এ অস্থিরতার মধ্যেই ইরানের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোয় সাময়িকভাবে হামলা স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘোষণার পর থেকেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করে। বিশেষ করে গতকাল সকাল থেকে এশিয়ার শেয়ারবাজারগুলোয় চাঙ্গা ভাব লক্ষ করা গেছে।

এর আগে ট্রাম্প দাবি করেন, যুদ্ধের উত্তেজনা প্রশমনের জন্য একটি সমঝোতার চেষ্টা চলছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তার বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং জামাতা জ্যারেড কুশনার ইরানের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলেও জানা গেছে। বৈশ্বিক শেয়ার ও বন্ড বাজারে যে পতন দেখা গিয়েছিল, এ ঘোষণার পরপরই তা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। পাশাপাশি জ্বালানি তেলের বাজারে চলমান অস্থিরতা ও সংঘাতের মধ্যেও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এসেছে, যা বাজারের স্থিতিশীলতার সম্ভাবনাকে ইঙ্গিত করছে।

এদিকে ট্রাম্প ইরানকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছেন। পাঁচদিনের মধ্যে আলোচনায় না এলে আবারো সামরিক পদক্ষেপ নেয়া হতে পারে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। তবে বাস্তবে আলোচনার সম্ভাবনা কতটা শক্তিশালী, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

সময় বেঁধে দিলেও ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইরানের ইস্পাহান ও খোররাম নগরীর জ্বালানি কেন্দ্রে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চালানোর খবর পাওয়া গেছে। ইরানের আধাসরকারি বার্তা সংস্থা ফারস গতকাল জানায়, ইস্পাহানের উত্তরাঞ্চলীয় কাভেহ সড়কে একটি গ্যাস স্থাপনা ভবন এবং গ্যাস প্রেসার রিডাকশন স্টেশনে হামলা হয়েছে। তবে আগে থেকে পূর্ব সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়ায় জ্বালানি কেন্দ্রগুলোয় বড় ধরনের বিস্ফোরণ ও হতাহতের ঘটনা এড়ানো গেছে বলে খবরে জানানো হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র কিংবা ইসরায়েল কেউই এ হামলার সরাসরি দায় স্বীকার করেনি। হামলা নিয়ে দুই দেশের বক্তব্যও অসংগতিপূর্ণ ও পরস্পরবিরোধী।

ইরানে এ পর্যন্ত ৮২ হাজারের বেশি বেসামরিক ইউনিটে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরানে ৮২ হাজার ৪১৭টি ‘বেসামরিক ইউনিট’ বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে মোট ২৮১টি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ফার্মেসি রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। সেই হামলা এখনো চলমান। পাল্টা জবাবে ইরান ইসরায়েলে ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

ইসরায়েলে হামলা আরো জোরদার করার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের সামরিক বাহিনী। গতকাল দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কমান্ডের একজন মুখপাত্র বলেন, দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় ইরানের শক্তিশালী বাহিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে ‘পূর্ণ বিজয় না আসা পর্যন্ত’ লড়াই চলবে। যদিও ‘পূর্ণ বিজয়’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হয়েছে, তা স্পষ্ট করেননি তিনি।

তবে এ ঘোষণা ঘিরেই ইসরায়েলে দফায় দফায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে তেহরান। তেল আবিবের বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে বিমানে হামলার দাবি করছে ইরান। দেশটির সেনাবাহিনীর দাবি, গতকাল ভোর থেকে তারা ড্রোন ব্যবহার করে বিমানবন্দরের রিফুয়েলিং এয়ারক্রাফটগুলোয় হামলা চালিয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দরের নিকটবর্তী সামরিক ও অ্যারোস্পেস শিল্প এলাকা এবং হাইফাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। আর ইসরায়েল বলছে, ইরানের সাত দফা হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তেল আবিব ও ডিমোনা শহর। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গত ২৫ দিনে তাদের ৪ হাজার ৮২৯ নাগরিক আহত হয়েছে বলেও দাবি ইসরায়েলের।

