ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। একই সঙ্গে ইরানের শীর্ষ ৪৮ জন সামরিক ও বেসামরিক নেতা নিহত হয়েছেন বলেও বিভিন্ন সূত্রের খবর। খামেনির মৃত্যুর পর আপাতত তার উত্তরসূরি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন দেশটির আরেক ধর্মীয় নেতা আলিরেজা আরাফি। পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ী নেতৃত্ব কাঠামো কার্যকর থাকবে। যেখানে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং প্রধান বিচারপতি গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেইয়ের সঙ্গে একটি অস্থায়ী লিডারশিপ কাউন্সিলে দায়িত্ব পালন করবেন আরাফি।
ইরানের ভেতরে খামেনি শুধু রাষ্ট্রপ্রধান ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিপ্লবের রক্ষক, প্রতিরোধের প্রতীক। তার দীর্ঘ শাসনে গড়ে ওঠা প্রক্সিনির্ভর কৌশল, প্রতিরোধের অর্থনীতি ও পারমাণবিক কৌশল—সব মিলিয়ে যে শক্তির স্থাপত্য তৈরি হয়েছিল, তার স্থপতির অনুপস্থিতিতেই এখন আরো কঠোর হয়ে উঠেছে তেহরানের জবাব। কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে উপসাগরীয় আকাশ ভরে উঠেছে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনে। মার্কিন ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের লক্ষ্য করে মুহুর্মুহু পাল্টা আঘাত চালাচ্ছে ইরান। তাদের শিকার হয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, বাহরাইন, কুয়েত, জর্ডান, ওমান, সৌদি আরব। হরমুজ প্রণালি থেকে আরব উপসাগরের উপকূল পর্যন্ত পুরো অঞ্চল এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের পথে। এমনকি ইউরোপের দেশ সাইপ্রাসকে লক্ষ্য বানিয়েছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র। থেমে নেই যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলও। গতকাল দিনভর দফায় দফায় ইরানের বিভিন্ন শহরে আঘাত হেনেছে তেল আবিব। এর মধ্যে গতকাল রাতে শক্তিশালী কয়েকটি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে দেশটির পরমাণু ও সামরিক স্থাপনাগুলোও। এরই মধ্যে ইসরায়েলে ইরানি হামলায় নয়জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযানে তিন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন বলেও স্বীকার করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনি যখন ইরানের হাল ধরেন, তখন থেকেই তিনি দেশটিকে এক কঠোর প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং আঞ্চলিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছিলেন। খামেনির এ আকস্মিক মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে অনিশ্চয়তা ও নতুন সমীকরণের জন্ম দেবে বলে ধারণা বিশ্লেষকদের। খামেনিকে নিয়ে ইরানের ভেতরে যেমন ভক্তি ছিল, তেমনি ছিল বিতর্কও। সমর্থকদের চোখে তিনি ছিলেন নির্ভীক, অবিচল। সমালোচকদের চোখে তিনি ছিলেন ভীতিপ্রদ স্বৈরশাসক—যিনি ভিন্নমত দমন করেছেন এবং দেশকে পশ্চিমা বিশ্বের কাছ থেকে দূরে রেখেছেন। ইসলামী প্রজাতন্ত্রের তিনি ছিলেন দ্বিতীয় নেতা এবং সবচেয়ে দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকা সর্বোচ্চ নেতা।
খামেনির বেড়ে ওঠা ছিল অত্যন্ত সাধারণ। ১৯৩৯ সালে মাশহাদের এক ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেয়া খামেনির শিক্ষা শুরু হয়েছিল মাত্র চার বছর বয়সে। দারিদ্র্য ও সরলতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা খামেনি মাত্র চার বছর বয়সেই কোরআন শিক্ষা শুরু করেন এবং পরবর্তী জীবনে নাজাফ ও কোমের মতো মর্যাদাপূর্ণ ধর্মীয় কেন্দ্রে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ খোমেনির সান্নিধ্য লাভ করেন। বিপ্লবের আগে খামেনির জীবন ছিল সংগ্রামের। পাহলভি রাজবংশের স্বৈরশাসন এবং পশ্চিমা প্রভাবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার কারণে তাকে বারবার কারাবরণ ও নির্বাসনের শিকার হতে হয়েছে। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর তিনি নতুন সরকারের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ হিসেবে আবির্ভূত হন।
১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর খামেনিকে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মনোনীত করা হয়। খোমেনি যেখানে ইসলামী বিপ্লবের আদর্শিক ভিত্তি গড়েছিলেন, খামেনি সেখানে ইরানকে এক অভেদ্য সামরিক ও কৌশলগত দুর্গে পরিণত করেন। তার শাসনের মূলমন্ত্রই ছিল পশ্চিমাদের প্রতি গভীর সন্দেহ ও অনাস্থা।
৩৫ বছরের শাসনামলে তিনি ইরানের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজান এবং ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’কে (আইআরজিসি) একটি আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি কেবল ইরানের সীমান্ত রক্ষায় মনোযোগ দেননি, বরং দেশের বাইরেও প্রভাব বিস্তারের জন্য একটি বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তার সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী প্রকল্প ছিল ‘এক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’। লেবাননের হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনের হামাস, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে নিয়ে গঠিত একটি ছায়া সামরিক বলয়। এ নেটওয়ার্কের মূল স্থপতি ছিলেন জেনারেল কাসেম সোলাইমানি, যাকে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্র হত্যা করে।
তবে খামেনির এ আপসহীন নীতি অভ্যন্তরীণভাবে ব্যাপক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিল। ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট, ২০১৯ সালের তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে বিক্ষোভ এবং ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনগুলো তার প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অর্থনৈতিক সংকটের কারণে সৃষ্ট দেশব্যাপী হাহাকার তার ‘প্রতিরোধের অর্থনীতি’র কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।
