‘উত্তেজনা আমাদের ক্লান্ত করে দিয়েছে। এটা একটা মারাত্মক উত্তেজনা যেন মনে হচ্ছে মেরুদণ্ড ছুরির আঘাতে কেটে ফেলা হচ্ছে। আমাদের পা আর কাজ করবে না, আমাদের হাত কাঁপছে এবং পাগলামি দমন করতে করতে আমাদের শরীর পাতলা ঝিল্লির মত হয়ে গেছে, যখন তখন অনন্ত চিৎকারের একটি অনিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ হতে পারে। এখন আমাদের আর কোন মাংস নেই, অবশিষ্ট নেই কোন পেশীও।’

- Erich Maria Remarque এর ‘All Quiet on the Western Front’ থেকে। 

তুরস্কের সরাসরি কিছু বক্তব্য ব্যতিরেকে আর্মেনিয়া আজারবাইজান ইস্যুতে অন্যান্য বড় শক্তিগুলোর বড়সর কোন উল্লম্ফন লক্ষ্য করা যাচ্ছে না দেখে প্রথমে একটু হতচকিত হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। নাগোর্নো-কারাবাখ নিয়ে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ আর্মেনিয়া এবং মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ আজারবাইজানের মধ্যে সংঘর্ষ সর্বশেষ ব্যাপকতা লাভ করে গত সেপ্টেম্বরের ২৭ তারিখ থেকে। এখানে মনে রাখা উচিৎ এই অঞ্চল আন্তর্জাতিকভাবে আজারবাইজানের অংশ হিসেবে স্বীকৃত কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার হিসেবে জাতিগত আর্মেনিয়ানদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। অন্যান্য তুলনামূলক কম শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর মাঝে ভারতের সমর্থনের পাল্লা খানিকটা আরমেনিয়ার পক্ষে কেননা জম্বু-কাশ্মির সমসসায় আর্মেনিয়া বরাবরই ভারতের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে। গত বছর নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের এক প্রশ্নের জবাবে আর্মেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী নিকোল পাশিনিয়ান বলেন, ‘কাশ্মীর ইস্যুতে আমরা ভারতের অবস্থানকে পুরোপুরি সমর্থন করি এবং এটা আমাদের দৃঢ় অবস্থান।’ কিন্তু পরিষ্কার অবস্থান আমাদের এই পার্শ্ববর্তী দেশের পক্ষেও নেয়া সম্ভব হচ্ছে না কারণ উভয় দেশের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক রয়েছে। উত্তর-দক্ষিণ আন্তর্জাতিক পরিবহন করিডোর মুম্বাই থেকে চাবাহার আজারবাইযান হয়ে মস্কো যায়, যা ভারতের সংযোগ পরিকল্পনার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

অন্যান্য শক্তিগুলোর সঠিক অবস্থান প্রকাশের পিছনে আমার মনে হয় ন্যাটো (NATO- North Atlantic Treaty Organization) ও CSTO (Collective Security Treaty Organization) এর ভুমিকাই মুখ্য। আজারবাইজানের সমর্থক তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য অন্য দিকে আর্মেনিয়ার মিত্র রাশিয়া CSTO এর সদস্য। সিএসটিও একটি সামরিক জোট যা বাহ্যিক আগ্রাসনের অধীনে আসা যে কোন সদস্যের সম্মিলিত প্রতিরক্ষাকে নিশ্চিত করে। এছাড়াও এটি তার সদস্যদের সন্ত্রাসী হুমকি, অবৈধ মাদক পাচার এবং বহুজাতিক অপরাধের বিরুদ্ধে তাদের প্রতিহতকরণ প্রচেষ্টার সমন্বয় সাধনের চেষ্টা করে। 

সিএসটিও, ২০০২ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও এর শুরু ১৯৯২ সালের সম্মিলিত নিরাপত্তা চুক্তিতে। আর্মেনিয়া, কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, রাশিয়ান ফেডারেশন, তাজিকিস্তান, এবং উজবেকিস্তান চুক্তির প্রথম স্বাক্ষরকারী ছিল। আজারবাইজান, বেলারুশ এবং জর্জিয়া পরবর্তীতে ১৯৯৩ সালে চুক্তি স্বাক্ষর করে। আজারবাইজান, জর্জিয়া এবং উজবেকিস্তান ১৯৯৯ সালে সদস্যপদ প্রত্যাহার করে, কিন্তু উজবেকিস্তান ২০০৬ সালে পুনরায় যোগদান করে।

