়। এর মধ্যে টেক্সটাইল ও ডায়িংয়ে পরিবেশ দূষণের পরিমাণ ১৭-২০ শতাংশ । 

ডয়চে ভেলের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে জানা যায়, বর্তমানে ঢাকা শহরের চারপাশে পোশাক তৈরির কারখানা অনেক বেশি। ডয়চে ভেলে ঢাকা জেলার সাভার, গাজীপুরের সদর, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ ও ময়মনসিংহের ভালুকায় ভূগর্ভস্থ স্থিতিশীল পানির স্তর বিশ্লেষণ করে। ওই এলাকাগুলো ডয়চে ভেলের বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এক ভয়াবহ চিত্র। যেসব এলাকায় পোশাক শিল্পে ডায়িং ও ওয়াশিং মেশিনের কাজ বেশি, সেখানেই পানির স্তর দ্রুত নেমে যাচ্ছে। পোশাক শিল্প এলাকাগুলোয় ২০১১ হতে ২০২১ সাল পর্যন্ত (১০ বছর) স্থিতিশীল পানির স্তর প্রায় দ্বিগুণেরও বেশি নেমে গেছে। গাজীপুরের সদরে ২০১১ সালে যেখানে স্থিতিশীল পানির স্তর ২৬ মিটার ছিল, তা ২০২১ সালে এসে একান্ন মিটারে (৯২ শতাংশ) নেমেছে। আর সাভারে প্রায় ১৩৩ শতাংশে নেমেছে। ফলে বাড়ছে পোশাক উৎপাদন, নামছে পানির স্তর। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণার বিষয়টি যাচাইয়ের নিমিত্তে একইভাবে কৃষিপ্রধান অঞ্চল ঢাকার ধামরাই, গাজীপুরের কাপাসিয়া ও কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া স্থিতিশীল পানির স্তরের উপাত্ত গ্রহণ করে। যাচাইয়ের পর দেখতে পায়, গত ১০ বছরে ধামরাই ও কাপাসিয়া স্থিতিশীল পানির স্তর মাত্র এক মিটার নেমেছে, অন্যদিকে পাকুন্দিয়া পানির স্তর ওপরের দিকে উঠেছে। এতে প্রমাণিত, পোশাক প্রক্রিয়াজাত এলাকাগুলোয় সারা বছর প্রচুর ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করা হচ্ছে, যা মোটেই পুনর্ভরণ হচ্ছে না। আবার একই সময়ের বিজিএমইএ সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ১০ বছরে ঢাকার আশপাশে অনেক পোশাক শিল্প-কারখানা স্থাপন হয়েছে। অন্যদিকে সাভার, গাজীপুর সদর, রূপগঞ্জ ও ভালুকায় গত ১০ বছরে ওভেন ফ্যাব্রিকস ও ডায়িং ৫০ শতাংশ ও নিট ও ইয়ার্ন ডায়িংয়ের উৎপাদন প্রায় চারগুণ বেড়েছে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী (বিএডিসি) মোহাম্মদ ওয়াহিদুল ইসলাম জানান, সাভারের বিরুলিয়ায় নব্বইয়ের দশকে স্থিতিশীল পানির স্তর ২৫-৩০ ফুট ছিল। তখন ডিপসেট/ভেরি ডিপসেট অগভীর নলকূপে সেচকাজ পরিচালিত হতো। ২০০০ সাল নাগাদ স্থিতিশীল পানির স্তর আরো নেমে যাওয়ায় সেচকাজে বিঘ্নতা দেখা দেয়। ২০০৮ সালের দিকে স্থিতিশীল পানির স্তর ৫০ ফুটের বেশি নেমে যাওয়ায় কৃষকগ্রুপ বিএডিসির গভীর নলকূপ স্থাপনপূর্বক সেচকাজ পরিচালনা করে আসছে। বর্তমানে স্থিতিশীল পানির স্তর প্রায় ৯০ ফুটে নেমে এসেছে। যার একমাত্র কারণ ব্যাপকভাবে পোশাক শিল্প-কারখানা স্থাপন। পোশাক শিল্পে প্রতিনিয়ত একই হারে পানি উত্তোলন হচ্ছে। এতে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর সেই হারে পুনর্ভরণ হচ্ছে না। ফলে ভবিষ্যতে এলাকাগুলোয় মরুময়তা দেখা দিতে পারে, যা জীববৈচিত্র্যের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ। অনেকের ধারণা, সেচকাজে বেশি পানি উত্তোলন হওয়ায় এমনটা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে সেচকাজে বছরে মাত্র তিন মাস পানি উত্তোলন হয়, যা বাকি নয় মাস বৃষ্টিপাত, বন্যা ও অন্যান্য উৎস থেকে নিঃসৃত পানি ভূগর্ভে পুনর্ভরণ হচ্ছে।

ম্যানচেস্টার মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্যের গবেষক ড. প্যাটসি পেরি জানান, বর্তমানে বাংলাদেশ পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত পানির মূল্য বিবেচনায় নিচ্ছে না। তাই সস্তায় ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন করে পোশাক শিল্পে অপরিকল্পিত ব্যবহারে ইউরোপ ও আমেরিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে স্বপ্নমূল্যে পণ্য বিক্রি করছে। প্রতিনিয়ত যেমন বাড়ছে পোশাক উৎপাদন, তেমনি পানির ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্থিতিশীল স্তর নেমে যাচ্ছে, যা উদ্বেগের কারণ। বৈশ্বিক পোশাক তৈরির কাজে যে পরিমাণ প্রাকৃতিক পানিসম্পদের অপচয় হচ্ছে, তাতে আগামীতে পানির সংকট দেখা দিতে পারে, যা মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। শুধু পোশাক শিল্প-কারখানা নয়, প্রতিটি কারখানায় মালামাল প্রক্রিয়াজাতে ব্যাপক পানি ব্যবহার হয়। বৈশ্বিকভাবে বিক্রেতা ও ক্রেতাকে বিকল্প পন্থায় প্রক্রিয়াজাতের ব্যবস্থা খুঁজে বের করা সময়ের দাবি। তাই আধুনিক লাগসই ও টেকসই প্রযুক্তিতে পরিবেশ সংরক্ষণের মূলমন্ত্র 3R (Reduce, Reuse, Recycle) প্রযুক্তি গ্রহণ করতে হবে। এছাড়া আধুনিক প্রযুক্তিতে স্বল্প পানিতে অর্থাৎ এক কেজি পানিতে এক কেজি এবং ওজন মেশিনে অক্সিজেন প্রবাহিত করে পানিবিহীন পোশাক ডায়িং ও ওয়াশিং সম্পন্ন করা যায়। আধুনিক লাগসই প্রযুক্তি স্থাপনে পোশাক শিল্পে যে অতিরিক্ত অর্থ বিনিয়োগ হবে, তাতে পোশাকের মূল্য কিছুটা বৃদ্ধি পেতে পারে। অতিরিক্ত মূল্যের দিক চিন্তা করে ইউরোপ ও আমেরিকা মহাদেশ বিকল্প পথে পোশাক আমদানির চেষ্টা করবে। এতে দেশ আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ বিপর্যয়ের বিষয়টি চিন্তা করে বৈশ্বিকভাবে অগ্রসর হতে হবে। তাই বৈশ্বিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে রফতানিকারক ও আমদানিকারকের মধ্যে জরুরি সমঝোতার পথ খুঁজে বের করতে হবে। পোশাক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করে মূল্য নাগালের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।

প্রাকৃতিক পানি দেশ ও জনগণের সম্পদ। আর এ পানিসম্পদ ফুরিয়ে গেলে, জনগণকে তার খেসারত দিতে হবে। তাই সব ধরনের শিল্প-কারখানায় বর্জ্য বিশোধনে ইটিপি ও নিরাপদ পানির ডব্লিউটিপি স্থাপন করতে হবে। এছাড়া ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন ওয়াটার জোনিং ম্যাপ অনুসরণ করতে হবে। অন্যদিকে শিল্প-কারখানায় পানি উত্তোলনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা ও পরিবেশ অধিদপ্তর দ্রুত বাস্তবমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করে দেশ ও জনগণকে মারাত্মক ক্ষতি থেকে রক্ষা করতে পারে।

মো. জিয়াউল হক: সাবেক সদস্য পরিচালক, (ক্ষুদ্র সেচ) বিএডিসি