পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র একটি ১৫ দফার শান্তি প্রস্তাব পাঠিয়েছে তেহরানে। তবে সে প্রস্তাবকে ‘অযৌক্তিক’ উল্লেখ করে যুদ্ধ বন্ধে পাল্টা পাঁচটি শর্ত দিয়েছে ইরান। খবর রয়টার্স, বিবিসি ও আল জাজিরা।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের (হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) স্পিকার মাইক জনসন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ এখন শেষের পথে। ওয়াশিংটন ডিসিতে গতকাল মার্কিন গণমাধ্যমকে হাউজ স্পিকার এ কথা বলেন।
মাইক জনসন বলেন, ‘আমি মনে করি, আমরা “অপারেশন এপিক ফিউরি” গুটিয়ে আনছি। আমার ধারণা, এটি দ্রুতই শেষ হবে এবং এটি নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ীই হচ্ছে।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক বক্তব্যের পর হাউজ স্পিকার জনসনের এ মন্তব্য সামনে এসেছে। ট্রাম্প বলেছিলেন, তার প্রশাসন ইরানের ‘সঠিক ব্যক্তিদের’ সঙ্গে কথা বলছে, যারা একটি চুক্তি করতে আগ্রহী। তবে ইরান এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পাঠানো একটি শান্তি পরিকল্পনাকে ‘বাড়াবাড়ি’ আখ্যা দিয়ে তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ দফার প্রস্তাবে মূলত ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক প্রভাব খর্ব করার ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে দিয়েছে যে নাতাঞ্জ, ইসফাহান ও ফোরদোর মতো গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো স্থায়ীভাবে বন্ধ এবং ধ্বংস করতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ইরানের হাতে থাকা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের সব মজুদ আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করার শর্তও দেয়া হয়েছে। পেন্টাগন ও হোয়াইট হাউজের এ পরিকল্পনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির লাগাম টেনে ধরার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর অর্থায়ন বন্ধের বিষয়টিও মূল ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। চুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালিকে ‘মুক্ত আন্তর্জাতিক জলপথ’ হিসেবে ঘোষণা করতে হবে।
বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে সব অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে। সেই সঙ্গে বুশেহর কেন্দ্রে বেসামরিক পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে কারিগরি সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ১৫ দফা প্রস্তাব হাতে পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছে তেহরান। তবে ইরান একে ‘বাড়াবাড়ি ও অযৌক্তিক’ বলে মন্তব্য করেছে। সূত্রটি জানিয়েছে, কিছু সংবাদমাধ্যমে যা প্রচার করা হচ্ছে, এ প্রস্তাবের মূল বিষয়বস্তুর সঙ্গে তার মিল নেই। প্রস্তাবটি উপস্থাপনার দিক থেকে ‘প্রতারণামূলক ও বিভ্রান্তিকর’ আখ্যা দিয়ে ওই সূত্রটি আরো বলেছে, ‘এমনকি এটি কাগজে-কলমেও ভালো প্রস্তাব নয়।’
সূত্রটি বলেছে, অপর পক্ষ, যাদের বিরুদ্ধে শর্ত পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে; ইরান তাদের মতো নয়। ইরান কী চায় আর কোন বিষয়গুলো দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করবে, সে সম্পর্কে নিজেদের স্পষ্ট ধারণা রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো পরোক্ষ আলোচনা হয়নি জানিয়ে ইরানের সর্বোচ্চ মহল থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছে, তারা কোনো চাপের মুখে নতি স্বীকার করবে না। পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরান পাঁচটি মৌলিক শর্ত ছুড়ে দিয়েছে, যার প্রথমটিই হলো ভবিষ্যতে ইরানের ওপর আর কোনো হামলা হবে না—এমন আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করা। তেহরান দাবি করেছে, চলমান যুদ্ধে তাদের অবকাঠামোর যে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে পূর্ণ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে সমস্ত ঘাঁটি প্রত্যাহার ও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক সার্বভৌমত্ব ও আইনি কর্তৃত্ব স্বীকার করে নেয়ার শর্তও দেয়া হয়েছে।
ইরানের এসব শর্তকে দেশটির সরকারের একটি কঠোর দরকষাকষির মনোভাবের ‘প্রতিফলন’ বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, সংঘাত নিরসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকার মধ্যেই ইরান ‘বড় ধরনের ছাড়’ চাইছে। এ ব্যাপারে আরো বিস্তারিত জানতে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল রয়টার্স। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তা তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য জানাতে রাজি হননি।
যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবটি ইরানের কাছে পৌঁছে দিয়েছে পাকিস্তান। আল জাজিরাকে দেশটির জ্যেষ্ঠ কিছু সূত্র যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাব ইরানের কাছে পৌঁছে দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। পাকিস্তানেই হতে পারে যুদ্ধ বন্ধের আলোচনা। তবে এ প্রক্রিয়ায় তুরস্কও ভূমিকা রাখছে।
