দীর্ঘদিনের অবরোধ ও ভয়াবহ যুদ্ধের কারণে গাজার অর্থনীতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এ প্রতিকূল পরিবেশে তরুণ প্রজন্মের অধিকাংশেরই কোনো স্থায়ী কর্মসংস্থান নেই। অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাওয়া এবং উৎপাদনশীল খাতগুলো অচল হয়ে পড়ায় গাজার তরুণরা এখন টিকে থাকার জন্য প্রচলিত পেশার বাইরে গিয়ে নতুন ও উদ্ভাবনী সমাধানের দিকে ঝুঁকছেন। খবর আল জাজিরা।
ফিলিস্তিনি পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, গাজা উপত্যকায় বর্তমানে বেকারত্বের হার প্রায় ৬৯ শতাংশ। তবে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মধ্যে এ চিত্র আরো ভয়াবহ, যেখানে বেকারত্বের হার প্রায় ৮০ শতাংশে পৌঁছেছে। গাজার মোট জনসংখ্যার ৭০ শতাংশই এ বয়সের তরুণ। যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে গাজার জিডিপি বা মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ৮২ শতাংশের বেশি হ্রাস পেয়েছে। ফলে হাজার হাজার উচ্চশিক্ষিত তরুণের জন্য পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়ার পথ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
এমনই একজন ২৪ বছরের তরুণী হালা মোহাম্মদ আল-মাগরাবি। ২০২৩ সালে নার্সিং পাসের পর তিনি দুই বছর স্বাস্থ্যখাতে স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করেছেন এ আশায়, একদিন তার স্থায়ী চাকরি হবে। কিন্তু দিন দিন নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী হওয়ায় এবং স্থায়ী কোনো আয়ের ব্যবস্থা না থাকায় দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। হালা বলেন, স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করলে তো আর ঘর চলে না। মৌলিক চাহিদা মেটানোর জন্য এ কাজের ওপর নির্ভর করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
বাধ্য হয়ে হালা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ও পড়াশোনার বিষয় পরিবর্তন করেন। তিনি সোশ্যাল মিডিয়া মার্কেটিং ও ই-কমার্সের ওপর কোর্স করেন এবং অনলাইনে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে তিনি অনলাইনের মাধ্যমে যা আয় করছেন, তা দিয়ে কোনোমতে নিজের দৈনন্দিন খরচ মেটাচ্ছেন। তার মতো হাজারো গ্র্যাজুয়েট এখন প্রথাগত পেশা ছেড়ে টিকে থাকার তাগিদে ডিজিটাল প্লাটফর্ম বা অন্য কোনো অপ্রচলিত কাজ বেছে নিচ্ছেন।
সংকট কেবল সাধারণ চাকরিপ্রার্থীদের নয়, ব্যবসায়ীদেরও পথে বসিয়ে দিয়েছে। মোহাম্মদ আল-হাজ নামে এক ব্যবসায়ী জানান, তার গুদাম ও মালামাল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তিনি তার বাড়ির একটি অংশকে ছোট একটি ওয়ার্কস্পেসে রূপান্তর করেছেন। সেখানে ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটের তীব্র সংকটের এ সময়ে শিক্ষার্থী ও প্রকৌশলীরা যাতে অনলাইনে পরীক্ষা দিতে পারেন বা কাজ করতে পারেন, তার ব্যবস্থা করে তিনি নিজের আয়ের পথ তৈরি করেছেন।
অন্যদিকে, জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে উদ্ভাবনী পথ বেছে নিয়েছেন আহমেদ ফারেস আবু জায়েদ। তার বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানটি জ্বালানি সংকটে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হলে, তারা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক পুড়িয়ে জ্বালানি তৈরির পদ্ধতি বের করেন। এ উদ্ভাবন কেবল তার ব্যবসাকেই বাঁচায়নি, বরং অনেক তরুণের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ করে দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গাজার তরুণদের এ উদ্ভাবনী প্রচেষ্টা কোনো শৌখিন উদ্যোগ নয়, বরং এটি তাদের টিকে থাকার মরণপণ লড়াই। অবরোধ ও যুদ্ধের ফলে প্রথাগত কাজের কাঠামো পুরোপুরি ভেঙে পড়ায় উদ্ভাবনই এখন তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।










