গত কয়েক দিনের লাগাতার বিমান হামলা, ড্রোন আক্রমণ ও স্থলযুদ্ধের পর পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে বর্তমান অবস্থাকে ‘পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ২০২১ সালে আফগানিস্তানে তালেবান ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিবেশী এ দুই দেশের মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় এবং রক্তক্ষয়ী সামরিক সংঘাত। খবর এপি, বিবিসি, আল জাজিরা ও রয়টার্স।
বৃহস্পতিবার রাত থেকে শুরু হওয়া এ সংঘর্ষ গত দুইদিনে আরো তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ সাফ জানিয়েছেন, পাকিস্তানের ধৈর্যের সীমা এখন শেষ পর্যায়ে এবং তারা সরাসরি যুদ্ধে নামতে বাধ্য হয়েছেন। ফলে গত অক্টোবরে কাতারের মধ্যস্থতায় হওয়া ভঙ্গুর একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তির চূড়ান্ত অবসান ঘটল।
কেন এ রক্তক্ষয়ী সংঘাত?
এ সংঘাতের মূলে রয়েছে আন্তঃসীমান্ত জঙ্গিবাদ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ। পাকিস্তান সরকার বারবার অভিযোগ করে আসছে, আফগান তালেবান প্রশাসন নিষিদ্ধ সংগঠন ‘তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান’ (টিটিপি)-কে আশ্রয় দিচ্ছে। ইসলামাবাদের দাবি, টিটিপি আফগানিস্তানের ভূখণ্ডকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানে বড় ধরনের আত্মঘাতী হামলা ও নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। সম্প্রতি ইসলামাবাদে একটি মসজিদে বোমা হামলায় ৩০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যুর পর পাকিস্তান চরম কঠোর অবস্থান নেয়।
অন্যদিকে কাবুলের তালেবান সরকার এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, আফগানিস্তানের সীমানা কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দেয়া হয় না। বরং পাকিস্তানের বিমান হামলায় নিরপরাধ বেসামরিক নাগরিক ও শিশু নিহত হওয়ার প্রতিবাদেই তারা পাল্টা আক্রমণ শুরু করেছে।
আকাশপথে হামলা ও বর্তমান অবস্থা
লড়াই শুরুর পর পাকিস্তান বিমান বাহিনী আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলসহ কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে নজিরবিহীন বিমান হামলা চালিয়েছে। বিশেষ করে তালেবানদের প্রধান ঘাঁটি কান্দাহারে এর আগে পাকিস্তান কখনো এভাবে সরাসরি আক্রমণ চালায়নি।
পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার দাবি করেছেন, গত কয়েক দিনের অভিযানে ৩৩১ জনেরও বেশি আফগান সেনা নিহত হয়েছে। এছাড়া আফগানিস্তানের শতাধিক সামরিক পোস্ট ও বিপুল পরিমাণ যুদ্ধযান ধ্বংস করার দাবি করেছে ইসলামাবাদ। তবে তালেবান সরকার এ সংখ্যাকে বাড়িয়ে বলা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, লড়াইয়ে পাকিস্তানের অন্তত ৫৫ জন সৈন্য নিহত হয়েছে এবং বেশকিছু পাকিস্তানি সেনাকে তারা আটক করেছে। তবে নিরপেক্ষ কোনো সূত্র থেকে হতাহতের প্রকৃত সংখ্যা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মানবিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে সাধারণ মানুষ। সীমান্তে বসবাসকারী হাজার হাজার পরিবার এখন ভিটেমাটি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ছুটছে। তোরখাম সীমান্ত পয়েন্ট বন্ধ থাকায় শত শত শরণার্থী সেখানে আটকা পড়ে মানবেতর জীবন যাপন করছে। রমজান মাসে খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকটে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
অক্টোবর থেকে দুই দেশের বাণিজ্য বন্ধ থাকায় আফগানিস্তানে জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। এছাড়া কয়েক লাখ আফগান শরণার্থীকে পাকিস্তান থেকে বের করে দেয়ার সিদ্ধান্তের ফলে মানবিক বিপর্যয় আরো প্রকট হয়েছে। বছরের পর বছর পাকিস্তানে থাকা আফগানরা এখন নিজের দেশে ফিরতে গিয়ে সরাসরি কামানের মুখে পড়ছে।
আন্তর্জাতিক উদ্বেগ
পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের এ সংঘাত দক্ষিণ এশিয়ায় বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), চীন ও রাশিয়া অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনার টেবিলে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। কাতার, তুরস্ক ও সৌদি আরব পুনরায় মধ্যস্থতা করার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে পাকিস্তান আপাতত কোনো আলোচনায় বসতে রাজি নয়। যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বললেও পরিস্থিতি যেন নিয়ন্ত্রণের বাইরে না যায়, সে বিষয়ে সতর্ক করেছে।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আফগান তালেবানরা এখন পাকিস্তানের মিরানশাহ ও স্পিনওয়াম এলাকায় ড্রোন হামলা শুরু করেছে। বান্নু এলাকায় একটি মসজিদে ড্রোনের আঘাতে বেশকিছু সাধারণ মানুষ আহত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের সেনাবাহিনীই সীমান্তে উচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে এবং লড়াই এখনো থামার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।