ন্যাটো, একটি সামরিক জোট যা ১৯৪৯ সালের ৪ঠা এপ্রিল উত্তর আটলান্টিক চুক্তি (ওয়াশিংটন চুক্তি নামেও পরিচিত) দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মধ্য ও পূর্ব ইউরোপে মোতায়েনকৃত সোভিয়েত সৈন্যদের অবস্থানের বিপরীতে এটি তৈরি হয়।

সামষ্টিক সুরক্ষা বা Collective Security ধারণাটি এখানে বেশ সহায়ক ভূমিকা পালন করছে বলে আপাত দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে সংঘাতের পরিধি ছড়িয়ে পরার হাত থেকে রক্ষা করতে।

সমমনোভাবাপন্ন একদল ব্যক্তি সত্তা সম্মিলিতভাবে তার নিরাপত্তা রক্ষায় স্বতন্ত্রভাবে বেশি কার্যকর, এই ধারণা যে  নতুন বা মৌলিক নয় এমনটাই মনে করেন Otto Pick ও Julian Critchley। তাদের বই ‘Collective Security’ তে তারা উল্লেখ করেন যে একের জন্য সবাই এবং সবার জন্য এক- যুক্তি এবং সাধারণ জ্ঞানের উপর ভিত্তি করে একটি সুস্পষ্ট বিবৃতি।

সংগঠিত সমাজের কথিত নিরাপদ পরিবেশে হবস যাকে বলেন- 'প্রকৃতির রাজ্য' থেকে মানুষের পলায়ন 'ক্রমাগত ভয় এবং সহিংস মৃত্যুর বিপদ' থেকে কিছুটা স্বস্তি এনে দিয়েছে, মানুষের জীবনের কিছু উন্নতি এসেছে 'নিঃসঙ্গ, দরিদ্র, জঘন্য, নিষ্ঠুর এবং সংক্ষিপ্ত' সত্ত্বা থেকেও। 

সামাজিক চুক্তির  তাত্ত্বিকরা (থমাস হবস, বারুখ স্পিনোজা, জ্যা জ্যাক রুসো এবং জন লক) নিরাপত্তার সমস্যা সমাধানের উদ্দেশ্যে তার সদস্যদের পক্ষ থেকে রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাকে এক ধরনের চুক্তি হিসেবে দেখেছেন। সমাজ নিজের জন্য নিরাপত্তা প্রদান করবে, এবং রাষ্ট্র-হবসের লেভিয়াথান- এই লক্ষ্যে একটি উপায় হবে। বিশেষ করে তাদের মধ্যে কেউ কেউ একটি সর্বশক্তিমান রাষ্ট্রের সাথে ব্যক্তির সম্পর্কের সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন, অন্যদিকে রুসো যুক্তি দেখিয়েছেন যে শুধুমাত্র 'সুশীল রাষ্ট্রের' মধ্যেই মানুষ সেই নৈতিক স্বাধীনতা অর্জন করবে যা তাকে নিজস্বতা তৈরিতেও সাহায্য করবে।

মিল্টন পল ডেভিসের মতে দুই আধুনিক রাজনৈতিক চিন্তাবিদ, অধ্যাপক ইমানুয়েল কান্ত এবং ডঃ উড্রো উইলসন, আধুনিক জোট এবং সমষ্টিগত নিরাপত্তা/প্রতিরক্ষাতাত্ত্বিক ধারণার প্রবর্তক। 

