সিএনএনের প্রতিবেদন জানাচ্ছে, গবেষণাগারে তৈরি এই ভ্রূণ সদৃশ কাঠামো এখনও পুরোপুরি প্রকৃত ভ্রূণের মতো নয়। তবে দিন দিন এগুলো আরো পরিণত হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, গঠন এবং আচরণে এগুলো অনেকটা প্রাথমিক স্তরের মানব ভ্রূণের মতোই হয়ে উঠেছে। ফলে মানব ভ্রূণের বিকাশ এবং বন্ধ্যাত্বের কারণ অনুসন্ধানে এগুলো নিয়ে আলোচনা বাড়ছে। গবেষণার বর্তমান অগ্রগতি মাত্র এক দশক আগে চিন্তাও করা যায়নি। তবে এটি এখন জৈবিক, নৈতিক ও আইনগত বিষয়ে একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেসের (ইউসিএলএ) প্রজনন বিজ্ঞানের অধ্যাপক এবং ইউসিএলএ সেন্টার ফর রিপ্রোডাক্টিভ সায়েন্সের পরিচালক আমান্ডার ক্লার্ক বলেন, ‘আমরা সত্যিই ভাবিনি বিজ্ঞান এত দ্রুত এগিয়ে যাবে। এখন সময় এসেছে এই গবেষণাকে এমন এক কাঠামোর মধ্যে আনার, যেখানে বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি এবং নৈতিক, সামাজিক ও আইনগত দায়িত্ববোধের ভারসাম্য থাকবে।’ ক্লার্ক এখন আন্তর্জাতিক স্টেম সেল গবেষণা সংস্থার (আইএসএসসিআর) এমব্রিও মডেল ওয়ার্কিং গ্রুপের সহ-সভাপতির দায়িত্বে রয়েছেন। তারা বিশ্বব্যাপী এ গবেষণার নীতিমালা নির্ধারণে কাজ করছেন।

গবেষকরা বলছেন, এখন পর্যন্ত কোনো স্টেম সেল মডেলকেই পূর্ণ মানব ভ্রূণ বলার সুযোগ নেই। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই কোষগুচ্ছ থেকে এমব্রিওর মতো গঠন তৈরি হওয়া অনিশ্চিত। তবে নতুন গবেষণাগুলোয় দেখা যাচ্ছে, মডেলগুলো এমন কিছু কাঠামো তৈরি করেছে, যা পরবর্তীকালে হৃৎপিণ্ড বা মস্তিষ্কের মতো অঙ্গের ভিত্তি সৃষ্টি করতেও পারে। ইঁদুরের কোষ দিয়ে তৈরি অনুরূপ মডেলগুলো এরই মধ্যে মস্তিষ্ক ও হৃদপিণ্ডের বিকাশ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তবে বিজ্ঞানীদের লক্ষ্য মানুষ তৈরি করা নয়। মানবদেহের প্রাথমিক বিকাশ বোঝার জন্যই এই গবেষণা করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন তারা।

আইএসএসসিআর সম্প্রতি তাদের নীতিমালার খসড়ায় প্রস্তাব দিয়েছে, ল্যাবে তৈরি ভ্রূণের অংশবিশেষ এবং সম্পূর্ণ ভ্রুণ— উভয় প্রকার মডেলের জন্যই নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা প্রয়োজন। তারা দুটি স্পষ্ট রেড লাইন নির্ধারণ করেছে। প্রথমত, কোনো মানব ভ্রূণ মডেলকে মানুষের বা প্রাণীর গর্ভে প্রতিস্থাপন করা যাবে না এবং দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম গর্ভে ভ্রূণ সৃষ্টি বা একটোজেনেসিস প্রযুক্তির মাধ্যমে মানুষের ভ্রুণ সৃষ্টির চেষ্টাও নিষিদ্ধ থাকবে।

যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য আইন বিশেষজ্ঞ এমা কেভ বলেন, ‘ভ্রূণ মডেল ও প্রকৃত ভ্রূণকে এখন আলাদা করে দেখা গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি অনেকটা হীরার মতো—প্রাকৃতিক এবং ল্যাবে তৈরি হীরার রাসায়নিক গঠন এক হলেও তাদের মূল্য আলাদা।’ তবে তিনি মনে করেন, অতি দ্রুত কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করলে হয়তো গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা ব্যহত হতে পারে।

তবে অনেকে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, ভবিষ্যতে এই মডেলগুলো দিয়ে জীবন সৃষ্টির চেষ্টা হতে পারে। ক্লার্ক এবং তার সহকর্মীরা স্পষ্টভাবে বলছেন, বর্তমানে স্টেম সেলভিত্তিক ভ্রূণ মডেলকে জীবন্ত ভ্রূণে পরিণত করার যেকোনো প্রয়াস অনিরাপদ এবং অনৈতিক। তিনি বলেন, ‘আসলে ইমপ্লানটেশন বা গর্ভে ভ্রূণের সংযুক্তি এমন এক ব্ল্যাক বক্স—যেখানে কী ঘটে আমরা তা এখনো জানিই না। আর যেহেতু জানি না, ফলে বুঝতেই পারছি না, ঠিক কোন জায়গাটি আমরা মিস করছি।’