জেনারেল কাসেম সোলাইমানির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে শুরু করে। হামাস ও হিজবুল্লাহর দুর্বলতা, সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন এবং সবশেষে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় ইসরায়েলি হামলা—খামেনির দীর্ঘদিনের সাজানো ছক ভেঙে পড়তে শুরু করে। মূলত ২০২০ সালে কাসেম সোলাইমানির হত্যাকাণ্ড দিয়ে যে ধারাবাহিক অস্থিতিশীলতা শুরু হয়েছিল, গত শনিবারের বিমান হামলায় খামেনির মৃত্যু যেন সেই দীর্ঘ সংঘাতের এক চূড়ান্ত পরিণতি।
বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে কীভাবে ঠিক একযোগে হামলায় এতজন শীর্ষ নেতা নিহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বলছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য ছিল যে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব একত্র হয়েছেন। এর পরই শক্তিশীল যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। যে হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, চিফ অব স্টাফ, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও ইরানের বিপ্লবী গার্ডের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দীর্ঘ কয়েক মাস ধরে সিআইএ অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে খামেনির গতিবিধি, দৈনন্দিন রুটিন এবং অবস্থানের ওপর নজরদারি চালিয়ে আসছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, গত বছরের ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানি নেতৃত্বের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি করার সক্ষমতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পায়। সেই অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েই সিআইএ নিশ্চিত হতে পেরেছিল যে শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি সুরক্ষিত সরকারি কম্পাউন্ডে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের একটি বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবং সেখানে স্বয়ং সর্বোচ্চ নেতা উপস্থিত থাকবেন। গোয়েন্দা তথ্যের এ ‘হাই ফিডেলিটি’ বা উচ্চ নির্ভুলতা নিশ্চিত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল তাদের হামলার পূর্বনির্ধারিত সময় পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়। মূলত রাতের অন্ধকারে হামলা চালানোর পরিকল্পনা থাকলেও খামেনি ও শীর্ষ নেতাদের একসঙ্গে পাওয়ার এ সুযোগ হাতছাড়া করতে চায়নি তারা। শনিবার সকাল ৬টার দিকে ইসরায়েলের বিমানঘাঁটি থেকে দূরপাল্লার এবং নির্ভুল লক্ষ্যভেদী মারণাস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধবিমানগুলো উড্ডয়ন করে। ঠিক ২ ঘণ্টা ৫ মিনিট পর তেহরানের স্থানীয় সময় সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে ক্ষেপণাস্ত্রগুলো সরাসরি ওই কম্পাউন্ডে আঘাত হানে। ওই সময় খামেনি একটি ভবনে এবং অন্য শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তারা পার্শ্ববর্তী আরেকটি ভবনে অবস্থান করছিলেন। এ অভিযানে ইরানের সামরিক ও গোয়েন্দা কাঠামোর শীর্ষ পর্যায় প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে যায়।
ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, এ অপারেশনে ৩০-৪০ জন ঊর্ধ্বতন ইরানি কর্মকর্তা ও সামরিক কমান্ডার নিহত হয়েছেন। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরানজুড়ে চলমান মার্কিন-ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে এ পর্যন্ত খামেনিসহ ৪৮ জন শীর্ষ ইরানি নেতা নিহত হয়েছেন।
দ্য আটলান্টিক ম্যাগাজিনের উদ্ধৃতি দিয়ে আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প দাবি করেছেন ইরানের নতুন নেতৃত্ব তার প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করতে ইচ্ছুক এবং তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করছেন। ট্রাম্প বলেন, ‘তারা আলোচনা করতে চায় এবং আমি আলোচনায় রাজি হয়েছি, তাই আমি তাদের সঙ্গে কথা বলব।’ তবে এ আলোচনা ঠিক কবে নাগাদ শুরু হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। এমনকি ইরানও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।
এদিকে তেহরানে হামলার তীব্রতা আরো বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু। তেল আবিবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ছাদ থেকে দেয়া এক ভিডিও বিবৃতিতে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আমাদের বাহিনী বর্তমানে ক্রমবর্ধমান তীব্রতার সঙ্গে তেহরানের হৃৎপিণ্ডে আঘাত হানছে। আগামী দিনগুলোতে এ হামলার মাত্রা আরো বাড়বে।’
গতকাল সকাল থেকে ইরানে কতজন নিহত হয়েছেন এ নিয়ে পরস্পরবিরোধী তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় প্রেস টিভি ইরানের রেড ক্রিসেন্টের বরাতে জানিয়েছে, হামলায় ২০১ জন নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে ইসরায়েলে গত দুই দিনে হামলায় অন্তত ১০ জন মারা গেছেন। ইরাকে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলি হামলায় ইরান-সমর্থিত পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) এক সদর দপ্তর লক্ষ্যবস্তু হলে তাদের চার সদস্য নিহত হন বলে মিলিশিয়ার মিডিয়া ডাইরেক্টরেট টেলিগ্রামে জানিয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতে ইরানের পাল্টা হামলায় তিনজন নিহত হয়েছেন বলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। কুয়েতে ইরানি হামলায় একজন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে তিনজন মার্কিন সেনাসদস্য ‘অ্যাকশনে’ নিহত হয়েছেন, তবে কখন ও কোথায়—সে বিস্তারিত তারা জানায়নি।