১৬২৯ সালে কার্ডিনাল ডি রিচেলিউ (১৫৮৫-১৬৪২) স্পেন সম্পর্কে একটি আলোচনার ক্ষেত্রে সমষ্টিগত নিরাপত্তা শব্দটি ব্যবহার করেন। স্বাভাবিকভাবেই, রিচেলিউ আজকের চেয়ে একটু ভিন্নভাবে শব্দটি ব্যবহার করছিলেন, যেহেতু তার সমষ্টিগত নিরাপত্তার ধারণা ছিল নিরাপত্তা বিষয়ে একসাথে কাজ করা, কিন্তু ফ্রান্সের তত্ত্বাবধানে, কিছু সম্পূর্ণ স্বাধীন আন্তর্জাতিক সংস্থার অংশ হিসেবে নয়, সম্ভবত ১৬২৯ সালের বিশ্বে তিনি রোমের পাপাসিদের কথা চিন্তা করছিলেন। ১৬৪৮ সালে শান্তি চুক্তি রচনা ও স্বাক্ষরের সময় ত্রিশ বছরের যুদ্ধের শেষে ফ্রান্সের প্রতিনিধিত্বকারী এবং পরোক্ষভাবে মৃত রিচেলিউ-এর প্রতিনিধিত্বকারী কার্ডিনাল মাজারিন মুনস্টার চুক্তিতে সম্মিলিত নিরাপত্তা সম্পর্কে বাক্য সন্নিবেশ করেন, যা ছিল ওয়েস্টফালিয়া শান্তির অংশ। এভাবে সমষ্টিগত নিরাপত্তার ধারণা তাত্ত্বিক মর্যাদা থেকে ওয়েস্টফেলিয়া শান্তির সাথে রাজনৈতিক অবস্থায় চলে যেতে শুরু করে। 

“Essentials of International” রচনায় Karen A. Mingst ও Ivan M. Arreguin-Toft বলেন যে সামষ্টিক নিরাপত্তার ধারণা হল- একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন সম্মিলিতভাবে পরাজিত করা উচিত কারণ একটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন সবার বিরুদ্ধে আগ্রাসন। 

ধারনাটির তত্তায়ন ছাড়াও এর প্রয়োগের উদাহরণ মধ্যযুগে দেখা যায়। ১৬৬৩ সালে সংকট ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ছাড়া এবং পুনরায় ১৬৮৩ সালে যখন তুর্কি সৈন্যরা রাজধানী ভিয়েনায় হাবসবার্গ সাম্রাজ্যকে হুমকি দেয়, তখন বিভিন্ন দেশের সৈন্যরা সম্মিলিতভাবে ভিয়েনাকে বাঁচাতে কাজ করে। ফ্রান্স ও ১৬৬৩ সালে অন্যদের সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্য এবং পোল্যান্ড; ১৬৮৩ সালে অন্যদের সঙ্গে রোমান সাম্রাজ্য এক ধরনের সমষ্টিগত নিরাপত্তা প্রয়োগ, যখন "ইউরোপের দরজায়" একটি সাধারণ প্রতিপক্ষের (মুসলিম শক্তি) ছিল। এটি মূলত অটোমান সাম্রাজ্য থেকে ইউরোপে আরো সম্প্রসারণ রোধে সহায়ক ভূমিকা রাখে।

সপ্তদশ শতাব্দী থেকে, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা প্রায় সম্পূর্ণভাবে জাতীয় টিকে থাকার চাহিদার দিক থেকে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। নিরাপত্তা মানে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা- বাহ্যিক আক্রমণ থেকে। এমনটাই মনে করে Commission on Global Governance। 

Adam Roberts ও Dominik Zaum রচিত Selective Security: War and the United Nations Security Council since 1945 এ বলা হয়েছে সাধারণ ভাবে, একটি আদর্শ সমষ্টিগত নিরাপত্তা ব্যবস্থায়, প্রতিটি রাষ্ট্র স্বীকার করে যে একজনের নিরাপত্তা সবার জন্য উদ্বেগের বিষয় সাথে সাথে তারা হুমকি ও শান্তি লঙ্ঘনের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া রোধের কার্যক্রমে যোগ দিতেও সম্মত হয়। 

আঞ্চলিক নিরাপত্তা কমপ্লেক্স সহযোগে শুধু আলোচ্য দুই বিবাদমান পক্ষই না, মোটামুটি সমগ্র মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তার ইস্যুটি সহজবোধ্য হবে বলে আশা করা যায়। University of World Economy and Diplomacy (Tashkent, Uzbekistan) এর সিনিয়র রিসার্চ ফেলো আকরাম উমারভের কাজ বেশ গোছানো। পরবর্তী অংশ মূলত তার লেখা থেকেই নেয়া। 

