গত পাঁচ দশকে অসংখ্য সংকটের মধ্য দিয়ে গেছে ইরান। শাহ শাসনের পতন ও ইসলামী প্রজাতন্ত্রের উত্থান থেকে শুরু করে যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, পারমাণবিক বিতর্ক ও সাম্প্রতিক অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা দেশটির এক দীর্ঘ সংঘাত ও সংগ্রামের উপাখ্যান।

বিপ্লবের সূচনা ও প্রাথমিক সংকট

১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে দীর্ঘ ১৪ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ইরানে ফেরেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি। এর মধ্য দিয়েই দেশটিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। সে বছরের এপ্রিলে একটি গণভোটের মাধ্যমে ইরানকে ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্র’ ঘোষণা করা হয়। তবে নভেম্বর মাস আসতেই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি হয়।

সেসময় তেহরানের মার্কিন দূতাবাসে আমেরিকানদের জিম্মি করা হয়। এর প্রতিক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর প্রথম নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর পেছনে প্রেক্ষাপট ছিল ১৯৫৩ সালের অভ্যুত্থান, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মদদে ইরানের নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে ক্ষমতায় বসে মার্কিন সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পহলাভি। পরবর্তীতে জিম্মিরা মুক্তি পেলেও দুই দেশের সম্পর্কের ফাটল আর মেরামত হয়নি।

রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতা (১৯৮০-১৯৮৯)

১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে ইরান আক্রমণ করে ইরাক। শুরু হয় দীর্ঘ আট বছরের বিধ্বংসী যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আদলে পরিখা ও মেশিনগানের ব্যবহার এবং ইরাকের রাসায়নিক অস্ত্রের প্রয়োগে এ যুদ্ধ ভয়ঙ্কর রূপ নেয়। প্রায় হারায় প্রায় ৫ লাখ মানুষ। যুদ্ধের মধ্যেই ১৯৮১ সালে ইরানে দুটি বড় ধরনের বোমা হামলায় শীর্ষ বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা মোহাম্মদ বেহেশতি ও তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ-আলি রাজাই নিহত হন। ১৯৮৮ সালে ইরানের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত করে মার্কিন সেনারা। সেসময় ২৯০ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়। অবশেষে ১৯৮৮ সালের আগস্টে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ইরান-ইরাক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়।

এর পরের বছরই (১৯৮৯) সর্বোচ্চ নেতা খোমেনির মৃত্যু হয়। আর তার স্থলাভিষিক্ত হন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি।

ভূ-রাজনীতি ও পারমাণবিক বিতর্ক (১৯৯০-২০১০)

নব্বইয়ের দশকে বড় ধরনের ভূমিকম্প ও নতুন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হয় ইরান। এ ভূমিকম্পে প্রাণ হারায় অন্তত ৪০ হাজার মানুষ। ১৯৯৫ সালে ইরানের ওপর তেল ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। আর ১৯৯৮ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণে নিলে ইরানের কূটনৈতিক শাখা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

এসবের মাঝেই ২০০২ সালে ইরানকে ‘অ্যাক্সিস অব ইভিল’ বা 'অশুভ অক্ষ' হিসেবে আখ্যায়িত করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ। পরের বছর যুক্তরাষ্ট্র আক্রমণ করলে ওই অঞ্চলে শিয়া মিলিশিয়াদের সমর্থন দিয়ে ইরান নিজের প্রভাব বাড়াতে শুরু করে। একই সময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়তে থাকে। ২০০৬ সাল থেকে ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রমের ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাতিসংঘ। এর মধ্যে ২০১০ সালে ইরানের পারমাণবিক কেন্দ্রে সাইবার আক্রমণের (ম্যালওয়্যার) ঘটনা ঘটে। আর এর জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে ইরান।

গৃহযুদ্ধ, চুক্তি ও পুনরায় সংঘাত (২০১১-২০১৮)

২০১১ সালে সিরিয়ায় গণঅভ্যুত্থান শুরু হলে ইরান তার মিত্র বাশার আল-আসাদকে রক্ষায় সামরিক সহায়তা পাঠায়। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে ইরান আরো চাপে পড়ে। ২০১২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানি তেল বয়কট করলে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের মান নাটকীয়ভাবে পড়ে যায়। তবে ২০১৫ সালে ওবামা সরকারের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য আসে। সেসময় ইরানিরা আশা করেছিল, এর মাধ্যমে তাদের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। কিন্তু ২০১৮ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতা গ্রহণের পর এ চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নেন, যা পুনরায় উত্তেজনা সৃষ্টি করে।

সাম্প্রতিক চরম উত্তেজনা ও সংঘাত (২০২০-২০২৬)

২০২০ সালে মার্কিন ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানি নিহত হলে দুই দেশের সম্পর্ক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছায়। এরপর ২০২৪ সালটি ছিল ইরানের জন্য অত্যন্ত নাটকীয়। এপ্রিলে দামেস্কে ইরানি দূতাবাসে ইসরায়েলি বোমা হামলা আর মে মাসে হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির মৃত্যু দেশটিকে এক গভীর সংকটে ফেলে দেয়। জুলাই মাসে তেহরানে নিহত হন হামাসপ্রধান ইসমাইল হানিয়া। তার মৃত্যুর জন্যও ইসরায়েলকে দায়ী করা হয়।

ইরানের পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নেয় ২০২৫ সালের জুন মাসে। ইরানে সরাসরি আক্রমণ করে ইসরায়েল। ১২ দিনের সেই সংক্ষিপ্ত কিন্তু বিধ্বংসী যুদ্ধে ৬ শতাধিক ইরানি প্রাণ হারায়।

২০২৬ সালের এসেও দেশটিতে সরকার ও বিরোধীদের মধ্যে সহিংসতা এবং বিদেশী হস্তক্ষেপের অভিযোগ নিয়ে অস্থিরতা চলছে। দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের শঙ্কা আন্তর্জাতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।