গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তির কৃতিত্ব দাবি করে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক উচ্ছেদ করার প্রস্তাব এ চুক্তিকে ভেস্তে দিতে পারে। ট্রাম্প গত সপ্তাহে বারবার বলেছেন, ‘গাজা থেকে সব মানুষ সরিয়ে নেয়া উচিত। তার এ প্রস্তাব মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে জাতিগত নিধনের শামিল। তাছাড়া তিনি ভূখণ্ডটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেয়া উচিত বলেও জানান।
বিশ্ব নেতারা সতর্ক করেছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ মধ্যপ্রাচ্যের পুরো অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবে। এরও আগে যে ঘটনা ঘটতে পারে, ট্রাম্পের মন্তব্য গাজায় দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে।
জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের জাস্টিস অ্যান্ড পিস প্রোগ্রামের প্রভাষক জশ রুবনার বলেন, ‘গাজা থেকে ২০ লাখেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে সরিয়ে নিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের বিস্ময়কর দাবি যুদ্ধবিরতি অব্যাহত রাখার জন্য মারাত্মকভাবে হুমকিস্বরূপ। ফিলিস্তিনিদের জাতিগত নিধন কোনো যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে ছিল না। ট্রাম্প এ প্রস্তাব দেয়ার মাধ্যমে এরই মধ্যে নাজুক শান্তি প্রক্রিয়াকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।’
যুদ্ধবিরতি ১৯ জানুয়ারি কার্যকর হয় ট্রাম্পের দ্বিতীয় দফায় দায়িত্ব গ্রহণের একদিন আগে। তবে তিনি দাবি করেন, মধ্যপ্রাচ্য দূত স্টিভ উইটকফের নেতৃত্বে তার দলের প্রচেষ্টা এ চুক্তি বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। অভিষেক ভাষণে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতির কথা উল্লেখ করেন এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি শান্তি ও ঐক্যের নেতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
যুদ্ধবিরতি কার্যকর শুরু হওয়ার কয়েক দিন পর ট্রাম্প গাজাবাসীদের সরিয়ে নেয়ার প্রস্তাব দেন। প্রথমে এটি অতিরঞ্জিত মন্তব্য বলে মনে হলেও তিনি বারবার এর পুনরাবৃত্তি করতে থাকেন। এমনকি হোয়াইট হাউজে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বক্তৃতার সময়ও একই কথা বলেন তিনি। যুদ্ধবিরতি এখনো টিকে আছে, তবে ট্রাম্পের প্রস্তাব ভবিষ্যতের শান্তি প্রচেষ্টাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। বন্দি মুক্তি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের প্রথম দুটি ধাপ যুক্তরাষ্ট্র সম্পন্ন করতে চাইলেও ট্রাম্প প্রশাসন এখন গাজার পাঁচ বছরের পুনর্গঠন পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করে চুক্তি থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে।
মার্কিন কর্মকর্তারা ট্রাম্পের বক্তব্য কিছুটা নমনীয়ভাবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন। তারা বলছেন, গাজার জনগণকে ‘অস্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত’ করা হবে। তবে ট্রাম্প জোর দিয়েই বলেছেন যে ফিলিস্তিনিদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে গাজাকে যুক্তরাষ্ট্রের অধীনে নেয়া হবে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এ পরিস্থিতি যুদ্ধবিরতিকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করতে পারে। ট্রাম্প অবশ্য নিজেই ইঙ্গিত দিয়েছেন যে যুদ্ধ শিগগিরই আবার শুরু হতে পারে। যদিও তিনি যুদ্ধবিরতির কৃতিত্ব দাবি করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, তিনি শুধু স্বীকৃতি চান, প্রকৃত শান্তিতে আগ্রহী নন এবং যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়লে বা জাতিগত নিধনে রূপ নিলেও তার তাতে কোনো মাথাব্যথা নেই। এরই মধ্যে ইসরায়েলের অভিযানে প্রায় ৬২ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশ্লেষক খালেদ এলগিন্ডি বলেন, ‘দ্বিতীয় ধাপ অর্থাৎ স্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহার বাস্তবায়ন করা গাজায় জাতিগত নিধন ঠেকানোর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে ট্রাম্পের মন্তব্য পরিস্থিতিকে আরো অনিশ্চিত করে তুলছে। নেতানিয়াহু ট্রাম্পের সমর্থন নিয়ে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তার লক্ষ্য হচ্ছে বন্দিদের মুক্তি, হামাসকে ধ্বংস ও গাজাকে হুমকি হিসেবে দূর করা। তার জোট ভেঙে পড়তে পারে যদি যুদ্ধপন্থী মন্ত্রীরা সরে দাঁড়ান। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং ট্রাম্পও তাকে সমর্থন করবেন। ফলে সংঘাত পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি। -আল জাজিজা অবলম্বনে