আকরাম উমারভের মতে খুব কম কাজই মধ্য এশিয়াতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে। উদাহরণস্বরূপ, আই বোবোকুলভ মধ্য এশিয়াতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক আইনি দিকগুলোর সমস্যার তদন্ত করে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কমপ্লেক্সের তত্ত্বের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি যুক্তি দেখান যে কোন অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলির সম্পর্ক আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়বস্তু নির্ধারণ করে, কিন্তু এই সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ এবং প্রতিকূল উভয় হতে পারে। তিনি আঞ্চলিক নিরাপত্তাকে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির লক্ষ্যের ঐক্যের স্বীকৃতি হিসেবে সংজ্ঞায়িত করেন যেখানে বিদ্যমান হুমকি, সমস্যা এবং স্বার্থ আঞ্চলিক নিরাপত্তা কমপ্লেক্স তত্ত্বের (আরএসসিটি) কাছাকাছি। 

জি. ইয়ুলদাশেভা যুক্তি দেখান যে কিছু তত্ত্ব বিশ্লেষণের বিভিন্ন স্তরে পরিচালিত হতে পারে, তত্ত্ব বিভিন্ন নির্ভরশীল চলক ব্যাখ্যা করতে সক্ষম। এই প্রেক্ষাপটে তিনি বাস্তবতা (নব্য বাস্তবতা), উদারনৈতিকতা (নব্য উদারনৈতিকতা), মার্কসবাদ (নব্য মার্কসবাদ) এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গবেষণায় গঠনবাদের গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব বিবেচনা করেন। তিনি মনে করেন যে মধ্য এশিয়ার ভূ-রাজনীতির বিভিন্ন উপাদানের মিথস্ক্রিয়া এবং পারস্পরিক নির্ভরশীলতার সুনির্দিষ্ট উপলব্ধি করার জন্য কাঠামোগত দৃষ্টিভঙ্গি মৌলিক। 


‘People, States, and Fear’ এ ব্যারি বুজান কর্তৃক আঞ্চলিক নিরাপত্তা কমপ্লেক্সের প্রদত্ত সংজ্ঞাটি নিম্নরূপ – একগুচ্ছ রাষ্ট্র যাদের প্রধান নিরাপত্তা উদ্বেগ তাদের এত ঘনিষ্ঠভাবে সংযুক্ত করে যে তাদের জাতীয় নিরাপত্তা একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে বিবেচনা করা যায় না। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সালে, ব্যারি বুজান এবং ওলে উইভার আরএসসি তত্ত্বের সংজ্ঞায় সংশোধন করেছেন, যাতে পূর্ববর্তী সংস্করণের রাষ্ট্রকেন্দ্রিক এবং সামরিক-রাজনৈতিক অভিমুখ এড়ানো যায় এবং বিভিন্ন কর্মক এবং নিরাপত্তা খাতের কথা বিবেচনা করার সম্ভাবনা বিবেচনা করার সুযোগ দেওয়া হয় – যা একটি সেট যার প্রধান নিরাপত্তা। স্টিফেন ওয়াল্ট ‘The Origins of Alliances’ বইয়ে আরো জোর দিয়েছেন, ভৌগলিক নৈকট্য বিভিন্ন অঞ্চলে অবস্থিত রাজ্যের তুলনায় প্রতিবেশীদের মধ্যে নিরাপত্তা বিষয়ে ঘনিষ্ঠ মিথস্ক্রিয়া সৃষ্টি করে।

আরএসসি তত্ত্বের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ‘সিকিউরিটিাইজেশন তত্ত্ব’, যা ১৯৯৮ সালে ও. ওয়েভার, বি বুজান এবং জে ওয়াইল্ডের যৌথ কাজে, যার শিরোনাম Security: A New Frame-work for Analysis, উপস্থাপিত হয়। তাদের দৃষ্টিতে, নিরাপত্তাকে একটি বক্তৃতা আইন হিসেবে দেখা উচিত, যেখানে মূল বিষয়টি হচ্ছে হুমকিটি বাস্তব কি না, বরং কিভাবে একটি বিশেষ সমস্যা হুমকি হিসেবে সামনে আসতে পারে।  সমস্যাটি একটি হুমকি হিসেবে তখনই ঘোষিত হয় যখন এটি রাষ্ট্র দ্বারা অনুভূত এবং জনসম্মুখে ঘোষণা করা হয়।