মার্কিন প্রশাসনের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাতে সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, চলতি সপ্তাহের শেষদিকে পাকিস্তানে একটি বৈঠকের আয়োজন করতে কাজ করছেন ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা। বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ও ট্রাম্প প্রশাসনের আরো কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার পাকিস্তানে যাওয়ার কথা রয়েছে। তবে কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, এ সফরের সময়সূচি, স্থান এবং কারা উপস্থিত থাকবেন, তাতে পরিবর্তন আসতে পারে। পাকিস্তানে সফরের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা উদ্বেগ থাকায় তুরস্ককেও আলোচনার সম্ভাব্য স্থান হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তবে চলমান সংঘাতের অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের শান্তি আলোচনার প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েলে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। যেকোনো ধরনের চুক্তিতে ট্রাম্প ইসরায়েলের স্বার্থকে সবসময় গুরুত্ব দেবেন বলে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু জানলেও সম্ভাব্য চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে তেল আবিবের নীতিনির্ধারকদের মাঝে দুশ্চিন্তা বাড়ছে।
রামাল্লাহ থেকে আল জাজিরার প্রতিনিধি নিদা ইব্রাহিম বলেছেন, রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ইসরায়েল মনে করেছে, ট্রাম্প একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর বিষয়ে আগ্রহী। তবে ইসরায়েলের অন্যতম প্রধান উদ্বেগের বিষয় ইরানের ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ৪৫০ কেজি ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ নিয়ে। এসব কি তৃতীয় কোনো দেশের হাতে তুলে দেয়া হবে নাকি আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হবে? আরেকটি অমীমাংসিত ইস্যু হলো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি। ইরান আর কখনো নতুন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করে ইসরায়েলকে হুমকি দেবে না এমন নিশ্চয়তা চাইছে ইসরায়েল। তেল আবিবের প্রত্যাশা, কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর আগেই ইরানে আর কিছু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে তারা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে বাদ দিয়ে একটি নতুন আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও সামরিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে তেহরান। ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্সের মুখপাত্র ইব্রাহিম জোলফাঘারি এক ভিডিও বার্তায় বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক হামলা একটি ‘নতুন পর্যায়’ তৈরি করেছে, যা মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিক্রিয়ার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অবশ্যই ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আঞ্চলিক ঐক্য জরুরি।’
তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে বহিরাগত শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা আনতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই ধর্মীয় ও আঞ্চলিক বন্ধনের ভিত্তিতে একটি যৌথ নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা প্রয়োজন।
এদিকে, যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাবনা ওয়াল স্ট্রিটের শেয়ারবাজারকে আবারো ওপরের দিকে ঠেলে দিয়েছে। যার ফলে জ্বালানি তেলের বড় দরপতন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ৬ দশমিক ৬ শতাংশ কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৭ দশমিক ৫৬ ডলারে নেমেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে লেনদেন হওয়া তেলের দাম ৫ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি দাঁড়িয়েছে ৮৭ দশমিক ২০ ডলারে।
এছাড়া, ইরানের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করেছে থাইল্যান্ডের তেলবাহী একটি ট্যাংকার। ট্যাংকারটির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ব্যাংচাক করপোরেশন এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তবে পাকিস্তানের একটি তেলবাহী জাহাজ আটক করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট করা এক বার্তায় আইআরজিসি জানায়, ‘সেলেন’ নামের পাকিস্তানের পতাকাবাহী কার্গো জাহাজটি সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজাহ থেকে করাচির দিকে যাচ্ছিল; কিন্তু হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের আগে ইরানের সামুদ্রিক জাহাজ চলাচল কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নেয়ায় জাহাজটিকে আটকানো হয়।
অন্যদিকে, ইরানের তেল ও পরিশোধিত জ্বালানির ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা স্থগিতের পর তেহরান থেকে প্রথম এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) কার্গো কিনেছে ভারত। ২০১৯ সালে পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞার চাপে ইরান থেকে জ্বালানি কেনা বন্ধ করে দিয়েছিল ভারত। এতদিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ইরানি এলপিজি বহনকারী ট্যাংকার ‘অরোরা’ খুব শিগগিরই ভারতের পশ্চিম উপকূলীয় মেঙ্গালুরু বন্দরে পৌঁছাবে বলে আশা করা হচ্ছে।










