পশ্চিম তীরে অবরুদ্ধ থাকা দুই ফিলিস্তিনি পরিবারকে গতকাল বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করেছে ইসরায়েলি সেনারা। অথচ এর একদিন আগেই ইসরায়েলের শীর্ষ এক সেনা কর্মকর্তা বলেছিলেন, ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ করতে সহিংসতা চালানো ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের তিনি সরিয়ে দেবেন। খবর দ্য গার্ডিয়ান।
ইসরায়েলি সেনারা বৃহস্পতিবার ভোরে কুসরায় আটটি বাড়ি দখলে নেয়। তারা গ্রামের মেয়র আবদুল আজিম ওয়াদিকে জানায়, বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দিতে কয়েক দিন ধরে চলা একটি অভিযানের জন্য এসব বাড়ি প্রয়োজন। পরে ছয়টি বাড়ি থেকে সেনারা সরে যায়। তবে বসতি স্থাপনকারীরা তখনো গ্রামে ঘোরাফেরা করছিল।
গত রোববার থেকে ফিলিস্তিনিদের এই দুর্ভোগ শুরু হয়। ওই দিন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারী ও সেনারা গ্রামের প্রান্তে তিনটি বাড়ির প্রবেশপথ আটকে একটি তাঁবু স্থাপন করে। তারা বাড়িগুলোর পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এমনকি অসুস্থ এক শিশুকে নিতে আসা অ্যাম্বুলেন্সকেও সেখানে যেতে বাধা দেয়া হয়।
অবরোধ নিয়ে আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় গত বুধবার অধিকৃত পশ্চিম তীরে থাকা সব ইসরায়েলি সেনার কমান্ডার মেজর জেনারেল আভি ব্লুথ কুসরায় যান। তিনি অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দেখা করে বসতি স্থাপনকারীদের গ্রাম থেকে ‘সরিয়ে দেয়ার’ প্রতিশ্রুতি দেন।
এরপর ব্লুথের সেনারা তাঁবুটি সরিয়ে দেয়। কিন্তু বসতি স্থাপনকারীদের সেখান থেকে সরানো হয়নি; তাদের বিছানা ও অন্যান্য সরঞ্জামও সেখানে পড়েছিল। দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণের কৌশল ব্যবহার করে বসতি স্থাপনকারীদের সরানোর একটি চেষ্টা ব্যর্থ হলে সেনারা সরে যায়। গতকাল পঞ্চম দিনেও অবরোধ চলছিল এবং ব্লুথের সফরের পর পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়।
অবরুদ্ধ ফিলিস্তিনিদের একজন কুসাই রিদি। তিনি বলেন, ‘সকাল ১০টার দিকে সেনারা এসে আমাদের বাড়ি ছাড়তে বলে। তারা জানায়, এলাকায় তিন দিনের একটি সামরিক অভিযান চলবে। আমরা বাড়ি ছাড়তে অস্বীকৃতি জানাই। এরপর সেনারা আমাদের সবাইকে একটি বাড়িতে নিয়ে যায়।’
বিকালে রিদিকে নিজের বাড়িতে ফিরে যেতে দেয়া হয়। সেখানে গিয়ে তিনি দেখতে পান, ইসরায়েলি সেনারা তার নিরাপত্তা ক্যামেরার ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং কিছু সরঞ্জাম নিয়ে গেছে। তার প্রতিবেশী ইউসেফ হাসানের বাড়ি তখনো সেনারা দখলে রেখেছিল। হাসানও রিদির বাড়িতে অবস্থান করছিলেন।
গত মার্চে বসতি স্থাপনকারীর হামলায় ২৮ বছর বয়সী আমির মোয়াতাসেম ওদেহ নিহত হয়েছিলেন, ওই এলাকায়ও বসতি স্থাপনকারীরা টহল দিচ্ছিল। হামলায় তার বাবাকেও ছুরিকাঘাত করা হয়। সেই হত্যা ও হামলার ঘটনায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
রিদি বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছি এবং সেনাবাহিনী সত্যিই বসতি স্থাপনকারীদের সরিয়ে দেবে কিনা, তা বিশ্বাস করতে পারছি না। তবে আমি আন্তরিকভাবে আশা করি, তারা তা করবে।’