ব্যারি বুজান এবং ওলে ওয়েভার ‘Regions and Powers. The Structure of International Security’ বইয়ে উল্লেখ করেন যে সোভিয়েত পরবর্তী আরএসসি রাশিয়ার উপর কেন্দ্রীভূত; এই কমপ্লেক্সের মূল হল রাশিয়ান ফেডারেশন, যা বাল্টিক অঞ্চলের (লাটভিয়া, লিথুয়ানিয়া, এস্তোনিয়া), পশ্চিমাঞ্চল (বেলারুশ, মলদোভা, ইউক্রেন), মধ্য এশিয়া (কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, তুর্কমেনিস্তান এবং উজবেকিস্তান) এবং ককেশাসের (আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, জর্জিয়া) উপকমপ্লেক্সকে সংযুক্ত করে। লেখকদ্বয় মধ্য এশিয়াকে একটি দুর্বল উপকমপ্লেক্স হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেন, যেখানে অভ্যন্তরীণ গতিশীলতা শুধুমাত্র গঠিত হচ্ছে, এবং রাশিয়ার সম্পৃক্ততা বেশ শক্তিশালী। মধ্য এশিয়া এবং ককেশাসের অধিকাংশ দেশের জন্য, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা একটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। কিছু দেশের রাষ্ট্র ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে নিরাপত্তা হুমকি রাজনৈতিক শৃঙ্খলার একটি সাধারণ সংকট সৃষ্টি করতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত গড়ায়।

ব্যারি বুজান এবং ওলে ওয়েভার আরও মনে করেন যে মধ্য এশিয়ার নিরাপত্তা সমস্যা আন্তঃরাজ্যের চেয়ে বেশি বহুজাতিক, যদি আমরা উজবেকিস্তান এবং কাজাখস্তানের মধ্যে আঞ্চলিক নেতৃত্বের জন্য ঐতিহ্যগত সন্দেহ এবং প্রতিযোগিতা বাদ দেই, তাহলে আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে বন্ধুত্ব বা শত্রুতার কোন মডেল তৈরি হয়নি। আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতার অভাবের ব্যাখ্যার একটি অংশ হতে পারে দুর্বল সশস্ত্র বাহিনী যা এই অঞ্চলের দেশগুলোর (উজবেকিস্তান ব্যতিরেকে) আছে। এইভাবে, এখানকার দেশগুলোতে অগঠিত ধরণের উপাদান রয়েছে: রাষ্ট্রগুলো এখনো পুরোপুরি সংঘটিত হয়নি, এবং অঞ্চলটি বাহ্যিক শক্তির অনুপ্রবেশের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্মুক্ত। বুজান ও ওয়েভার নিশ্চিত যে অঞ্চলগুলোর মধ্যে সীমানা ভৌগলিকভাবে প্রায় দুর্বল মিথস্ক্রিয়া অঞ্চল বা অন্তরক (তুরস্ক, বার্মা, আফগানিস্তান) দ্বারা চিহ্নিত থাকে, যা দুই অঞ্চলকে এক ভাগে একত্রিত করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। 'একটি ইনসুলেটর' বা অন্তরকের ধারণা আরএসসি তত্ত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এখানে ঐতিহ্যগত বাফার অবস্থার সাথে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়, যার কার্যক্রম একটি শক্তিশালী সিকিউরিটিজেশন সিস্টেমের কেন্দ্রে, এর প্রান্তিক অঞ্চলে নয়।

নির্বাহ 
বৃহৎ শক্তিগুলোর আপাত নিষ্ক্রিয়তার একটি ব্যাখ্যা উপরের বক্তব্যগুলো হতে পারে আবার সাম্প্রতিক করোনাও হতে পারে। তবে যেহেতু চিরস্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে আন্তর্জাতিক সম্পর্কে কোন পক্ষকেই চিহ্নিত করা যায় না তাই এই পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ সঠিক ভাবে বলা প্রায় অসম্ভব। তবে এটা বলাই যায় যে- যেই সামষ্টিক নিরাপত্তা বহিঃ আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে বলে ধারণা করা হয়, এখানে সেটাই সংঘাত নিরসনকল্পে বল প্রয়োগে বাঁধা হিসেবে প্রতীয়মান হচ্ছে। 

একেবারে শুরুতে এরিক মারিয়া রেমার্কের রচনা থেকে যে উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হয়েছে তা মনে হয় নাগোর্নো-কারাবাখের বাসিন্দাদেরই বক্তব্য। এই সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান না হলে হয়ত All Quiet on the Western Front এর মত আরও উপন্যাসের দেখা মিলতে পারে যার স্রস্টার অতীত হয়ত এরিক মারিয়া রেমার্কের সাথে মিলে যাবে। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
raiyanamir@gmail.com