এক সময় বিখ্যাত পর্যটনকেন্দ্র ও ঐতিহ্যবাহী স্থান হিসেবে পরিচিত ষোড়শ শতাব্দীর টিবেলে রাজপ্রাসাদের দেয়ালগুলো কাসেনা জনগোষ্ঠীর চিন্তা, সংস্কৃতি ও ধর্মের জীবন্ত ক্যানভাস। দেয়ালগুলোয় কাদা ও রঙে লেখা থাকত তাদের হৃদয়ের ভাষা। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকার চারটি স্থানের একটি—দক্ষিণ বুরকিনা ফাসোর এই স্থাপনা এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। তার ওপর আধুনিক স্থাপনা দখল করছে ঐতিহ্যবাহী এসব বাড়িঘরের স্থান। টিবেলের তরুণ বাসিন্দা আবদু আনে বলেন, ‘এখনকার দিনে লোহার ছাউনি ও সিমেন্টের ঘর বানানো অনেক সহজ।’

অনেক বছর ধরে বুরকিনা ফাসোর একটি অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র ছিল টিবেলে। কিন্তু ২০১৫ সাল থেকে দেশটিতে শুরু হওয়া জিহাদি সহিংসতা পর্যটকদের আগমন বাধাগ্রস্ত করছে। স্থানীয়রা জানান, টিবেলেতে পৌঁছানোর জন্য পর্যটকদেরকে নাজিনন নামক একটি সেতু পার হতে হয়, যা কিছুদিন আগে হামলার শিকার হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা এখন সাধারণ হয়ে উঠেছে। যদিও বর্তমানে এটি কঠোর সামরিক নজরদারিতে থাকে, তবুও পর্যটকদের মধ্যে এ নিয়ে আশঙ্কা থেকেই যায়।

্্ে্ম

ছবি— দ্য গার্ডিয়ান

আরো এক বড় সংকট তৈরি করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টিবেলের বাড়িগুলোর দেয়ালে রঙ করার আগে তা সম্পূর্ণ শুকিয়ে নিতে হয়। কিন্তু এখন বৃষ্টির কোনো ঠিক নেই। যেকোনো সময় হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। প্লাস্টিকের চাদর দিয়েও রক্ষা মেলে না। ফলে এগুলো রং করা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় এক বাসিন্দা বলেন, আগে মার্চ-এপ্রিলে ‘আমের বৃষ্টি’ হতো একবার। এখন সেই সময়ে তিন-চারবার বৃষ্টি হয়। কিছু গাছ ফল দিচ্ছে না—যে কাঠ দিয়ে আমরা ঘর বানাতাম। অনিয়মিত বৃষ্টিতে বয়স্করা সবচেয়ে বেশি চিন্তিত। আবার আগস্টে বৃষ্টি নেই—এমন আগে কখনো হয়নি।

স্থানীয় শিল্পীরা জানান, খড়ের অভাবে ছাদ বানানো কঠিন হয়ে পড়েছে। বাতাসে অনেকের ঘরের ছাদ উড়ে গেছে। পুরুষরা কাঠামো বানানোর দায়িত্ব নেন, মাটি, খড় ও গাছের গুঁড়ি দিয়ে এক মাসে তৈরি হয় ঘর। কিন্তু রাসায়নিকের প্রভাবে মাটি দুর্বল হয়ে পড়ছে, বাড়িগুলো আগের মতো টেকসই থাকছে না।

কাসেনা সংস্কৃতিতে নারীরাই বাড়ির দেয়াল রঙ করেন। স্থানীয়ভাবে পাওয়া ল্যাটারাইট পাথর, কাদামাটি, বেসাল্ট, গরুর গোবর দিয়ে তৈরি রঙে আঁকা হয় নকশা। ‘নিরে’ গাছের ফল জ্বাল দিয়ে ফুটিয়ে বানানো বার্নিশে নকশাগুলো স্থায়ী করা হয়।

্্ে্ম্্

ছবি— দ্য গার্ডিয়ান

স্থপতি ফ্রান্সিস কেরে জানান, কাসেনাদের প্রাকৃতিক উপাদান দিয়ে প্রচণ্ড তাপ ও ভারী বৃষ্টির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কৌশল তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। বাড়ির আকৃতিতেও রয়েছে সামাজিক অর্থ—গোলাকার ঘর অবিবাহিত পুরুষদের, ইংরেজি ‘৮’ আকৃতির ঘর বয়স্ক নারী ও অবিবাহিত মেয়েদের, আয়তাকার ঘর নবদম্পতির জন্য।

অনেক বাড়ির প্রবেশপথ ইচ্ছাকৃতভাবে ছোট, যাতে পশু ঢুকতে না পারে এবং আক্রমণকারীকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পড়তে হয়। ছাদের নকশা শস্য শুকানোর উপযোগী। দেয়ালের সাপের নকশা কাসেনাদের সাংস্কৃতিক রক্ষক আত্মার প্রতীক—যা বছরে একবার আসে।

জলবায়ু সংকট সাহেল অঞ্চলে দ্রুত আঘাত হানছে। অথচ প্রতিরোধের মতো সম্পদ সেখানে নেই। বিশ্বের মোট গ্রিনহাউস গ্যাসের মাত্র ১ শতাংশ নির্গমন করেও সাহেল দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ভুগছে। এখানকার তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় দেড় গুণ দ্রুত বাড়ছে। বুরকিনা ফাসোর ৮০ শতাংশ মানুষ এখনো কৃষি ও ভূমিনির্ভর জীবিকা ধরে রেখেছে।

সূত্র— দ্য গার্ডিয়ান