গাজায় যুদ্ধের আগে লাইটার ছিল নিত্যদিনের অতি সাধারণ ও সস্তা জিনিস। এটি এতটাই সহজলভ্য ছিল যে, রাবাব দেইফাল্লাহর মনে আছে, এক শেকেলে তিনটি লাইটার কিনতেন তিনি। কিন্তু এখন সেই লাইটারই হয়ে উঠেছে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের অন্যতম মূল্যবান সামগ্রী। খবর আল জাজিরা।

৪৬ বছর বয়সী রাবাব গাজায় নিজের তাঁবুর ভেতর একটি পুরনো, ক্ষয়ে যাওয়া লাইটার দিয়ে বারবার চেষ্টা করেও আগুন না জ্বালাতে ব্যর্থ হন। নতুন লাইটার কেনা কঠিন হয়ে পড়ায় তার ছেলে কয়েকবার সেটি মেরামত করেছেন। সম্প্রতি পুরনো লাইটারটি ঠিক করাতেই তার খরচ হয়েছে ১২ ডলার।

তিনি আল জাজিরাকে বলেন, আমাদের পুরো দৈনন্দিন জীবন আগুনের ওপর নির্ভর করে। আর আগুন জ্বালানো শুরু হয় একটি লাইটার দিয়ে। গাজায় এখন এ ছোট্ট জিনিসটিই খুঁজে পাওয়া সবচেয়ে কঠিন।

ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধ শুরুর আগে লাইটারের দাম ছিল সামান্য। এখন একটি নতুন লাইটারের দাম ২৭ থেকে ৩৩ ডলার পর্যন্ত উঠেছে।

লাইটারের জন্য প্রতিবেশীর দ্বারস্থ

খাবারের পেছনেই সীমিত অর্থ ব্যয় করতে চান গাজার পরিবারগুলো। তাই একটি লাইটার এখন অনেক সময় একাধিক পরিবারের মধ্যে ভাগাভাগি করে ব্যবহার করা হয়। কোনো দিন রাবাবের লাইটার জ্বলে না উঠলে পরিবারকে ঠান্ডা খাবার খেয়ে থাকতে হয়। কখনো প্রতিবেশীর আগুন জ্বালানোর অপেক্ষায় থাকতে হয়।

আগুন সংগ্রহ করতেও তৈরি হয়েছে অদ্ভুত এক ব্যবস্থা। রাবাব কখনো কার্ডবোর্ডের টুকরো প্রতিবেশীর কাছে পাঠান। সেটিতে আগুন ধরিয়ে আবার তা নিজের তাঁবুতে নিয়ে আসেন। কোনো প্রতিবেশী রুটি বানালে তার চুলায় নিজের খাবার রান্নার অনুরোধও করেন তিনি।

একই সংকটে আছেন ৪৩ বছর বয়সী হাসনা মনসুর। জাবালিয়া শরণার্থীশিবির থেকে বাস্তুচ্যুত হাসনার স্বামী যুদ্ধের আগে দর্জির কাজ করতেন এবং পরিবার মোটামুটি স্বচ্ছল ছিল। এখন কাজের অভাবে ছয় সন্তানকে নিয়ে সংসারের ব্যয় মেটাতে হাসনা খাবার বিক্রি করেন। কিন্তু সেই কাজও থমকে যায় লাইটারের অভাবে।

হাসনা বলেন, গ্যাস থাকলে একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গই যথেষ্ট। কিন্তু মাটির চুলায় আগুন ধরাতে হলে আগুন দরকার। একদিন সকাল ১০টা পর্যন্ত চুলায় আগুন জ্বালাতে পারেননি তিনি। মেয়েকে কার্ডবোর্ড নিয়ে আশপাশে আগুন খুঁজতে পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু সেদিন কোনো প্রতিবেশীর কাছেও আগুন পাওয়া যায়নি।

নিষেধাজ্ঞা ও সংকটে আরো দুর্লভ লাইটার

গাজায় লাইটারের এই সংকট পণ্য প্রবেশে বিধিনিষেধ ও দীর্ঘস্থায়ী ঘাটতির মধ্যেই তৈরি হয়েছে। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) জানিয়েছে, পণ্য পরিবহনে বিধিনিষেধ ও সীমান্তপথ বন্ধ থাকার কারণে প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট এবং মূল্যবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। কিছু পণ্য গাজায় প্রবেশেও অতিরিক্ত অনুমোদনের প্রয়োজন হয়।

গাজা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের প্রথম পাঁচ মাসে ৩০ হাজারের বেশি ট্রাক গাজায় প্রবেশ করেছে। তবে দৈনিক গড়ে ১৯১টির বেশি ট্রাক ঢোকেনি—যা যুদ্ধের আগের দৈনন্দিন চাহিদার তুলনায় অনেক কম।

এ পরিস্থিতিতে লাইটারও দুর্লভ পণ্যে পরিণত হয়েছে। তাই নতুন লাইটার কেনার সামর্থ্যের চেয়ে পুরনোটি মেরামত করাই এখন অনেক পরিবারের কাছে বাস্তবসম্মত।

একটি লাইটার, বহু তাঁবুর জীবন

গাজা সিটির পশ্চিমে আল-কারমেল স্কুলে আশ্রয় নেয়া বাস্তুচ্যুত শাদি আবু শামলাহ বলেন, পুরো স্কুলে লাইটার রয়েছে মাত্র চারটির মতো।

তিনি বলেন, আজ লাইটারই জীবনের মেরুদণ্ড। আপনার তাঁবুতে একটি লাইটার থাকলে আপনি ঠিক আছেন। না থাকলে আপনি আটকে গেলেন।

লাইটার মেরামতের খরচও কম নয়। একটি লাইটারের ফ্লিন্টের দাম ২৫ থেকে ৩০ শেকেল, অর্থাৎ প্রায় ৮ থেকে ১০ ডলার। অনেকে বড় গ্যাস সিলিন্ডার থেকে গ্যাস নিয়ে ছোট লাইটার পুনরায় ভরার চেষ্টা করছেন। এতে কখনো আগুনে পুড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

যুদ্ধ তৈরি করেছে নতুন পেশা

লাইটারের সংকটের মধ্যে নতুন পেশা বেছে নিয়েছেন ২৪ বছর বয়সী দুই সন্তানের বাবা তামের আল-শাওয়িশ। যুদ্ধের আগে তিনি গাড়িচালক ছিলেন। এখন আল-কারমেল স্কুলের কাছে ছোট একটি দোকানে লাইটার মেরামত করেন।

তিনি জানান, যুদ্ধ আমাদের এমন কাজ করতে বাধ্য করেছে, যেসব কাজের কথা আমরা আগে কখনো জানতাম না। পরিবারের প্রয়োজন মেটাতেই লাইটার মেরামত শুরু করেছি।

যুদ্ধের আগে লাইটার নষ্ট হলে মানুষ সেটি ফেলে দিয়ে নতুনটি কিনত। এখন ভাঙা লাইটারও মূল্যবান। গাজার এ বাস্তবতায় তাই একটি সাধারণ লাইটার আর নিছক একটি ছোট গৃহস্থালি সামগ্রী নয়।