সর্বশেষ গত বুধবার প্রকাশিত মেরিন ডেটা অনুযায়ী, এসব জাহাজ পারস্য উপসাগরের একদম মাঝে আটকা পড়ে আছে এবং সেখান থেকে বের হওয়ার পথ প্রায় রুদ্ধ। খবর আরব নিউজ।

সামুদ্রিক গোয়েন্দা ও তথ্য বিশ্লেষণকারী সংস্থা ‘কেপলার’ জানিয়েছে, আটকা পড়া জাহাজগুলোর মধ্যে ৫০টি অপরিশোধিত জ্বালানি তেলবাহী এবং ১২টি তরল গ্যাস পরিবাহী বড় জাহাজ। স্বাভাবিক সময়ে এ পথ দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ১২০টি জাহাজ চলাচল করলেও গত মঙ্গল থেকে বুধবারের মধ্যে মাত্র ছয়টি জাহাজ এ প্রণালি পার হতে পেরেছে।

ইরান বর্তমানে এ জলপথের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখেছে। শুধু লারাক দ্বীপের পাশ দিয়ে ইরান অনুমোদিত একটি বিশেষ করিডোর দিয়ে সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেয়া হচ্ছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, প্রতিটি জাহাজ পার করে দেয়ার জন্য ইরান ২০ লাখ ডলার (প্রায় ২৪ কোটি টাকা) পর্যন্ত ফি আদায় করছে। নৌচালকরা এটিকে ‘তেহরান টোল বুথ’ হিসেবে অভিহিত করছেন।

অবশ্য তেহরান ইঙ্গিত দিয়েছে, মালয়েশিয়ার মতো ‘বন্ধুপ্রতিম’ দেশগুলোর জাহাজের ক্ষেত্রে এ টোল মওকুফ করা হতে পারে। মালয়েশিয়ার পেট্রোনাসসহ বেশকিছু প্রতিষ্ঠানের জাহাজ বর্তমানে ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে।

এদিকে চীন নিশ্চিত করেছে, তাদের অন্তত তিনটি জাহাজ বিশেষ সমন্বয়ের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি পার হতে পেরেছে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, চীনের দুটি কনটেইনার জাহাজ বিশেষ ব্যবস্থায় অত্যন্ত দ্রুতগতিতে এ পথ অতিক্রম করেছে। অন্যদিকে একটি গ্রিক জাহাজ সৌদি আরবের তেল নিয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ভারতের এলপিজি পরিবহনকারী কয়েকটি জাহাজও ঝুঁকি নিয়ে হরমুজ পার হতে সক্ষম হয়েছে।

কেবল জাহাজ নয়, এ সংকটের মাঝে প্রায় ২০ হাজার নাবিক পারস্য উপসাগরের উত্তাল সমুদ্রে আটকা পড়ে আছেন। মাইন, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে অনেক জাহাজ রাতে অথবা ট্র্যাকার বন্ধ করে চলাচল করার চেষ্টা করছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধের ফলে অবরুদ্ধ হয়ে পড়া বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি ফের সচল করতে যুক্তরাজ্য এরই মধ্যে ৪০টি দেশের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের ডাক দিয়েছে। তবে এ জোটে নেই যুক্তরাষ্ট্র।

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গতকাল জানান, যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপারের সভাপতিত্বে একটি ভার্চুয়াল সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ সম্মেলনের মূল লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালি দিয়ে ফের পণ্যবাহী জাহাজ চলাচল শুরু করার জন্য কার্যকর কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক পথ খুঁজে বের করা।

যুক্তরাজ্যের নেতৃত্বাধীন এ জোটে ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, কানাডা, জাপান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তারা এক যৌথ বিবৃতিতে ইরানকে এ নৌপথ অবরোধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে এবং জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যথাযথ অবদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তবে এ জোটে যুক্তরাষ্ট্রের অনুপস্থিতি ভূরাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি বলেছেন, এ নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা তার দেশের কাজ নয়। ট্রাম্প একই সঙ্গে যুদ্ধে সমর্থন না দেয়ায় ইউরোপীয় মিত্রদের সমালোচনা করেছেন এবং আবারো ন্যাটো থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন।

এদিকে জোটের দেশগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে, তারা বল প্রয়োগ করে হরমুজ প্রণালি খুলতে চায় না। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী স্টারমার ও ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ উভয়েই সামরিক সমাধানের চেয়ে কূটনৈতিক পন্থার ওপর জোর দিয়েছেন। মাখোঁ বলেন, ‘সামরিক অভিযান চালিয়ে এ প্রণালি খোলার চিন্তা অবাস্তব। এটি করতে অনেক সময় লাগবে এবং উপকূলীয় হুমকি, বিশেষ করে ইরানের বিপ্লবী গার্ডের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মুখে জাহাজগুলোকে বিপদে ফেলবে।’ তিনি সরাসরি ইরানের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন।

শিপিং ডেটা ফার্ম লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্সের তথ্যমতে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে পণ্যবাহী জাহাজে ২৩টি সরাসরি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এতে ১১ ক্রু-সদস্য নিহত হয়েছেন।