ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত শুরু হওয়ার পর কয়েক লাখ লেবানিজ তাদের বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে গেছে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের একটি গ্রামের বাসিন্দারা থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। খবর বিবিসি।
সীমান্ত থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রেমিশ গ্রাম সাত হাজার ম্যারোনাইট খ্রিস্টানের আবাসস্থল এবং এর চারদিকে রয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র। জিরিস আল-আলম নামে এক কৃষক বলেন, ‘প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। হয়তো ৯০ শতাংশ বাড়িই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হয়তো কাচ ভেঙে গেছে, নয়তো দেয়ালে ফাটল ধরেছে। শীত এলে কী হবে, তা জানি না।’
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা থাকার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কিন্তু বিমান হামলার কারণে রাতে খুব কম মানুষই ঘুমাতে পারে। ভাগ্যক্রমে এখন পর্যন্ত বাসিন্দাদের মধ্যে কেউ মারা যায়নি। তবে সামরিক অভিযানের সময় আগুনে আমার ২০০টি গবাদিপশু মারা গেছে।’
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা থেকে হামাস দক্ষিণ ইসরায়েলে নজিরবিহীন হামলা শুরু করার একদিন পর লেবানন সমর্থিত হিজবুল্লাহ উত্তর ইসরায়েলে রকেট হামলা শুরু করে, ফলে লেবাননে হামলা শুরু হয়। এরপর থেকে রেমিশের বাসিন্দাদের জন্য তাদের ওপর দিয়ে উভয় দিক থেকে রকেট উড়তে দেখা সাধারণ ও নৈমিত্তিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়ায়।
৪৪ বছর বয়সী ফাদার জর্জ আল-আমিল বলেন, ‘অনেক পরিবার তাদের বাড়ি ও গাড়িতে সাদা পতাকা উত্তোলন করে বার্তা দিতে চান যে তারা শান্তিপূর্ণ ও যা ঘটছে, তার সঙ্গে তাদের কোনো যোগসূত্র নেই। আমরা আমাদের ঘরেই থাকতে চাই এবং আমাদের গ্রামে কোনো যুদ্ধ চাই না।’
চলতি বছরের ১ অক্টোবর ইসরায়েল লেবাননে স্থল অভিযান শুরু করার পর যুদ্ধ রেমিশের কাছাকাছি চলে আসে। মাত্র ১ দশমিক ৬ কিলোমিটারেরও কম দূরত্বের দুটি গ্রামে প্রচণ্ড লড়াই হতে থাকে।
৩৮ বছর বয়সী রাশা মাখবুর বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই আমরা আমাদের বাড়িতে ছিলাম। কিন্তু এরপর আমাদের বাড়ির খুব কাছাকাছি বিমান হামলা শুরু হয়। হঠাৎ আমাদের বাড়িতে আঘাত হানে। আমরা মাঝরাতে ঘর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হই। মানুষের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। কেউ বাইরে যাচ্ছে না। বাচ্চাদের স্কুল বন্ধ। সবকিছু বদলে গেছে।’
রাশা বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যে রকেটগুলো আমাদের বাড়িতে আঘাত করেছে তা দক্ষিণ থেকে এসেছিল, আমাদের দেশ থেকে নয়।’
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) বিবিসিকে জানিয়েছে, রাশা মাখবুরের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সময় রেমিশের ওপর আইডিএফের কোনো হামলা হয়নি। তাদের দাবি, হামলাটি ছিল হিজবুল্লাহর ব্যর্থ প্রচেষ্টা।
স্থল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চল খালি করার সাধারণ নোটিস জারি করে। জাতিসংঘ বলছে, যুদ্ধ থেকে পালিয়ে আসার কারণে সেখান থেকে ৬ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
ইসরায়েলি সরকার বলছে, দক্ষিণ লেবাননে তাদের সামরিক লক্ষ্য হচ্ছে হিজবুল্লাহকে হটিয়ে দেয়া এবং উত্তরাঞ্চলীয় সীমান্ত শহরগুলো থেকে বাস্তুচ্যুত ৬০ হাজার ইসরায়েলিকে তাদের বাড়িঘরে ফিরিয়ে আনা।
ইসরায়েলের সীমান্তবর্তী রেমিশে লেবাননের একমাত্র গ্রাম, যেখান থেকে সরাসরি সরে যাওয়ার নির্দেশ দেয়া হয়নি। সংঘাতের সময় কোনো পক্ষই রেমিশের বাসিন্দাদের সরাসরি হুমকি না দিলেও লেবাননের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। রেমিশের মেয়র বলেন, ‘আমরা কোনো পক্ষ থেকেই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পাইনি। আমাদের গ্রাম শান্তিপূর্ণ ও এখানে থাকার একমাত্র কারণ আমাদের পরিচয় ও আমাদের দেশ।’