ইরানের নতুন নিরাপত্তা প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন মোহাম্মদ বাকের জোলকাদর। ইসরায়েলের হামলায় নিহত আলী লারিজানির স্থলাভিষিক্ত হলেন তিনি। ইরানের প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ এ কথা জানিয়েছে।

সংঘাত নিরসনে নতুন করে কূটনৈতিক উদ্যোগ নিয়ে সামনে এসেছে পাকিস্তান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে মধ্যস্থতায় এগিয়ে আসার ইঙ্গিত দিয়েছে দেশটি। সম্ভাব্য আলোচনার ভেন্যু হিসেবে বিবেচনায় রয়েছে ইসলামাবাদ। গতকাল সন্ধ্যায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ লেখেন, শান্তি ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে সংলাপের চলমান প্রচেষ্টাকে পাকিস্তান স্বাগত জানায় এবং পূর্ণ সমর্থন করে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্মতি থাকলে চলমান এ সংকটের চূড়ান্ত সমাধানের জন্য অর্থবহ ও চূড়ান্ত আলোচনার আয়োজন করতে পাকিস্তান প্রস্তুত আছে ও সম্মানিত বোধ করবে।

এছাড়া পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আনদ্রাবি আল জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের বিবদমান সব পক্ষ চাইলে সমঝোতামূলক সমাধানের লক্ষ্যে ইসলামাবাদ আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত। কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানোর মাধ্যমে একটি সমঝোতার পথ তৈরির চেষ্টা চলছে।

চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সঙ্গে ফোনালাপে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে যত দ্রুত সম্ভব শান্তি আলোচনা শুরুর সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে এমনটি বলা হয়েছে। ওয়াং ই বলেন, ‘আলোচনা সব সময় যুদ্ধের চেয়ে ভালো। উত্তেজনাপূর্ণ সব বিষয় কথা বলার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়।’

আরাগচি চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে এ সময় জানান, ইরান শুধু অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি নয়, সামগ্রিকভাবে সংঘাতের অবসান ঘটানোর বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

ইরানে হামলা চালিয়ে যেতে অবশ্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে চাপ দিচ্ছেন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। এক্ষেত্রে তার যুক্তি হচ্ছে, মার্কিন-ইসরায়েলি সামরিক অভিযান মধ্যপ্রাচ্যকে পুনর্গঠনের এক ‘ঐতিহাসিক সুযোগ’ সুযোগ এনে দিয়েছে।

এ বিষয়ে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস তাদের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, গত সপ্তাহে বেশ কয়েকবার ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে সৌদি যুবরাজের। সৌদি যুবরাজ যুক্তি দিয়েছেন, ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি হুমকির মুখে রেখেছে, যা ইরান সরকারকে নির্মূলের মাধ্যমে দূর করা যেতে পারে। তবে সৌদি কর্মকর্তারা যুবরাজের এমন অবস্থানের কথা অস্বীকার করেছেন।

ইরানের সঙ্গে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন যখন আলোচনার পথ খুঁজছে, ঠিক তখনই মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের সামরিক শক্তি আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সেখানে আরো কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা পাঠানো হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুই ব্যক্তি বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষায়িত ‘৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশন’-এর কয়েক হাজার সেনাকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হবে। তবে এ সেনাদের ঠিক কোন দেশে মোতায়েন করা হবে এবং তারা কবে নাগাদ সেখানে পৌঁছবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানাননি তারা।

ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে কৌশল বদলের মতো সামরিক অবস্থানেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধকালীন অভিযানে অংশ নেয়া যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম বিমানবাহী রণতরী ইউএস জেরাল্ড আর ফোর্ডকে সোমবার গ্রিসের ক্রিট দ্বীপের একটি নৌঘাঁটিতে ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। এ পদক্ষেপকে কেউ কেউ উত্তেজনা প্রশমনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন, আবার অন্যদের মতে এটি কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের অংশ হতে পারে।

এদিকে সংঘাতের বিস্তার ঘটেছে ইরাকেও। সেখানে একটি বিমান হামলায় অন্তত ১৫ জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। স্থানীয় সূত্রগুলো এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছে, যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।