প্রথমে নিখোঁজ হন চীনের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং। এর কিছুদিন পর তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এরপর নিখোঁজ হন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল লি শাংফু। দেশটির ঊর্ধ্বতন মহলে উত্থান-পতনের সর্বশেষ ঘটনা এটি। এসব ঘটনার রেশ স্বভাবতই চীনের বাইরে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বেশ জোরেশোরে আলোচিত হচ্ছে। উদ্বেগ বাড়ছে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের কূটনৈতিক অবস্থান নিয়েও। খবর রয়টার্স।

কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশটির অভ্যন্তরীণ অবস্থা সম্পর্কে ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতির দেশটির ওপর অন্য দেশগুলোর আস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। 

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি শাংফুকে সর্বশেষ গত আগস্টের শেষদিকে প্রকাশ্যে দেখা গিয়েছিল। বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত তৃতীয় চীন-আফ্রিকা শান্তি ও নিরাপত্তা ফোরামেও বক্তব্য রেখেছিলেন তিনি। তবে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ভিয়েতনাম ও সিঙ্গাপুরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে চীনের বৈঠকেও তাকে দেখা যায়নি।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিন গ্যাং গত জুলাইয়ে নিখোঁজ হন। একই মাসে সামরিক বাহিনীর অভিজাত রকেট ফোর্সের নেতৃত্বে পরিবর্তন আনা হয়। এ ফোর্স চীনের পারমাণবিক অস্ত্রাগার তদারক করে।

প্রভাবশালী দুই চীনা মন্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় এমনিতেই উদ্বিগ্ন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিখোঁজের পর বেইজিংয়ের নীতির পরিবর্তন নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। এর মধ্যেই সদ্য সমাপ্ত জি২০ সম্মেলনে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। তার ওই সিদ্ধান্ত হতাশ করে বিশ্বনেতাদের। কেননা এক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা শি এই প্রথম বিশ্বনেতাদের বড় পরিসরের এমন একটি সম্মেলন এড়িয়ে গেছেন।

কূটনীতিক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যমান শাসন ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান অনিশ্চয়তার মুখে রয়েছে চীন। পেন্টাগনের সাবেক কর্মকর্তা ও সিঙ্গাপুরের ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির স্কলার ড. ড্রিউ থম্পসন বলেন, ‘পরিষ্কার দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিষয়টির মূল্যায়ন প্রয়োজন। চীন কেবল একটি অংশীদার বা প্রতিযোগী কিনা প্রশ্নটি তা নিয়ে নয়। দেশটি কিন্তু অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ঝুঁকিরও উৎস।’ তিনি বলেন, ‘চীনের অভ্যন্তরীণ এ পরিবর্তনগুলোকে ঘিরে স্বচ্ছতা না থাকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা আসাটা যুক্তিসংগত ছিল।’ এসব ঘটনা বেইজিংকে ঘিরে তৈরি হওয়া আস্থার সংকটকে সামনে নিয়ে এসেছে বলেও মনে করেন ড. ড্রিউ থম্পসন।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী লি নিখোঁজ হওয়া এবং এ-সংক্রান্ত তদন্ত নিয়ে গত শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন চীন সরকারের একজন মুখপাত্র। বিষয়টি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, এমন পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত নন। স্টেট কাউন্সিল ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তরফেও এ নিয়ে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।

প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল লি শাংফুকে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল গত মার্চে। এর পর থেকে তিনি চীনের সম্প্রসারিত সামরিক কূটনীতির ভাষায় কথা বলতেন। গত জুনে একটি নিরাপত্তা সম্মেলনের সময় এবং আগস্টে রাশিয়া ও বেলারুশ সফরের সময় মার্কিন সামরিক অভিযান নিয়ে তিনি উদ্বেগ জানান। আগামী অক্টোবরে বেইজিংয়ে একটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বৈঠক এবং নভেম্বরে জাকার্তায় আঞ্চলিক প্রতিরক্ষাপ্রধানদের বৈঠকে তার অংশগ্রহণের কথা ছিল। 

বার্লিনের মার্কেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের প্রধান বিশ্লেষক হেলেনা লেগার্দার মতে, কারণ যা-ই হোক না কেন ধারণা করা যায় এসব ঘটনা চীনা প্রতিপক্ষের সঙ্গে যুক্ত থাকার ক্ষেত্রে বিদেশী কুশীলবদের আত্মবিশ্বাসের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।