বৃহস্পতিবার বিকালে ইসরায়েলি সেনারা সকালে দখলে নেয়া ছয়টি বাড়ি থেকে সরে যায়। ফিরে এসে ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো দেখতে পায়, বাড়িঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একটি কোরআনের পাতা ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে এবং ঘরের সাজসজ্জার বিভিন্ন জিনিসও নষ্ট করা হয়েছে।
ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ ওলমার্ট এ অবরোধকে ‘জাতিগত নির্মূলের একটি পরিকল্পিত ও সূক্ষ্ম প্রচেষ্টা’ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, এতে তিনি ঘৃণা ও লজ্জাবোধ করছেন।
ওলমার্ট বলেন, ‘এগুলো মানবতাবিরোধী অপরাধ, যা ইসরায়েল সরকার সক্রিয়ভাবে সমর্থন করছে। আর ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও ইসরায়েলি পুলিশের উদাসীনতা এবং নিষ্ক্রিয়তা এসব অপরাধে সহায়তা করছে। এটি ভুলে যাওয়ার মতো নয়, ক্ষমা করারও নয়।’
জুলাইয়ে পাশের জালুদ গ্রামেও একই ধরনের সন্ত্রাসী কৌশল ব্যবহার করে আরেক ফিলিস্তিনি পরিবারকে বাড়ি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল। গতকাল সেই বাড়ির ছাদে ইসরায়েলি সেনা ও বসতি স্থাপনকারীদের একসঙ্গে ফুটবল খেলতে দেখা যায়।
ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর একজন মুখপাত্র বলেছেন, কুসরার ফিলিস্তিনি বাসিন্দাদের যেন উচ্ছেদ করা না হয়, সে নির্দেশ সেনাদের দেয়া হয়েছিল। অবরুদ্ধ বাড়িগুলোর ভেতরেও সেনারা অভিযান চালাবে না।
এক বিবৃতিতে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী বলেছে, ‘সেনাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে, কুসরার বাসিন্দারা তাদের বাড়িতেই থাকবেন।’ তবে ওই নির্দেশ কেন বাস্তবায়িত হয়নি, সে বিষয়ে ওই মুখপাত্র কোনো মন্তব্য করেননি।
ইসরায়েলি সংবাদপত্র মারিভে ভাষ্যকার আভি আশকেনাজি লিখেছেন, ‘কুসরায় গতকালের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, একদল গুন্ডার সামনে আইডিএফ, পুলিশ, জিএসএস (শিন বেত) ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার অক্ষমতা কতটা।’
তিনি বলেন, ‘অপরাধীদের গ্রেফতার করতে পুলিশের গাড়ি পাঠানোর বদলে নিরাপত্তা বাহিনী তাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করছে। তারা গুন্ডা। তারা নিজেদের এই ভূমির মালিক মনে করে।’
অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি উগ্রপন্থীরা প্রায় সম্পূর্ণ দায়মুক্তি নিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালাচ্ছে। ২০২০ সাল থেকে সেখানে ইসরায়েলি বেসামরিক নাগরিক ও সেনাদের হাতে ১ হাজার ১০০ এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। এসব মৃত্যুর ঘটনায় মাত্র একটি অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠন বি’তসালেমের মতে, এই সহিংসতা বৃহত্তর জাতিগত নির্মূলের প্রচেষ্টার অংশ। গত তিন বছরে ইসরায়েল ৬৪টি ফিলিস্তিনি জনপদকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করেছে। আরো ১৫টি জনপদের বাসিন্দারা এলাকা ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সব মিলিয়ে ৪ হাজার ৮০০-এর বেশি মানুষ নিজেদের বাড়িঘর থেকে বিতাড়িত হয়েছেন।










