যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা উপত্যকায় দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আপাতত এড়ানো গেলেও এখনো হাজার হাজার ফিলিস্তিনি তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে রয়েছে। জাতিসংঘ সমর্থিত খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধবিরতি ও ত্রাণপ্রবাহ কিছুটা বাড়ায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে, কিন্তু মানবিক অবস্থা এখনো অত্যন্ত নাজুক। নতুন করে সংঘাত শুরু হলে বা ত্রাণ প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হলে পরিস্থিতি আবার ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। খবর বিবিসি ও এপি।

বৈশ্বিক খাদ্যসংকট মূল্যায়নের ও পর্যবেক্ষণের জন্য স্বীকৃত সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশন (আইপিসি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে গাজার কোনো এলাকাকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘দুর্ভিক্ষ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ এখনো ‘জরুরি’ মাত্রার খাদ্যসংকটে রয়েছেন। এর মধ্যে এক লাখের বেশি মানুষ গত মাসে ‘চরম বিপর্যয়কর পরিস্থিতি’ বা আইপিসির সর্বোচ্চ ধাপের খাদ্য অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিল।

গত বছরের আগস্টে আইপিসি সতর্ক করেছিল, গাজার কিছু অংশে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়েছে এবং তা পুরো অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সে সময় গাজার মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-চতুর্থাংশ, অর্থাৎ পাঁচ লাখের বেশি মানুষ চরম খাদ্য সংকটে পড়েছিল। সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুদ্ধের তীব্রতা কমায়, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি এবং মানবিক ও বাণিজ্যিক খাদ্য সরবরাহ বাড়ায় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।

আইপিসির তথ্য অনুযায়ী, গাজায় খাদ্যের যোগান বেড়েছে এবং অনেক মানুষ এখন দিনে দুই বেলা খাবার পাচ্ছেন। গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে যেখানে অনেকে দিনে মাত্র এক বেলা খাবার পেতেন, সেখানে এটি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। অপুষ্টির হারও কিছু এলাকায় কমেছে, তবে গাজা শহরে তা এখনো সংকটজনক এবং দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসে পরিস্থিতি এখনো গুরুতর।

তবে সংস্থাটি সতর্ক করেছে, সামগ্রিক পরিস্থিতি এখনো ‘অত্যন্ত ভঙ্গুর’। সাত লাখ ত্রিশ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত রয়েছেন এবং গাজার ৯৬ শতাংশের বেশি কৃষিজমি ধ্বংস হয়েছে বা ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ফলে স্থানীয়ভাবে খাদ্য উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি শীতকালীন আবহাওয়া, পর্যাপ্ত আশ্রয়ের অভাব, ধ্বংসপ্রাপ্ত স্যানিটেশন ব্যবস্থা এবং ত্রাণ প্রবেশে সীমাবদ্ধতা সংকট আরো বাড়াচ্ছে।

বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এপ্রিলের মধ্যে চরম খাদ্যসংকটে থাকা মানুষের সংখ্যা প্রায় এক হাজার ৯০০ তে নেমে আসতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইপিসি। তবে প্রতিবেদনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, আবার সংঘাত শুরু হলে বা ত্রাণ সরবরাহ বন্ধ হলে পুরো গাজা উপত্যকাই দুর্ভিক্ষের ঝুঁকিতে পড়বে।

এদিকে ইসরায়েল সরকার আইপিসির এই প্রতিবেদনের তীব্র সমালোচনা করেছে। তাদের দাবি, গাজায় প্রয়োজনের চেয়েও বেশি খাদ্য সহায়তা ঢুকছে এবং প্রতিবেদনে বাস্তব পরিস্থিতি সঠিকভাবে তুলে ধরা হয়নি। আইপিসি জানিয়েছে, জাতিসংঘ ও ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতেই এই মূল্যায়ন করা হয়েছে।

অন্যদিকে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা বলছে, দুর্ভিক্ষ আপাতত ঠেকানো গেলেও গাজায় মানুষের জীবনযাত্রা এখনো বিপর্যস্ত। আরো বড় পরিসরে, নিরবচ্ছিন্ন ও নিরাপদ মানবিক সহায়তা নিশ্চিত না হলে এই সংকট আবার মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে।