দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজের বরাতে এমনটাই জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননে ইসরায়েলের ক্রমাগত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আলোচনা স্থগিতের অন্যতম কারণ। দেশটিতে হামলা বন্ধের বিষয়টি যুদ্ধবিরতির অন্যতম শর্ত ছিল। কিন্তু সেটিও বারবার লঙ্ঘন করা হয়েছে। এসব বিবেচনায় ইরানের আলোচক দল মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে সব ধরনের সংলাপ, খসড়া চুক্তির জন্য বার্তা আদান-প্রদান স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
গত ৮ এপ্রিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও বাস্তব পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন। গত রোববার রাতে ইরানের গোরুক শহর ও কেশম দ্বীপে অবস্থিত রাডার ও ড্রোন-সংক্রান্ত স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। তারা জানিয়েছে, এমকিউ-১ ড্রোন ভূপাতিতের জবাবে ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন ও দুটি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।
জবাবে গতকাল উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি মার্কিন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার দাবি করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)। দেশটির আধা সরকারি বার্তা সংস্থা ফার্স নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হরমোজগান প্রদেশের সিরিক দ্বীপে যোগাযোগ অবকাঠামোয় হামলার পর এ আক্রমণ চালিয়েছে আইআরজিসির বিমান বাহিনী। তবে ঘাঁটিটির অবস্থান প্রকাশ করেনি তারা।
আর কুয়েতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা কুনা জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গতকাল কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিহত করেছে। যদিও এসব হামলার উৎস বা লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য দেয়া হয়নি।
এর আগে মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছিল, ট্রাম্প প্রশাসন প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তির কয়েকটি শর্ত আরো কঠোর করেছে এবং সংশোধিত কাঠামো পুনরায় তেহরানের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ প্রসঙ্গে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ‘বাস্তব ও দৃশ্যমান ফলাফল নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তেহরান কোনো প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে না।’ তার ভাষায়, ‘শত্রুর প্রতিশ্রুতি ও কথায় কোনো আস্থা নেই।’
বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিনের বৈরিতা, আগের চুক্তিগুলো ভঙ্গ এবং আলোচনার মধ্যেই সামরিক হামলা ইরানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি করেছে। ফলে আলোচনার টেবিলে অগ্রগতি হলেও রাজনৈতিক আস্থার সংকট বড় বাধা হয়ে রয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংঘাতের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে লেবানন। দেশটির রাজধানী বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহর দাহিয়েহতে হামলার নির্দেশ দিয়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহু ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ। হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগে বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে ‘সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে’ হামলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ঘোষণার পরই সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের শঙ্কায় এলাকা ছাড়তে শুরু করেছে হাজার হাজার বাসিন্দা।
একই সঙ্গে দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী অঞ্চলে সামরিক নিয়ন্ত্রিত নিরাপত্তাবলয় গঠনের অঙ্গীকার করেছে ইসরায়েল সরকার। এর একদিন আগে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের ঐতিহাসিক বেউফোর্ট দুর্গ দখল করে, যা ২৫ বছরের মধ্যে দেশটির সবচেয়ে গভীর সামরিক অগ্রযাত্রা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গত ১৭ এপ্রিল ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহর মধ্যে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হলেও বাস্তবে তা কখনো কার্যকর হয়নি। উভয় পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত ২ মার্চ শুরু হওয়া ইসরায়েলি হামলায় দেশটিতে ৩ হাজার ৪১২ জন নিহত ও ১০ হাজার ২৬৯ জন আহত হয়েছে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নতুন প্রস্তাব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের প্রস্তাব অনুযায়ী, হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সব ধরনের হামলা বন্ধ করলে এর বিনিময়ে ইসরায়েল বৈরুতে সামরিক অভিযান সম্প্রসারণ থেকে বিরত থাকবে। এরই মধ্যে লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউন ও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে পৃথকভাবে আলোচনা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও।
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে ছড়িয়ে পড়া এ উত্তেজনার আঁচে ঊর্ধ্বমুখী হতে শুরু করেছে আন্তর্জাতিক জ্বালানির বাজার। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৬৭ শতাংশ। কেনাবেচা হচ্ছে প্রতি ব্যারেল ৯৫ দশমিক ৩৫ ডলারে।










