মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি করেছিল, তখন হঠাৎ করেই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এমন এক পরিস্থিতিতে দৃশ্যপট পাল্টে গেছে যখন ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পক্ষই দাবি করতে পারছে যে তারা বিজয়ী।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণী প্রতিবেদন অনুযায়ী, সবার আগে নিজেদের জয়ী বলে দাবি করবে ইরান। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বিস্তৃত যুদ্ধ এড়িয়ে গেছে তেহরান। যুদ্ধের মুখ থেকে পিছু হটার কৌশল বের করতে সোমবার সকালে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে এক জরুরি বৈঠকে বসেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা। আগের সপ্তাহে ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত হানে, যা ইরানের জন্য ছিল বিশাল ক্ষতি।
এই পরিস্থিতিতে একদিকে মুখ রক্ষার প্রয়োজন, অন্যদিকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ভয়—এই দ্বৈত চাপে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি সশস্ত্র প্রতিশোধের নির্দেশ দিলেও, সেই প্রতিশোধ সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত রাখতে বলেন। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রতিরোধ দেখাতে চাইলেও ইরান চায়নি সংঘাত আরো গভীর হোক।
পরিস্থিতিকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে কাতারে অবস্থিত আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিকে টার্গেট করে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড কোরস। আক্রমণের আগে ইরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারকে অগ্রিম সতর্কবার্তা পাঠায়। কাতার তখনই তাদের আকাশসীমা বন্ধ করে দেয়। এই ‘বার্তাসহ আক্রমণ’ ছিল ইরানের কৌশল। তারা দৃশ্যমান প্রতিরোধ দেখাতে চাইছির কিন্তু আমেরিকান হতাহতের ঝুঁকি নিতে চায়নি।
আল-উদেইদ মার্কিন ঘাঁটিকে টার্গেট করাও ইরানের আর একটি কৌশল বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। মধ্যপ্রাচ্যে থাকা সমস্ত ঘাঁটির মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ঘাঁটি আল-উদেইদ। ইরানের তিন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার কমান্ড এখান থেকেই হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া কাতার ইরানের বন্ধুপ্রতিম রাষ্ট্র, তাই ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও সীমিত রাখা সম্ভব।
এ হামলার পর দৃশ্যত বিজয়ী ইরান। দেশটির সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার খেয়ে পালিয়ে যাওয়ার যুগ শেষ।
নিজেদের জয়ী বলে দাবি করার রসদ ইসরায়েল ও আমেরিকারও রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি শিগগিরই কার্যকর হবে। যদিও এ বিষয়ে দুই দেশের কেউই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই মুহূর্তটি যুদ্ধবিরতির জন্য উপযুক্ত সময়। ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান বিষয়ক পরিচালক আলি ভায়েজের মতে, এখন প্রতিটি পক্ষই নিজেকে বিজয়ী দাবি করতে পারছে, আবার বড় ধরনের সংঘাতের ঝুঁকিও এড়িয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি এমন এক মুহূর্ত যখন যুক্তরাষ্ট্র বলতে পারে তারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে পিছিয়ে দিয়েছে। ইসরায়েল বলতে পারে তারা তাদের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইরানকে দুর্বল করেছে। আর ইরান বলতে পারে তারা শক্তিশালী সামরিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছে।
মাত্র এক সপ্তাহের বেশি সময়ের মধ্যে যুদ্ধ অনেক পুরনো সীমারেখা অতিক্রম করেছে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার আগ্রহ ইরানের মধ্যে কমে যাচ্ছে। তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে হাজার হাজার মানুষ গৃহচ্যুত হয়েছে। দোকানপাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি অফিস অনেক জায়গায় বন্ধ বা সীমিত সময় চালু আছে। অর্থনৈতিক সংকট প্রকট হচ্ছে।
এরপর ইরান কী করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটিতে সীমিত হামলা সংঘাত আরও না বাড়ানোর লক্ষ্যে করা হলেও, এটিই যে শেষ তা নিশ্চিত নয়।
পশ্চিমা কর্মকর্তারা বলছেন, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার পরও তারা জানেন না ইরানের ইউরেনিয়াম মজুদ কোথায় রয়েছে বা সেটি কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইরান কি আরও ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার ক্ষমতা রাখে? তারা কি আরও গোপন পন্থায় হামলার পরিকল্পনা করছে? নাকি এখন কঠোর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের জন্য আলোচনায় বসবে?
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি কূটনৈতিক সফরে তুরস্ক, রাশিয়া ও তুর্কমেনিস্তান ঘুরছেন। কাতারে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলার পর তিনি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেন, ‘আমি বলছি না আমাদের ক্ষতি হয়নি — অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু তারা তাদের মূল লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি।’










