পরিস্থিতি বলছে, ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণের পর এই প্রথমবারের মতো অঞ্চলটিতে এত বিপুল যুদ্ধশক্তি একত্র হতে যাচ্ছে। অনেকে আবার ধারণা করছে, ইরানি শাসন ব্যবস্থাকে তাদের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কোনো চুক্তিতে রাজি করানোর কৌশলগত চাপও হতে পারে এটি। আমেরিকার উপসাগরীয় আরব মিত্ররা এরই মধ্যে সতর্ক করেছে যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো হামলা অনাকাঙ্ক্ষিত ও অপ্রত্যাশিত পরিণতি ডেকে আনতে পারে, যার পরিণতি প্রভাবিত করবে পুরো বিশ্বকে।
নিখুঁত সামরিক হামলা—সীমিত বেসামরিক ক্ষয়ক্ষতি ও গণতন্ত্রিক পরিবর্তন
যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ও নৌবাহিনী সীমিত ও সুনির্দিষ্ট হামলা চালাতে পারে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের (আইআরজিসি) সামরিক ঘাঁটি, আইআরজিসি নিয়ন্ত্রিত আধাসামরিক বাহিনী ‘বসিজ ইউনিট’, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে। ফলে এরই মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়া শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে এবং ধীরে ধীরে একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় রূপান্তরিত হবে।
টেকসই শাসন ব্যবস্থা, পরিমিত নীতি ব্যবস্থা
এটিকে ‘ভেনিজুয়েলা মডেল’ বলা যায়, যেখানে দ্রুত মার্কিন পদক্ষেপ শাসন ব্যবস্থা অক্ষত রাখে, তবে নীতিতে পরিবর্তন আনে। ইরানের ক্ষেত্রে ইসলামিক রিপাবলিক টিকে থাকবে, যা অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না, কিন্তু বাধ্য হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সহিংস ‘মিলিশিয়া’ সমর্থন কমাবে, অভ্যন্তরীণ পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করবে এবং বিক্ষোভ দমন শিথিল করবে। এটি অপেক্ষাকৃত কম সম্ভাব্য। ৪৭ বছর ধরে ইসলামিক রিপাবলিক পরিবর্তনের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ৮০ বছর বয়সী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির এ নীতিগত পরিবর্তনে সায় দেয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।
শাসনতন্ত্রের পতন, সামরিক শাসনের আবির্ভাব
অনেক বিশ্লেষকের মতে, এটিই সবচেয়ে সম্ভাব্য ফলাফল। শাসনতন্ত্র বহু মানুষের কাছে অজনপ্রিয়, বছরের পর বছর বিক্ষোভ তা দুর্বল করেছে, তবুও শক্তিশালী নিরাপত্তা কাঠামো, বিশেষ করে আইআরজিসি ইরানে এখনো বিদ্যমান। এতদিন বিক্ষোভ ব্যর্থ হয়েছে, কারণ ক্ষমতাসীনদের মধ্যে বড় কোনো ফাটল ধরেনি এবং তারা ক্ষমতা ধরে রাখতে সীমাহীন শক্তি ব্যবহার করতে প্রস্তুত। যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হলে ইরান শেষ পর্যন্ত আইআরজিসি নেতৃত্বাধীন শক্তিশালী সামরিক সরকারের অধীনে চলে যেতে পারে।
ইরানের পাল্টা হামলা—লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র, প্রতিবেশী আরব ও ইসরায়েল
ইরান এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছে, হামলা হলে তারা পাল্টা হামলা করবে। ‘তাদের আঙুল ট্রিগারে’ এবং আয়াতুল্লাহ খামেনি জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘চপেটাঘাত’ করা হবে। যদিও ইরান সরাসরি মার্কিন নৌ-বিমানশক্তির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারবে না। তারা গুহা, ভূগর্ভস্থ ঘাঁটি ও পাহাড়ে লুকানো ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন দিয়ে আঘাত হানতে পারে এবং ইরান চাইলে মার্কিন হামলায় সহযোগী দেশগুলোর গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও লক্ষ্য করতে পারে, যেমন জর্ডান বা ইসরায়েল।
উপসাগরে ইরানের মাইন, ঝুঁকিতে বিশ্ব বাণিজ্য
ইরান-ইরাক যুদ্ধ (১৯৮০-৮৮) ইরান নৌপথে মাইন বসিয়েছিল, যা ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির সাহায্যে অপসারণ করা হয়েছিল। সেই সময় থেকে এটি বৈশ্বিক জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহে বড় ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। সরু হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্ট; প্রতি বছর বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ এলএনজি রফতানি এবং ২০-২৫ শতাংশ তেল এ প্রণালির মাধ্যমে যায়। তাই এবারো মাইন বসিয়ে হামলার পরিকল্পনা করলে বিশ্ব বাণিজ্য ও তেলের দামে এর প্রভাব পড়বে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হবে ইরানের নিজস্ব অর্থনীতিতে, কারণ তাদের রাজস্বের বড় অংশ আসে তেল রফতানি থেকে।
ইরানের পাল্টা হামলায় মার্কিন যুদ্ধজাহাজের ভরাডুবি
উপসাগরে মার্কিন যুদ্ধজাহাজের একজন ক্যাপ্টেন বলেছেন, ইরানের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো ‘স্বর্ম আক্রমণ’, যেখানে বিপুলসংখ্যক বিস্ফোরক ড্রোন ও দ্রুতগতির ‘টর্পেডো নৌকা’ একযোগে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছোড়া হয়, যা মার্কিন নিকটবর্তী প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকেও সবসময় ঠেকাতে পারে না। কোনো মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ডুবে গেলে বা নাবিক বন্দি হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বিরাট অপমান হবে। তাই আসন্ন কয়েক সপ্তাহে ‘ইউএসএস জেরাল্ড আর ফোর্ড’ ভূমধ্যসাগর অতিক্রম করে উপসাগরে পৌঁছালে যুক্তরাষ্ট্রের দুটি ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ মোতায়েন থাকবে।
শাসনতন্ত্রের পতনে সর্বব্যাপী বিশৃঙ্খলা
এটি একটি বাস্তব ও গুরুতর আশঙ্কা। বিশেষ করে কাতার ও সৌদি আরবের মতো প্রতিবেশীদের জন্য। সিরিয়া, ইয়েমেন ও লিবিয়ার মতো গৃহযুদ্ধের ঝুঁকি ছাড়াও জাতীয় ক্ষমতাশূন্যতার সুযোগে কুর্দি, বালুচ, আজারবাইজানি ও অন্যান্য সংখ্যালঘু সশস্ত্র উত্তেজনায় লিপ্ত হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশ ইসলামিক রিপাবলিকের অবসান দেখার আশায় আছে, বিশেষ করে ইসরায়েল, যারা এরই মধ্যে ইরানের প্রক্সি গোষ্ঠীর ওপর বড় আঘাত হেনেছে এবং পারমাণবিক কর্মসূচিকে হুমকি মনে করে। কিন্তু প্রায় ৯ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যার দেশটি যদি বিশৃঙ্খলায় পড়ে, তা মানবিক বিপর্যয় ও শরণার্থী সংকট ডেকে আনতে পারে।
বিবিসি অবলম্বনে আনিকা চৌধুরী প্রিয়ন্তি










