মাত্র কদিনের যুদ্ধেই ইরানের শীর্ষ পারমাণবিক বিজ্ঞানীদের কয়েকজনকে হত্যা করেছে ইসরায়েল। সেই সঙ্গে সামরিক নেতৃত্ব ও পারমাণবিক অবকাঠামোর বেশ কিছু অংশে বড় রকমের আঘাত হেনেছে। তা সত্ত্বেও ইরানের বিস্তৃত ও সুরক্ষিত পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করতে পারেনি ইসরায়েল— এমনটাই বলছেন ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তারা ও আন্তর্জাতিক পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ বিশেষজ্ঞরা।
ইসরায়েলি এক সেনা কর্মকর্তার মতে, তাদের হামলার ফলে ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করার সক্ষমতা অর্জন প্রক্রিয়া কয়েক মাস পিছিয়েছে মাত্র। মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার ধারণা, অস্ত্র তৈরি ও তা বহনে সক্ষমতা অর্জন থেকে ইরান সম্ভবত এখনও তিন বছর দূরে রয়েছে। ফলে ইরানে ইসরায়েলি হামলা কার্যত অপ্রাসঙ্গিক।
ইসরায়েল দাবি করছে, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছিল বলেই এই হামলা চালানো হয়েছে। কিন্তু হামলা কতটা ফলপ্রসূ হয়েছে, তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। বিশেষ করে আমেরিকার সহায়তা ছাড়া ইসরায়েল সম্ভবত আর বড় কিছু করতে পারবে না।
অন্যদিকে এ আক্রমণ হয়তো ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের পথেই ঠেলে দিতে পারে। ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদের সাবেক গবেষণা প্রধান সিমা শাইন বলেন, গত দেড় বছরে ইরানে পারমাণবিক সামরিক সক্ষমতা নিয়ে আলোচনার পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। তবে তার প্রশ্ন-এ কেবলই আলোচনা নাকি সত্যি ইরান অস্ত্র তৈরির পথে এগিয়েছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর সামরিক বিশ্লেষকরাও বলছেন, এই হামলায় ইরানকে থামাতে না পারলে অস্ত্র তৈরির গতি আরো বাড়বে।
ইসরায়েলের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, ফোরদো পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা। এতে রয়েছে ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম ও কার্যকরী সেন্ট্রিফিউজ। কোম শহরের কাছে একটি পাহাড়ের নিচে নির্মিত এ কেন্দ্র ইসরায়েলের শক্তিশালী বোমার জন্যও অধরা। এটি ধ্বংস করতে পারে কেবল আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ‘বানকার বাস্টার’ বোমা।
ইসরায়েলের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা পর্যন্ত স্বীকার করেছেন, সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে ইরানের এই কর্মসূচি ধ্বংস করা সম্ভব নয়। বরং তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদে কূটনৈতিক সমঝোতা দরকার, যা কেবল যুক্তরাষ্ট্রই এনে দিতে পারে।
নেতানিয়াহুর অবস্থান কিন্তু কূটনৈতিক সমঝোতার পক্ষে নয়—তিনি চাইছেন সামরিক অভিযান এবং সম্ভব হলে ইরানের শাসনব্যবস্থার পতন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান বেসামরিক হতাহতের মধ্য দিয়ে ইরানি জনগণের কাছে এই আহ্বান দুর্বলতর হয়ে পড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ফোরদো ধ্বংস না হলেও সেখানে সহায়ক অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে কাজের অগ্রগতি থামানো সম্ভব, ঠিক যেমনভাবে নাতাঞ্জে সম্প্রতি একটি বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র ধ্বংস করে সেন্ট্রিফিউজগুলো অকেজো করে দেয়া হয়েছে। এছাড়াও, ইসরায়েলের দখলে থাকা ইরানের পারমাণবিক নথিপত্রের সাহায্যে হয়তো ফোরদোর অভ্যন্তরীণ রূপরেখাও এখন তাদের হাতে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে একটি স্থল অভিযানের সম্ভাবনা তৈরি করে।
ওয়াশিংটনের ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটি প্রধান ডেভিড অলব্রাইটের মতে, শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে টেকসই সমাধান হবে একটি কঠোর পরিদর্শন ব্যবস্থাসহ কূটনৈতিক চুক্তি। যা ইরানকে দীর্ঘমেয়াদে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখবে। তিনি বলেন, ইসরায়েলি কৌশলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, তারা থামলে ইরান আবার গড়ে তোলে। তখন আবার নতুন করে হামলা চালাতে হয়।










