বিশ্বের সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত আবাসন কোম্পানি চায়না এভারগ্রান্ড গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা হুই কা ইয়ানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন চীনের একটি আদালত। বৃহস্পতিবার দেশটির দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর শেনজেনের একটি আদালত এ রায় ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে তার সব ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
একসময় এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ছিলেন ৬৭ বছর বয়সী হুই। তহবিলের অপব্যবহার, অর্থ সংগ্রহে জালিয়াতি, অবৈধভাবে জনগণের কাছ থেকে আমানত গ্রহণ, বেআইনিভাবে ঋণ প্রদান, প্রতারণার মাধ্যমে সিকিউরিটিজ ইস্যু ও ঘুস দেয়াসহ আটটি অভিযোগে গত এপ্রিলে তিনি দোষ স্বীকার করেন।
আদালত এক বিবৃতিতে বলেন, এভারগ্রান্ড গ্রুপ, হেংদা রিয়েল এস্টেট ও হুই কা ইয়ানের অপরাধে বিপুল পরিমাণ অর্থ জড়িত ছিল। এসব অপরাধের পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত গুরুতর। এতে বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি সমাজেরও মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। তাই আইন অনুযায়ী কঠোর শাস্তি দেয়া প্রয়োজন।
আদালতের প্রকাশিত ছবিতে ধূসর চুলের হুইকে দুই কর্মকর্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। এ সময় তার পরনে ছিল গাঢ় নীল রঙের লম্বা হাতার কলারযুক্ত শার্ট। ২০২৩ সালে চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হওয়ার পর তাকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি।
হুইয়ের সাজার পাশাপাশি এভারগ্রান্ডকে ৮৮২ কোটি ইউয়ান বা প্রায় ১৩১ কোটি ডলার এবং এর প্রধান সহযোগী প্রতিষ্ঠান হেংদাকে ৭০০ কোটি ইউয়ান জরিমানা করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির আরো পাঁচ জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে অর্থদণ্ডের পাশাপাশি ছয় থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি জানিয়েছে, হুই ছাড়া এভারগ্রান্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরো ৫৬ জনকে বৃহস্পতিবার সাজা দেয়া হয়েছে।
১৯৯৬ সালে এভারগ্রান্ড প্রতিষ্ঠা করেন হুই। মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের একটি গ্রামে দাদির কাছে বেড়ে ওঠা সাবেক এ ইস্পাত কারখানার কর্মী ঋণনির্ভর সম্প্রসারণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটিকে চীনের সবচেয়ে বড় আবাসন কোম্পানিতে পরিণত করেন। ২০১৭ সালে তার সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল ৪ হাজার ৫৩০ কোটি ডলার। সে সময় ফোর্বসের হিসাবে তিনি ছিলেন এশিয়ার সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি।
তবে অতিরিক্ত ঋণ নিয়ে দ্রুত সম্প্রসারণের কারণে এভারগ্রান্ড গভীর আর্থিক সংকটে পড়ে। ২০২১ সালে প্রতিষ্ঠানটি ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হয়। পরে এর ৩০ হাজার কোটি ডলারের বেশি দায় প্রকাশ্যে আসে। এভারগ্রান্ডের পতন চীনের আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী সংকট তৈরি করে এবং দেশটির অর্থনীতি ও আর্থিক বাজারকে নাড়িয়ে দেয়।
প্রতিষ্ঠানটির সম্পদ ব্যবস্থাপনা পণ্যে বিনিয়োগ করা সাধারণ মানুষেরও কয়েকশ কোটি ডলার আটকে যায়। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই নিম্ন আয়ের মানুষ ছিলেন। অর্থ ফেরতের দাবিতে তাদের বিক্ষোভ চীনের সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগ তৈরি করেছিল। হুইয়ের সাজা ঘোষণার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এভারগ্রান্ডের বাড়ির ক্রেতারা প্রশ্ন তুলেছেন, তাদের অর্থ ফেরত পাওয়ার কী হবে।
হংকংয়ের একটি আদালত ২০২৪ সালে এভারগ্রান্ডকে অবসায়নের নির্দেশ দেন। গত বছর হংকং স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে কোম্পানিটিকে তালিকাচ্যুত করা হয়। তবে অবসায়ন প্রক্রিয়া অত্যন্ত ধীরগতিতে চলছে। গত আগস্ট পর্যন্ত মাত্র প্রায় ২৫ কোটি ৫০ লাখ ডলারের সম্পদ বিক্রি করা সম্ভব হয়েছে। অথচ পাওনাদারদের দাবি প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার।
চীনের বাইরে থাকা সম্পদ উদ্ধারেরও চেষ্টা করছেন এভারগ্রান্ডের অবসায়করা। হুই, তার সাবেক স্ত্রী ও সাবেক কর্মকর্তাদের দেয়া প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের লভ্যাংশ ও পারিশ্রমিক ফেরত পেতে বিভিন্ন আদালতে আইনি লড়াই চলছে। তবে হুইয়ের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওনাদারদের অর্থ ফেরত পাওয়ার ক্ষেত্রে কতটা ভূমিকা রাখবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। সূত্র: রয়টার্স










